বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব যখন দৃশ্যমান, তখন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী চেহারা নিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের মদতপুষ্ট দলটি চাইছে বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠিত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করতে। আওয়ামী রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গ হলো আগুনসন্ত্রাস আর গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারার বিভীষিকা। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান ও হাসিনার পলায়নের পর এ দেশের মানুষের একটি চাওয়া—এই বিভীষিকাময় রাজনীতি যেন আর ফিরে না আসে। দেশের রাজনীতি পুরোনো পথে ফিরে যাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে কমবেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে আওয়ামী লীগ এ ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে সাহস না পেলেও এখন কেন পারছে, তা বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশ প্রশাসন বাস্তবে কার্যকর ছিল না। থানাগুলো তখনো সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। এরপরও আওয়ামী লীগ রাস্তায় তৎপর হওয়া তো দূরের কথা, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হওয়ারও সাহস পায়নি। ইউনূস সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের দাবি আদায়ের জন্য নামে-বেনামে বেশ কিছু সংগঠন রাস্তায় নামার চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিহত করেছে। অবশ্য শেষের দিকে অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে ফেলতে বিএনপির সমর্থনেও কিছু বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। সে সময় যারা দাবি-দাওয়ার বহর নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, নির্বাচিত সরকার আসার পর তারা নিশ্চুপ হয়ে গেছে।
এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সংসদে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের প্রতি বিরোধী দলের জোরালো সমর্থন ছিল। এরপরও আমরা দেখছি, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। এই সুযোগ নিতে চাইছে পলাতক দলের কৌশলবিদরা। বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পেছনের শক্তির খেলোয়াড়রা বসে নেই। কারণ পতিত মাফিয়া শাসক ও তার সহযোগীরা দিল্লিতে বসে কলকাঠি নাড়ছে। এদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ রয়েছে অলিগার্ক ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ এবং ভাড়ায় খাটা আওয়ামী সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কথিত বাম প্রগতিশীলদের।
সরকারের ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দল লংমার্চের মতো বড় আকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। সাত দফা দাবি নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে, প্রয়োজনে এক দফার আন্দোলনে যাওয়া হবে। অথচ বিরোধী দল সংসদে বারবার বলছে, সরকারকে ভালো কাজে তারা সহযোগিতা করবে। সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। দুই দশকের বেশি সময় পর কার্যকর সংসদ গঠিত হয়েছে। সংসদের তিনটি অধিবেশন ছিল প্রাণবন্ত। এরপরও কেন রাজনীতি সংসদ থেকে অধিকতর রাজপথের দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে এখন নানা ধরনের আলোচনা চলছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কার্যকর সংসদ এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গণআকাঙ্ক্ষা থেকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল কি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে?
বিরোধী দলের দাবি মূলত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে। বাকি যেসব দাবি করা হয়েছে, তা ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের গতানুগতিক দাবি-দাওয়ার অংশ। সরকারের সাত মাসের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান কিংবা দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এমনটা কেউ আশা করে না। আসলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারের উদ্যোগে বিরোধী দলের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ছে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের কোনো অংশগ্রহণ নেই। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নাম চাইলেও তারা দেননি। বিরোধী দলের দাবি, সংবিধান সংশোধন নয়, গঠন করতে হবে সংবিধান সংস্কার কমিটি। যাতে রাজি নয় ক্ষমতাসীন দল। মূলত এখান থেকেই বড় আকারের বিরোধের সূচনা।
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে। এই আইনগুলোর ব্যাপারে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছিল। বিশেষ করে তদন্ত-সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে। একইভাবে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে যে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠার আইন করা হয়েছে, তা নিয়েও বিরোধী দলের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অনেক বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মনে করেন, রাষ্ট্রের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারে সরকার আসলে আন্তরিক নয়। পুরোনো কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সরকার দেশ পরিচালনা করতে চায়।
এসব আইনপ্রণয়নের অভিজ্ঞতা থেকে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিরোধী দল আসলে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়। লংমার্চসহ কর্মসূচিগুলোতে নেতাদের যে কঠোর মনোভাবের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট—এ ব্যাপারে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে বিরোধী দল। এ নিয়ে সরকারকে কঠোর বার্তা দিতে চায়।
তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, বিরোধী দল সংসদের বাইরে গিয়ে ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে আর ফিরতে পারবে না। কারণ বিরোধী দলের তরুণ সংসদ সদস্যরা সংসদীয় রাজনীতির একটি কমফোর্ট জোনে ঢুকে পড়েছেন। এছাড়া হরতাল বা অবরোধের মতো রাজনীতিতে আর ফিরবেন নাÑসে প্রতিশ্রুতিও তারা দিয়েছেন। জনগণও এ ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করবে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অলিখিত ঐকমত্য ছিল, পতিত শক্তির বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কিন্তু বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন দল যখন অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে একমত হতে পারছে না, তখন ধীরে ধীরে নেতিবাচক রাজনীতির কৌশল শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। পতিত শক্তি এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় আছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে যখন সন্দেহ এবং অবিশ্বাস বাড়ছে, তখন দুপক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে না হলেও পর্দার অন্তরালে আলোচনা হওয়া দরকার। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে সরকারকে কমবেশি ছাড় দিতেই হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে যখন স্কুলের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করেছিল, তখন সেই শিক্ষার্থীরা কিন্তু রাষ্ট্র মেরামতের কথা বলেছিল। জুলাই আন্দোলনের সময় দেয়ালে দেয়ালে রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। এমনকি বিএনপি নিজেদের ৩১ দফায়ও সংস্কারের নানা প্রস্তাব দিয়েছিল। ফলে লোক দেখানো নয়, বরং বাস্তবে দৃশ্যমান সাংবিধানিক সংস্কার আনতে হবে। তা করতে হবে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের অংশ। ফলে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা বা আপস-রফায় সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পায় না। বরং সম্মিলিতভাবে দেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা বিজয়ী হয়। পতিত শক্তি ও তাদের পেছনের মদতদাতাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য পলাতক পতিতরা সব ধরনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাতে পারে।
সরকারের সাত মাস চলে গেলেও পুলিশসহ বেসামরিক আমলাতন্ত্রে যেন স্থবিরতা বিরাজ করছে। কোথাও যে কিছু ছন্দপতন ঘটছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর প্রধান কারণ, ফ্যাসিবাদী আমলের সুবিধাভোগী আমলাচক্র এখনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ চক্রের সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে এরা প্রশাসনকে গতিহীন করে ফেলছে। এর আলামত দেখা গেছে রাজধানীতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকায় আওয়ামী লীগের বড় একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ব্যর্থতার নানা খবর থেকে।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে পতিতদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অনুমতি দিয়েছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। পুলিশের ভেতরে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সচিবালয়কেন্দ্রিক আমলাতন্ত্রে কী অবস্থা চলছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আমলাতন্ত্রের ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী চক্র এখন পেশাদার কর্মকর্তাদের গুপ্ত ট্যাগ দিয়ে কোণঠাসা করছে। অন্যদিকে, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসে অর্থের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদীদের পুনর্বাসন করে যাচ্ছে। একটি বিষয় এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট—দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের সঙ্গে পতিত রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের ভেতর যে ক্ষয় তৈরি হয়েছে, তা রোধ করা না গেলে তা সরকারের জন্য বড় বিপদের কারণ হবে। প্রশাসনের ভেতর থেকে তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জ ও বিদেশি মদতপুষ্টদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে হলে রাজনৈতিক ঐক্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। হাসিনার দেড় দশকের শাসনে দেশে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বলে কিছু অবশিষ্ট রাখা হয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের পদে পদে আওয়ামী রাজনৈতিক চক্র বসে আছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যদি বিরোধ ও বিভাজন বাড়ে, তাহলে এই চক্র একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠবে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে তার আলামত সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।