আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। আগামীকাল জাতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর বাংলাদেশের জনগণ সংসদ নির্বাচনে সর্বশেষ নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে প্রশাসনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিশেষ প্রভাব ও কৌশল এড়িয়ে নির্বাচিত করতে পেরেছিলেন। আওয়ামী সমর্থক এবং সুশীল সমাজ এবার প্রতিবাদ করে নিশ্চয়ই সমস্বরে বলে উঠবেন— কেন, আমরা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরেও তো ভোট দিতে পেরেছিলাম। আমি আপনাদের সঙ্গে ভোট দিতে পারার তর্কে একমত। সেই নির্বাচনে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার হার শতকরা ১০০ ভাগের বেশিও ছিল! সুতরাং ভোটারের চেয়েও ভোট বেশি করে দেওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। আমিও সেদিন ভোট দিয়েছিলাম বটে কিন্তু পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারিনি। ভোটের দিনের প্রায় দশ মাস আগে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ফলাফল যে দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি আর বাংলাদেশের তথাকথিত সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের মধ্যে বৈঠকে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, সেটা তো আমি অন্তত ব্যালটে সিল মারার সময় জানতে পারিনি। যাহোক, সেই পূর্বনির্ধারিত ভোটের কাফফরা আমাদের প্রায় ষোলো বছর ধরে দিতে হয়েছে। আজ যে ভোটারের বয়স ৩৫ বছর, তার ভোটাধিকার ২০০৮ সালের পর কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জীবনে সে প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার জন্য আজ রাতে অধীর আগ্রহে ভোরের অপেক্ষা করবে।
আগামীকাল আপনারা কাকে ভোট দেবেন সেটা যার যার স্বাধীনতা ও পছন্দের ব্যাপার। তবে মূল্যবান ভোট কাদেরকে দেওয়া উচিত হবে না, সে সম্পর্কে আমার মতামতটা আপনাদের সদয় বিবেচনার জন্য উল্লেখ করে রাখলাম। জাতীয় পার্টি মার্কা যেসব দল বা ব্যক্তির কারণে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ মিলিতভাবে জনগণের সব অধিকার কেড়ে নিতে পেরেছিল, গুম-খুন করতে পেরেছিল, আয়না ঘর বানাতে পেরেছিল, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুট করতে পেরেছিল, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছিল এবং যারা মুসলিম গণহত্যাকারী নরেন্দ্র মোদির পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়েছিল, সেই ব্যক্তি বা দল আজ যে রূপেই আসুক না কেন, তাদের প্রত্যাখ্যান করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক ভোটারের নৈতিক দায়িত্ব। সেই সঙ্গে ভারতের প্রতি বিভিন্ন কারণে নমনীয় সব প্রার্থীকে বর্জন করার আহ্বান জানাচ্ছি। এরা নির্বাচিত হলে দিল্লি নতুন করে হাসিনার আমলের মতো করে বাংলাদেশ দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাবে। সব সময় স্মরণে রাখবেন, বাংলাদেশকে দিল্লির রাডারে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের সন্তানরা জীবন দেয়নি। তারা আপনাদের মুক্তি দিতে চেয়েছিল। আপনারা নিশ্চয়ই ভারতের কোনো দালালকে সংসদে এনে মহান জুলাই বিপ্লবকে অপমান করতে এবং পুনরায় পরাধীন হতে চাইবেন না।
বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আরো একটি অনুরোধ আছে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে প্রথমেই দয়া করে গণভোটের ‘হ্যাঁ’তে সিল দিয়ে তারপর আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। মনে রাখবেন ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি আর ‘না’ মানে গোলামি। ‘হ্যাঁ’ মানে বৈষম্যহীন শাসনব্যবস্থা আর ‘না’ মানে আবার বৈষম্যকে মেনে নেওয়া। ‘হ্যাঁ’ মানে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করা আর ‘না’ মানে একনায়কতন্ত্রের বীজ পুনরায় রোপণ করা। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে শহীদ আবু সাঈদ, আনাস, নাফিজ, ইয়ামিন, ওয়াসিম, মুগ্ধরা জিতে যাবে। আর ‘না’ জিতলে খুনি হাসিনা এবং চরম ইসলামবিদ্বেষী মোদি জিতবে। একজন বর্ষীয়ান নাগরিক হিসেবে এটুকু না বললে নিজের কাছে অপরাধী থেকে যেতাম। ভোটারদের আগামীকালের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবার নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনায় আসা যাক।
প্রধান যে দুই দল কাল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে তারা কেবল ফ্যাসিবাদের ভিকটিমই ছিল না, তারা সম্মিলিতভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেড় দশক ধরে রাজপথে সাধ্যমতো লড়াই করেছে। তরুণদের যে তৃতীয় দল একটি বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছে, সেই দলের নেতাকর্মীরা জুলাই বিপ্লবের অবিসংবাদিত ভ্যানগার্ড ছিল। অর্থাৎ যে তিনটি দল আগামী জাতীয় সংসদে হয় সরকার অথবা বিরোধী বেঞ্চে বসতে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অন্তত ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে কোনো আদর্শগত বিরোধ থাকার কথা নয়। আমার মনে হয়, এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারের মতো কম সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি প্রচার আমরা কখনো দেখিনি। প্রচারের সময় শেরপুরে একজন জামায়াত নেতার নিহত হওয়া অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক ছিল। স্থানীয় প্রশাসন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্বলতা না দেখালে এই ট্র্যাজেডিও এড়ানো যেত। অপরদিকে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিন নির্বাচনি তামাশায় যথাক্রমে ১১৫ জন, ২২ জন এবং ৬ জন নিহত হয়েছিল। এবারের প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অবশ্যই তীব্র বাগযুদ্ধ হয়েছে, হয়তো বাগযুদ্ধের ভাষা আরো শালীন ও বুদ্ধিদীপ্ত হলে ভালো হতো, কিন্তু নির্বাচনের মাঠে রাজনীতিবিদদের এতটুকু ছাড় আমাদের দিতে হবে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সহিষ্ণুতার ব্যাপারে ইতিবাচক ইতিহাস সৃষ্টি করা গেছে। অবশ্য সরকার, ইলেকশন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কালকের পরীক্ষা এখনো বাকি আছে। তবে আমি আশাবাদী যে, সেই পরীক্ষাতেও জাতি হিসেবে আমরা উতরে যাব। এবার নির্বাচনি সহিংসতা অনুল্লেখ্য হওয়ার পেছনে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের কথা না বললে আমার বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বাংলাদেশে সব সন্ত্রাস যে একটি বিশেষ দল সৃষ্টি করে থাকে, তার অকাট্ট প্রমাণ আমরা পেয়ে গেছি। এবং বলাই বাহুল্য যে, সেই দলটির নাম আওয়ামী লীগ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ জন্মাবধি সহিংসতা ও সন্ত্রাসের চর্চা করে এসেছে। আমার মন্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক :
১. মওলানা ভাসানী যখন তারই হাতে গড়া আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে গিয়ে ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠন করেছিলেন, তখন সেই ন্যাপের উদ্বোধনের দিনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পান্ডারা ইট, পাথর, হকিস্টিক দিয়ে পুরান ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আক্রমণ চালিয়ে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিয়েছিল। মওলানা ভাসানীর মতো মহান নেতাকে সেদিন আওয়ামী গুন্ডাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা খুঁজতে হয়েছিল।
২. ১৯৫৮ সালে এই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের সহিংসতায় সংসদ চলাকালীন অবস্থায় ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী মাথায় আঘাত লেগে নিহত হয়েছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড উপলক্ষ করেই তৎকালীন পাকিস্তানে ফিল্ড মার্শাল আইউব খানের সামরিক শাসন এসেছিল।
৩. স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী সন্ত্রাসে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। শেখ মুজিব জনগণের বিরুদ্ধে তার ‘লাল বাহিনী’ লেলিয়ে দিয়েছিলেন।
৪. ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে লগিবৈঠা দিয়ে পিটিয়ে খোদ রাজধানীতে মানুষ হত্যা করেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের হত্যা করে তাদের লাশের ওপর নেচেছিল পিশাচ বাহিনী।
৫. ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের বীভৎসতায় জাতিসংঘ পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।
৬. এমনকি জুলাই বিপ্লবের পরও যে আওয়ামী লীগের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি, তার বড় প্রমাণ হলো, ২০২৫ সালে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে এনসিপির নেতাদের ওপর গোপালগঞ্জে হামলা।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী আওয়ামী লীগের এবার ভোটের মাঠে অনুপস্থিতি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আশা করি, যারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে পুনর্বাসিত করতে অতি উৎসাহ দেখাচ্ছেন, তারা অন্তত সেই ক্ষমা ঘোষণার জন্য দলটির নেতাকর্মীদের ভয়ংকর সন্ত্রাসী চরিত্র সংশোধন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।
আমাদের আশা, একটি চমৎকার নির্বাচন শেষে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন সরকার পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই শপথ গ্রহণ করবে। বিএনপি এবং জামায়াত, উভয় দলের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনি প্রচারের সময় জাতীয় সরকার গঠনের কথা একাধিকবার বলেছেন। নির্বাচনে জয়লাভ করার পর তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন কি না, সেটা আমার জানা নেই। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বে যে জোট সরকার রাষ্ট্র চালিয়েছিল, সেই সরকারে জামায়াতে ইসলামীর দুই শীর্ষ নেতা মন্ত্রী ছিলেন। সুতরাং, বিএনপি এবং জামায়াতের একসঙ্গে সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, এক সময়কার মিত্রদের সম্পর্ক এখন ভয়ানকভাবে তিক্ত। একটা প্রবাদবাক্য আছে, ‘সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই।’ একইভাবে বাংলাদেশেও সেই বিএনপিও নেই, সেই জামায়াতও নেই। অতএব, জাতীয় সরকারের সে গুড়ে বালি বলেই আমার ধারণা। তাছাড়া, নির্বাচনি প্রচারে তারেক রহমান খোলাসা করে বলে দিয়েছেন, তার জাতীয় সরকারে জামায়াত অন্তর্ভুক্ত হবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও জাতীয় সরকারের ধারণাটাই পছন্দ করি না। বিশেষ করে, শেখ হাসিনা ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালে বিতাড়িত হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সরকারের নামে জনগণের সঙ্গে যে তামাশা করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে জাতীয় সরকার নিয়ে কোনো আলোচনাই অনাবশ্যক। এত তাড়াতাড়ি জনগণ নিশ্চয়ই ভুলে যাননি যে, জাতীয় সরকারের খোলসেই বাংলাদেশে হাসিনার ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছিল। শেখ মুজিবের স্বৈরাচারী, একদলীয় বাকশালও জাতীয় সরকারের মোড়কেই তৈরি করা হয়েছিল। আমি বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে সরকারি এবং বিরোধী দল সংবিধান অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। সংসদীয় ব্যবস্থার ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ রক্ষা করতে হলে সরকার এবং বিরোধী দলের এই বিভাজন অবশ্যই থাকতে হবে। পাঠক এবার প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে আজকের লেখার শিরোনামে জাতীয় ঐক্য বলতে আমি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন। সেই ব্যাখ্যা দিয়েই আমার লেখার সমাপ্তি টানবো। ঐক্য প্রক্রিয়ার শুরুটা করতে হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জনগণের রায় মেনে নেওয়ার মাধ্যমে।
অতঃপর সরকার গঠিত হয়ে যাওয়া সাপেক্ষে, সরকারি ও বিরোধী দলের কাছে আমি পাঁচটি নিম্নোক্ত ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি :
১. ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা ইস্পাতকঠিন ঐক্যে আবদ্ধ থাকব।
২. যেকোনো রূপে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাবর্তন রোধে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব।
৩. জুলাই গণহত্যার সব বিচার আমরা সম্পন্ন করব।
৪. শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করব।
৫. ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও লিঙ্গ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকব।
আমার প্রত্যাশা কি খুব বেশি হয়ে গেল বলে আপনাদের মনে হচ্ছে?