ওষুধশিল্প দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে এবং বিশ্বের ১৫০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। এই বাজারের আর্থিক মূল্য ৩৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, যা ৬৭ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। রপ্তানির তালিকায় রয়েছে উচ্চপ্রযুক্তিভিত্তিক ওষুধও। কিন্তু ওষুধ তৈরির ‘অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’র (এপিআই) ৮৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ জন্য সরকার একটি ‘এপিআই পার্ক’ গড়ে তুলছে। তবে বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ববিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ট্রিপস’-সংক্রান্ত শর্তাবলি পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে পারিবারিক ব্যয়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাসিক পারিবারিক ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। শহরাঞ্চলে এই ব্যয় ৪১ হাজার ৪২৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ২৬ হাজার ৮৪২ টাকা। ব্যয়ের ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্য ও পানীয়ের পেছনে এবং ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়। খাদ্যবহির্ভূত খাতের মধ্যে রয়েছে আবাসন, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পরিবহন।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে মাসিক ব্যয় ৩,৪৫৪ টাকা, যা পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের হার ৩৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবার মোট খরচের ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ বহন করেন রোগীরা। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়িত জিডিপির ২ দশমিক ৩৪ শতাংশের মধ্যে ১ দশমিক ৮ শতাংশ আসে ব্যক্তিগত খাত থেকে; সরকারি অবদান শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা অনুযায়ী, মাসে দেশের জনসংখ্যার ২২ শতাংশের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়। তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ উচ্চ ব্যয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন না। স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ের ৬৪ থেকে ৬৮ শতাংশ ব্যয় হয় ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে। রোগনির্ণয়ের পরীক্ষায় ব্যয় হয় ৮ থেকে ১২ এবং বাকি ২০ থেকে ২৮ শতাংশ ব্যয় হয় হাসপাতাল ও চিকিৎসকের জন্য। মাসিক ব্যয়ের হিসাবে এই খাতগুলোতে যথাক্রমে ২,২৮০, ৩৪৫ ও ৮২৯ টাকা ব্যয় হয়।
ঔষধ ও প্রসাধনি আইন, ২০২৩
আইনটিতে ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রীর উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, বিক্রি, মজুত, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে। ওষুধ মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন, চিকিৎসকদের জন্য সরবরাহ করা নমুনা ওষুধ বিক্রি, লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ উৎপাদন এবং নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে। নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রিযোগ্য ওষুধের ক্ষেত্রে অবশ্য পৃথক বিধান প্রযোজ্য।
আইনটির আওতায় যন্ত্রপাতি, ইমপ্ল্যান্ট, সফটওয়্যার এবং মানুষ বা প্রাণীর রোগ, আঘাত বা অক্ষমতা নির্ণয়, প্রতিরোধ, পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসা কিংবা উপশমে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তুও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, জীবন রক্ষা, গর্ভনিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসাসরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ এবং মানুষ বা প্রাণীর শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ও রয়েছে।
আইনটিতে অনলাইনে ওষুধ বিক্রি ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, টিকার লটের বাধ্যতামূলক পরীক্ষা এবং অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ঘাটতি রোধে প্রস্তুতকারকদের ন্যূনতম পরিমাণে এসব ওষুধ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে সভাপতি এবং সচিবকে সদস্য সচিব করে একটি ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের বিধান রয়েছে। পরিষদটি সরকারকে নিম্নলিখিত বিষয়ে পরামর্শ দেয়Ñ
ক. ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ বাস্তবায়ন;
খ. দেশীয় ওষুধশিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের চাহিদা পূরণ;
গ. অ্যালোপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক্যাল, ভেষজ ও ভেটেরিনারি ওষুধের মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ এবং প্রতি দুই বছর অন্তর তা হালনাগাদ করা;
ঘ. ওষুধ ও কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন, বিতরণ এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তির কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর সমাধান;
ঙ. একটি ‘ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ গঠন, যার সুপারিশের ভিত্তিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) ওষুধ নিবন্ধন করবে;
চ. সরকার কর্তৃক গেজেটে ওষুধ ও কাঁচামালের তালিকা প্রকাশ এবং স্থানীয় কাঁচামালের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন জারি।
বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে ওষুধের দুটি শ্রেণি রয়েছে—অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এবং অ-অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাঁচামালের খরচ, মোড়কীকরণের খরচ এবং ‘মার্কআপ’ বা অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে ওভারহেড, বিপণন ও বিতরণ ব্যয়, বেতন, পুরস্কার, মুনাফা, ভ্যাট এবং গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের খরচ। অ-অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে বাজারের মধ্যক মূল্যের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হয়।
কাঁচামালের মূল্য নির্ধারণে গত ছয় মাসের আমদানিমূল্যের গড় বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, জমকালো মোড়কের ভেতরে থাকে বাংলা ও ইংরেজিতে ছাপানো রঙিন নির্দেশিকা, যা রোগীরা অনেক সময় পড়েন না। ওষুধের গুণমান অক্ষুণ্ণ রেখেই এসব খরচের কিছু অংশ কমানো সম্ভব।
ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রস্তুতকারককে মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিডিএর কাছে জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, পণ্য বা সেবার পরিমাণ, গুণমান ও নির্ধারিত মূল্যসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে কি নাÑতা তদারক করা এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা ডিজিডিএর থাকা প্রয়োজন।
২০২৩ সালের আইনের ফাঁক ও সুপারিশ
১. আইনে অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন না করলে প্রস্তুতকারকদের জন্য শাস্তির বিধান থাকতে হবে।
২. চিকিৎসাসেবার বাজার একটি অসম বাজার। চিকিৎসাসেবা, রোগনির্ণয়ের পরীক্ষা কিংবা ওষুধের মূল্য সাধারণ মানুষের পক্ষে নির্ধারণ করা অসম্ভব। স্বাস্থ্য খাত চাহিদা ও জোগানের সমীকরণ অনুযায়ী চললেও বাজারের পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে নির্ভুল সমীকরণ নির্ধারণ করা কঠিন। তাই স্বাস্থ্য খাতে হস্তক্ষেপ করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। হাসপাতাল ও রোগনির্ণয় সেবার ক্ষেত্রেও এই তদারকি প্রযোজ্য হতে পারে।
৩. বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ ওষুধ বিপণন প্রতিনিধি কর্মরত আছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা চিকিৎসকদের বিভিন্ন উপহার ও সুবিধা দিয়ে ওষুধ লিখতে এবং নির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে প্রভাবিত করেন। বলা হয়, বিপণন খাতে এ ব্যয় বছরে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা। এ প্রবণতা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বিপণন প্রতিনিধিদের চিকিৎসকদের সরাসরি নাগালের বাইরে রেখে ওষুধ-সম্পর্কিত তথ্য সরাসরি চিকিৎসকদের কাছে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিল।
৪. ওষুধের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে সরকার ‘এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড’ গঠন করেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।
৫. ওষুধশিল্পের বিশালতা বাজারকে অস্বচ্ছ করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের ওষুধের ওপর কর কমানো সত্ত্বেও সেগুলোর মূল্য কমেনি। আবার একই ওষুধের বিভিন্ন মূল্যও দেখা যায়।
৬. ডিজিডিএর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে টিকার লট পরীক্ষা, ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির দায়ে কারাদণ্ড ও জরিমানা, ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ ওষুধ ছাড়া চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রির দায়ে জরিমানা, চিকিৎসকদের জন্য সরবরাহ করা নমুনা ওষুধ বিক্রির দায়ে জরিমানা এবং নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির দায়ে কারাদণ্ড ও জরিমানা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সংস্থাটির কার্যকর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
৭. আইনে ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ ও ডিজিডিএর ভূমিকা আরো স্পষ্ট করতে হবে।
৮. ওষুধ প্রস্তুতকারকরা মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য না দিলে কিংবা অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ না করলে কী শাস্তি হবে, তা আইনে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
৯. কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে বাজার থেকে সরাসরি অনেক কমমূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসরঞ্জাম সংগ্রহ করা সম্ভব।
১০. স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ও প্রযুক্তির ওপর কর কমানো, দেশে এপিআই উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকদের আর্থিক সহায়তা এবং ব্যয়বহুল ওষুধের মূল্য কমানোর লক্ষ্যে ব্যবস্থাপত্রের ২০ শতাংশ ওষুধ জেনেরিক নামে লেখার সুপারিশ করেছিল।
১১. কমিশন প্রস্তাবিত জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ফার্মেসিগুলোকে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা এবং ব্যবস্থাপত্রের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের জন্য অনলাইনে ব্যবস্থাপত্র তদারকির পরামর্শ দিয়েছিল।
১২. ওষুধের দাম নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখা নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ওষুধ ব্যবসায় স্বার্থের সংঘাত রোধ এবং কার্যকর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়।
১৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারীদের কারিগরি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে এবং একটি ভালো পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
এএম