অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বুদ্ধিজীবী ফাহাম আব্দুস সালামের বিএনপির প্রতি একটি পরামর্শ আমার খুবই ভালো লেগেছিল। আমি আমার একাধিক লেখায়ও বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তার বক্তব্য ছিল—বিএনপির উচিত হবে না জামায়াতের সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্কে জড়ানো। কারণ রাজনৈতিক বিতর্কে জয়-পরাজয় হতে পারে; কিন্তু ধর্মীয় বিতর্কে জামায়াতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিএনপি কখনোই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে না।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির সংসদ সদস্য এবং ১৯৭৪-৭৫ সেশনের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মনিরুল ইসলাম সংসদে জামায়াতের নারী সদস্যদের হিজাব-নেকাব প্রসঙ্গে মন্তব্য করার পর সারা দেশে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সীমারেখার মধ্যে থাকেনি; তা দ্রুত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের রূপ নিয়েছে। এরপর ফাহাম আব্দুস সালামও আলোচনায় অংশ নিয়ে নেকাব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি মূলত যুক্তি দিয়েছেন যে নেকাব মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তার মতে, মানুষ শুধু কণ্ঠস্বর নয়, মুখের অভিব্যক্তি, চেহারা এবং ভিজ্যুয়াল সংকেতের মাধ্যমেও অন্যকে চেনে ও মূল্যায়ন করে। তিনি আরো বলেছেন, সংসদ সদস্যের মতো একটি ‘পাবলিক-ফেসিং’ ভূমিকায় থাকা ব্যক্তির পরিচয় জনগণের কাছে দৃশ্যমান হওয়া উচিত।
তিনি যা বলেছেন, তা তার ফেসবুকের লেখা থেকেই মূল অংশটি এখানে তুলে ধরছি (লেখার স্টাইল অবিকৃত রেখে)। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, “আপনি বলতে পারবেন না যে আমি এই অধিকার এক্সারসাইজ করতে চাই এবং যা করব তার প্রতিক্রিয়া থেকেও ইমিউনিটি চাই।
আপনি যখন নিকাব করেন—আপনি highest form of seclusion প্র্যাকটিস করতে চান—শুধু highest form of piety না। এখন আপনি যদি highest form of seclusion প্র্যাকটিস করতেই চান—আর আমি যদি আপনাকে অনারেবলি secluded-ই রাখতে চাই—আপনার তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এটাই তো আপনার চয়েস।
নিকাবিরা সব সুযোগ এক্সপেক্ট করেন শুধু কর্মক্ষেত্রে—আমি লক্ষ করেছি।
নিকাবের কারণে বহু জায়গায় আপনার কোনো অসুবিধা হয় না—যেমন মসজিদে কিংবা বাজারে। দ্যাটস এক্সিলেন্ট। কিন্তু নিকাবের কারণে বহু জায়গায় আপনি অন্যের অস্বস্তি তৈরি করেন—সেটাও সত্য। ধরা যাক আমি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং আপনি ছাত্রী। আমি ভাইভা নিচ্ছি এবং আপনি নিকাব করতে চান। আপনার যেমন অধিকার আছে নিকাব করার, আমারও অধিকার আছে আপনার ভাইভা না নেওয়ার। কারণ আমি জানি না যে আপনি আসলেই আপনি নাকি অন্য কেউ। আপনার আইডেন্টিটি জানা আমার জন্য অপরিহার্য এবং আপনার চয়েস যেহেতু এই অপরিহার্যতাকে অসার করে দেয়—আমিও সেহেতু আপনার অপরিহার্যতাকে (ভাইভা) গ্রাহ্য করব না। দ্যাটস ওনলি ফেয়ার।
এইটা কোনো ধর্মের বিষয় না—মানুষ নামক স্পিশিজের কথা। আমি যখন কনভার্সেশনে যাই—আমি আপনার চেহারা থেকে, ভয়েস থেকে, এক্সপ্রেশন থেকে অনেক ভিজ্যুয়াল সিগন্যাল নেই এবং তার ভিত্তিতেই আপনাকে মনে রাখি, মাপি। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ—এমন। যে নিকাবি—সেও এমন। আপনি ধর্মের কারণে এই এরেঞ্জমেন্ট ব্রেক করতে চান (যদিও ধর্ম আপনাকে মোটেও নিকাব করার জন্য আদেশ দেয় নাই, অনুমতি দিয়েছে)। কিন্তু আপনি তো আশা করতে পারেন না যে সারা দুনিয়া আপনার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রি-অ্যাডজাস্ট করবে।
আপনি যদি নিকাব করেন—য়েস আপনি বহু জায়গায় নেগেটিভলি ডিসক্রিমিনেটেড হবেন এবং সেটাই হওয়া উচিত। এটা কোনো ইসলামোফোবিয়া নয়—সাধারণ হিউম্যান ইন্টারেকশনের নর্মস। আপনি যদি নেকাব করেন—আপনাকে কোনো দিন কোনো স্পাই এজেন্সি ইন্টারভিউতে ডাকবে না। ইন ফ্যাক্ট—আপনি যদি নেকাব করেন—আপনাকে কোনো পাবলিক ফেইসিং রোলে ডাকাই উচিত নয়।
প্রশ্ন হোলো—দেশের সর্বোচ্চ পাবলিক ফেইসিং রোল হলো সংসদ। অবশ্যই সংসদে একজন নিকাবি যেতে পারেন—সেই অধিকার নিয়ে কেউ প্রশ্ন করছে না। কিন্তু সেটা হওয়া উচিত কি না—পুরাটাই অন্য আলাপ। আমি এই সন্দেহ প্রকাশ করছি না যে সংসদে নিকাবি X-এর জায়গায় নিকাবি Y চলে গেলেন (কারণ আমি এক্সপেক্ট করছি যে আইডেন্টিটি নিশ্চিত করার কোনো না কোনো মেকানিজম সংসদে আছে)। কিন্তু আমি চিনি না যে আমার এলাকার সর্বোচ্চ প্রতিনিধি কে—এই ব্যবস্থা কি গ্রহণযোগ্য? এ ক্ষেত্রে আমার সংসদীয় প্রতিনিধিকে চেনার জন্য তার চেহারা দেখাকে আমি ‘অপরিহার্য’ মনে করছি। একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে আমি সাধারণ কোনো মেয়ের চেহারা দেখাকে আমার জন্য ‘প্রয়োজনীয়’ বা ‘অধিকার’ মনে করছি না; কিন্তু যে আমার সংসদীয় প্রতিনিধি হবে—তাকে চেনার জন্য তার চেহারা দেখতে পারাটা প্রয়োজনীয় মনে করছি।”
ফাহামের বক্তব্যে চিন্তার খোরাক রয়েছে, কিন্তু আমার আপত্তি অন্য জায়গায়। সমস্যা হলো, তিনি তার ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক উপলব্ধিকে একটি সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। নিকাবকে Highest form of Seclusion নামে উল্লেখ করেছেন। ডিকশনারিতে Seclusion শব্দের অর্থ দেখিয়েছে, শান্তি, নির্জনতা বা নিরাপত্তার সন্ধানে সচেতনভাবে জাগতিক কোলাহল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া (A deliberate withdrawal from the world to find peace, quiet, or safety)। এখানে ফাহাম একটা মারাত্মক ভুল করে বসেছেন। নিকাবের একটি মনগড়া ও একপেশে ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়েছেন। একজন শিখ কেন পাগড়ি পরেন? সেই কারণে যে পাগড়ি পরেছেন, তার কাছ থেকে আপনাকে জানতে হবে। নিকাব পরা মেয়েটি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না—বরং সামাজিক এনগেজমেন্ট করতে এসে তার মুখের রূপ বা বিউটিটি আপনাকে দেখাতে চান না! একজন মেয়ে যখন বলে, মাই বডি, মাই চয়েজ তখন সেটি আমরা খুশি মনে মেনে নিই। কিন্তু একটা মেয়ে যদি বলেন—মাই বিউটি মাই চয়েজ, সেটি আমরা মানতে নারাজ!
মানুষের পরিচয় নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় চেহারা নয়। আধুনিক বিশ্বে পরিচয় শনাক্ত করার বহু পদ্ধতি রয়েছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, আইরিস স্ক্যান, কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি আজ বহুল ব্যবহৃত। সংসদ ভবনে প্রবেশের সময় একজন সদস্যের পরিচয় হাতের ছাপের মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব। চোখের মণির চারপাশের রঙিন অংশ—সারা দুনিয়ার এক মানুষের সঙ্গে অন্যের Irish-টি মিলবে না। আপনার সন্দেহ দূর করার জন্য একজন নেকাবি নারী এই অংশটিও কিন্তু উন্মুক্ত রাখেন! একইভাবে এলাকার জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে কণ্ঠস্বর, বক্তব্য, রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমেও চিনতে পারেন।
গ্রাম থেকে প্রথমবারের মতো শহরে আসা আব্দুল আলীর মনে যেমন প্রশ্ন জেগেছিল, শিঙারার ভেতরে আলু কীভাবে ঢুকল? তেমনি বিজ্ঞ সংসদ সদস্য যিনি নিজেও দাড়ি-টুপি পরে থাকেন, তার মনেও প্রশ্ন জেগেছে—একজন স্বামী বোরকার মধ্যে সর্ব শরীর আবৃত স্ত্রীকে কীভাবে চিনবেন? কিংবা তাদের বন্ধুরা কীভাবে বুঝবেন যে তিনি স্ত্রী বদল করেননি কিংবা অন্যজনকে নিয়ে আসেননি? তিনি তার ব্যক্তিগত পরিসরে অতীত জীবনের স্মৃতি সংসদে টেনে এনে ওনার কলিগদের চরম মাত্রায় বিনোদিত করলেন! সেই উচ্ছ্বসিত নারী কলিগদের একজন আবার নিজেই হিজাব পরিহিত ছিলেন!
তবে মজার ব্যাপার হলো, হিজাব-নেকাবের জগতে এ রকম স্ত্রী বদল হয়েছে, এ রকম অ্যাক্সিডেন্টের কথা আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। বরং উল্টো পরিবেশে এ রকম স্ত্রী বদলের অনেক মুখরোচক কাহিনি ছড়িয়ে আছে! এ রকম পরিবেশের এক স্বামী (বিখ্যাত পরিবারের) তার নবজাতককে দেখতে ক্লিনিকে গেলে তার স্ত্রী জানান, ‘হানি, এই সন্তানের বাবা তুমি নও!’
অর্থাৎ, এখানে মূল প্রশ্নটি টেকনিক্যাল বা প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন।
যদি কেউ মনে করেন পৃথিবীতে একটি মাত্র সাংস্কৃতিক মানদণ্ড থাকবে এবং সবাইকে সেই মানদণ্ডে খাপ খাওয়াতে হবে, তাহলে নেকাব অবশ্যই একটি সমস্যা বা সোশ্যাল নুইসেন্স বলে গণ্য হবে। কিন্তু যদি আমরা পৃথিবীকে একটি বহুসাংস্কৃতিক, বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যময় সমাজ হিসেবে দেখি, তাহলে ভিন্ন জীবনধারা ও পোশাক-পরিচ্ছদকে ধারণ করার জন্য আরো বেশি উদারতা প্রয়োজন।
আজকের পৃথিবীতে শিখদের পাগড়ি, ইহুদিদের কিপ্পাহ, খ্রিষ্টান সন্ন্যাসিনীদের ধর্মীয় পোশাক কিংবা মুসলিম নারীদের হিজাব-নেকাব—সবই ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য এখানেই যে, মানুষ নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারেন, যতক্ষণ না তা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ইসলামের দুটি প্রচলিত অনুশীলনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজ পথ—হিজাবকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করি। আমার স্ত্রীও হিজাব পরেন, নেকাব করেন না। কিন্তু তাই বলে আরেকজন নারী যদি ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত পছন্দ বা আত্মিক অনুপ্রেরণা থেকে নেকাব পরতে চান, তাহলে তার সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত। আমি তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তার সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করতে পারি। কিন্তু যে দল বা জোটকে নিয়ে এই সমালোচনা, সেখানেও মারদিয়া মোমতাজসহ আরো কয়েকজন নেকাব করেন না। এমনকি একই বলয়ে মোনামী ম্যাডামের গ্রহণযোগ্যতা অনেককে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে! এখানেই উদার সমাজ ও অনুদার সমাজের পার্থক্য।
আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সংসদেও নেকাব পরিহিত দুজন নারী সদস্য ছিলেন। তখন বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে কৌতুক, ব্যঙ্গ বা ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। কেউ তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তাদের পোশাককে কেন্দ্র করে বিদ্রুপ করার সাহস দেখাননি। বেগম খালেদা জিয়া আধুনিক জীবনাচারে অভ্যস্ত থাকলেও দেশের টপ ইসলামিক স্কলারদের সঙ্গে চলাফেরা এবং একই মঞ্চে রাজনীতি করতেও দ্বিধা করেননি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটিতে বিএনপি তো বটেই—আওয়ামী লীগেও অসংখ্য নারী নিকাব করেন। বিএনপির এই প্রচারণা বা মানসিকতা অব্যাহত থাকলে এ রকম অসংখ্য নেকাবি নারী এবং তাদের পরিবার বিএনপিতে নিজেদের অপাঙক্তেয় মনে করবে। এতে লাভ হবে জামায়াত!
আমরা কি নারী সংসদ সদস্যদের শুধু ৫০ সেট অলংকার হিসেবেই দেখতে চাই
তবে যে যাই বলেন এটা সত্যি যে, সংসদে নেকাব পরিহিত সাংসদরা সংসদের কসমেটিক অ্যাপিয়ারেন্স অবশ্যি নষ্ট করছেন! অগত্যা কোনো কারণে যদি সারা পৃথিবীর ৪ বিলিয়ন নারী নিকাব পরা শুরু করেন, তবে তাবৎ পুরুষকুলের অর্ধেক—অর্থাৎ ২ বিলিয়ন পুরুষ প্রথম দিনেই হার্টফেল করে মারা যাবেন।
আপনাদের হয়তো স্মরণে আছে যে বরেণ্য সম্পাদক শফিক রেহমান তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে এরশাদ কর্তৃক মনোনীত ৩০ নারী সাংসদকে সংসদের ত্রিশ সেট অলংকার হিসেবে বর্ণনা করে ঐতিহাসিক খোঁচা দিয়েছিলেন! এটি নিয়ে তখন তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। স্বৈরশাসক এরশাদ শুধু কাগজটিই বন্ধ করেননি, সম্পাদককেও দেশছাড়া করেছিলেন।
শফিক রেহমান কেন সে সময় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ‘ত্রিশ সেট অলংকার’ বলে অভিহিত করেছিলেন, সেটি নিয়ে আজ নতুন করে গবেষণা করা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়।
সেই সমালোচনার মূল কথা ছিল—সংসদে উপস্থিতি নয়, কার্যকর অংশগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজও যদি নারী রাজনীতিবিদদের চিন্তা, বক্তব্য বা নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তে তাদের পোশাক, হিজাব বা নেকাব নিয়ে আলোচনা বেশি হয়, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে বলে ধরে নিতে পারব?
আরো একটি বিষয় ভেবে দেখার মতো। একসময় সংসদে ‘অলংকার’ হিসেবে উপস্থিত থাকার যে সমালোচনা করা হয়েছিল, আজ কি সেই মানসিকতা পুরোপুরি বদলেছে? যখন একজন পুরুষ সংসদ সদস্য বিরোধী দলের নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বদলে অনেকেই তা উপভোগ করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—এরশাদের আমল থেকে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানসিকতার কতখানি উন্নতি হয়েছে?
তাই বলে কি জামায়াতকে সমালোচনা করা যাবে না
জামায়াতের রাজনীতি, তাদের অতীত ভূমিকা কিংবা বর্তমান অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করার হাজারো ক্ষেত্র রয়েছে। তাদের রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক কৌশল, অর্থনৈতিক চিন্তা কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা—সবকিছুই বিতর্ক ও সমালোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধীরে ধীরে ইসলামের অনুশীলন, ধর্মীয় প্রতীক বা মুসলমানদের ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের দিকে চলে যায়, তাহলে রাজনৈতিক সমালোচনা এবং ধর্মীয় বিরোধিতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ। এখানকার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি গভীর। ফলে জামায়াতের বিরোধিতা করতে গিয়ে যদি ইসলামের কোনো অংশকে আক্রমণ করা হচ্ছে—এমন ধারণা মানুষের মধ্যে জন্ম নেয়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তার সুফল নয়, কুফলই বেশি হবে।
গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষের পোশাকের স্বাধীনতা যেমন আছে, তেমনি সেই পোশাক সম্পর্কে মতামত দেওয়ার স্বাধীনতাও আছে। কিন্তু দায়িত্বশীল রাজনীতির দাবি হলো—ব্যক্তির বিশ্বাসকে আঘাত না করে নীতির সমালোচনা করা, ব্যক্তিগত পরিচয়কে বিদ্রুপ না করে রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই পরিমিতিবোধের।
জামায়াতের বিরোধিতা করা যেতে পারে। তাদের রাজনীতির কঠোর সমালোচনাও করা যেতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধিতা যেন ইসলামের বিরোধিতা বলে মনে না হয়। কারণ রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক অবস্থান বদলায়, কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস কোটি মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িত থাকে। রাজনীতিবিদদের সেই বাস্তবতা মনে রাখা প্রয়োজন।
লেখক : কলামিস্ট