একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে বিবেচনা করা হয় সমাজ বিনির্মাণের প্রধান চালিকাশক্তি, সমালোচনামূলক চিন্তার কেন্দ্র এবং রাষ্ট্রের বিবেক হিসেবে। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে যে স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করেছিল, তার পেছনে দেশের একাডেমিশিয়ান বা শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দায় ছিল। মেধা ও নৈতিকতার আপস, দলীয় লেজুড়বৃত্তি এবং ক্ষমতার তোষামোদির মাধ্যমে এই বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ফ্যাসিবাদের প্রধান সহায়কে পরিণত হয়েছিল। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী ফ্যাসিবাদের আইনি ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণে এবং নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণকারী বিভিন্ন দমনমূলক আইন বাস্তবায়নে বুদ্ধিবৃত্তিক ন্যায্যতা এনে দিয়েছিলেন। তথাকথিত ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ এবং চেতনার একচেটিয়া বয়ান তৈরি করে শাসকের কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ও নির্বাচনি জালিয়াতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। একাডেমিশিয়ান ও সুশীল সমাজের এই আত্মসমর্পণের ফলেই শাসনব্যবস্থাটি জবাবদিহিতাহীন ও চূড়ান্তভাবে ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করতে পেরেছিল।
ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা, যেমন মুসোলিনির ইতালি, হিটলারের জার্মানি ও ফ্রাঙ্কোর স্পেন কঠোর জাতীয়তাবাদ, সামরিকীকরণ, নাগরিক স্বাধীনতার দমন এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কেন্দ্রীয়করণের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। তবে বাংলাদেশে পলায়নকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন ছিল একটু আলাদা, যেখানে উন্নয়নমূলক গণতন্ত্রের আবরণে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল ভুয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতির ভুয়া সূচক, প্রাত্যহিক গুম-খুন এবং জটিল পেশিশক্তির শক্ত কাঠামোগুলোকে। ফলে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ অপরাপর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে ভিন্নমাত্রিক ছিল। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আয়নাঘরে আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, কাউকে কাউকে সেখান থেকে গুলি করে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হতে পারে, শেখ হাসিনা কীভাবে এত বড় ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিলেন? তার ভারতীয় আধিপত্যবাদের ব্লাংক চেক মেনে নিলেও যে বিষয়টা বরাবর অলক্ষ্যে থেকে যায় তা হলো, দেশের বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশের নীরবতা, তোষামোদি ও বৈধতা প্রদান। ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভিন্নমত দমনে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছিল, তখন অনেক শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী ক্ষমতা, অর্থ ও পদ-পদবির মোহে অন্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান তৈরি করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে অতি কম মূল্যে বিক্রি করে ফায়দা হাসিল করা হয়েছে নানাভাবে। গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের মৌলিক গবেষণার উপজীব্য হয়ে উঠেছিল শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের গোলমেলে অংশগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলার ক্রমাগত কসরত, আর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল তার কন্যাকে। একধরনের প্রতিযোগিতা ছিল এই বাজারে। সুবিধাপ্রাপ্তির ধান্দা এত প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেই কেউ কেউ ধান্দায় নেমে পড়তেন নগদ লাভের আশায়।
দলদাসের রাজনীতির বাজারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’ মূলত একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে দলীয়ভাবে কে কত বড় অনুগত, তা দিয়ে পদ-পদবি নির্ধারণ হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ ‘উপাচার্য’ (ভিসি) বা প্রক্টর নিয়োগের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল দলদাসত্ব। ফলে ভিসিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক না হয়ে সরকারের লাঠিয়াল ও গোয়েন্দা বাহিনীর অনুগত দাসে পরিণত হন। ২০১৯ সালে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করার পর তাৎক্ষণিকভাবে বুয়েট প্রশাসন ও উপাচার্য শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। শুধু তিনি নন, বরং হলের তৎকালীন প্রভোস্ট অধ্যাপক জাফর ইকবাল খানও হত্যাকাণ্ডের রাতে শিক্ষার্থীদের আকুল আবেদন সত্ত্বেও হলে উপস্থিত হননি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সঠিক সময়ে ডাকেননি। এটি একাডেমিশিয়ানদের চরম নৈতিক অবক্ষয়ের একটি বড় উদাহরণ।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় যখন শত শত শিক্ষার্থীকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ অনেক শিক্ষক উপাচার্য ভবনে বসে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বুক লক্ষ করে গুলি চালানো বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে প্রফেসর মাকসুদ কামাল ক্যাম্পাসকে বহিরাগত ও শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ছাত্রলীগ যখন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর উপর্যুপরি হামলা চালাচ্ছিল, তখন প্রক্টরিয়াল বডি ও উপাচার্য পুলিশ এবং লাঠিয়াল বাহিনীকে প্রশ্রয় দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, একাডেমিশিয়ানদের একটি বড় অংশ টকশো, সেমিনার ও পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে একটি বয়ান তৈরি করেছিলেন—‘উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র বা ভোটাধিকার অপরিহার্য নয়।’ তারা মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণকে মেগা প্রজেক্টের চাকচিক্য দিয়ে জাস্টিফাই করার তাত্ত্বিক যুক্তি জোগাতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা ও ড. সাদেকা হালিমদের মতো তাত্ত্বিকরা টকশো ও সেমিনারে প্রতিনিয়ত ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক বয়ান তৈরি করতেন। বিরোধী বা ভিন্নমতাবলম্বী যেকোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ‘রাজাকার’, ‘জঙ্গি’ বা ‘দেশবিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করার পেছনে এদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী সরকারের সমালোচনা করলে তাকে ‘রাজাকার’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘দেশবিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হতো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনেক শিক্ষকের জেলে যাওয়ার ঘটনায় তাদের সহকর্মীরাই উল্টো আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। শিক্ষকরা যখন তাদের মেরুদণ্ড বিক্রি করে শাসকের লাঠিয়ালে পরিণত হন, তখন সমাজ তার দিকনির্দেশনা হারায়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই ফ্যাসিবাদের সহযোগী শিক্ষকদের পদত্যাগ ও সামাজিক বয়কট প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বিসর্জন দিলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
আমি নিজে যে ক্যাম্পাসে দীর্ঘ বছর অধ্যাপনা করছি, সেখানকার কথা বলি। উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী এমন একজনকে প্রক্টর বানিয়েছেন, যার প্রধান কাজ ছিল কয়েক দিন পরপর একজন করে ছাত্রকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে ছাত্রলীগকে দিয়ে পেটানো, মানিব্যাগ-মোবাইল কেড়ে নেওয়া এবং সবশেষে পুলিশে দেওয়া। আমি এরকম এক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী—আমার একজন ছাত্র, আল্লাম হোসেন। আমি সেদিন বিভাগে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। দুপুরে জানতে পারলাম, আল্লাম টিউশনে যাচ্ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা তাকে প্রচণ্ড মারধর করে তার মোবাইল-মানিব্যাগ কেড়ে নেয় এবং তাকে হাটহাজারী থানায় সোপর্দ করে। আমার এক সহকর্মীকে নিয়ে হাটহাজারী থানায় গেলাম, দেখলাম তাকে লোহার গ্রিলের দরজাযুক্ত একটা গারদে রাখা হয়েছে। কী নির্মম! বিস্তারিত জানলাম। ওসির কাছে গেলাম। ওসি বললেন, ‘প্রক্টর বললে ছেড়ে দেব।’ প্রক্টরকে ফোন করলাম, কথা বললাম; কিন্তু তিনি ছাড়তে রাজি হলেন না। এরা শিক্ষক হন কী করে? এ প্রক্টরের আরেকটা কাজ ছিল—‘এর পদোন্নতি আটকাও, ওর পদোন্নতি আটকাও!’ আমার বিশ্বাস একই কাজ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে। এখন উপায়ান্তর না পেয়ে তাদের অনেকে রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আমজাদ আলী এবং বিশেষ করে ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী প্রক্টর থাকা অবস্থায় বিরোধী মতের ওপর চলেছে ভয়াবহ নির্যাতন। ‘ঢাবিতে শিবির সন্দেহে শিক্ষার্থীকে মারধরের পর পুলিশে দিল ছাত্রলীগ’, ‘ঢাবিতে শিবির সন্দেহে শিক্ষার্থীকে রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ’—এ রকম শত শত রিপোর্ট পাওয়া যাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। অনেক অমানবিক ঘটনার কোন রিপোর্টও প্রকাশিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই প্রক্টররা শিক্ষকের মতো আচরণ না করে আওয়ামী নেতার মতো অথবা দায়সারা গোছের মন্তব্য করে কেটে পড়তেন। ফলে ছাত্রলীগ দানব হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, অন্যদিকে এসব দানবের ওপর, পেশিশক্তির ওপর ভর করে শেখ হাসিনা শক্তি সঞ্চয় করেছেন। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। প্রতিযোগিতা চলত—কে কার চেয়ে কত বেশি তোষামোদি করতে পারে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে অফার পেলে উপাচার্যের দায়িত্ব ছেড়ে যুবলীগ সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন (ইত্তেফাক, ১৯ অক্টোবর ২০১৯)। জানা যায়, তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকালে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। এর অর্থ হলো, দেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশের আওয়ামী লীগ হওয়ার প্রতিযোগিতা, সব ফ্যাসিবাদী প্রবণতায় তাদের নীরবতা, তোষামোদি এবং বৈধতা প্রদানই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে একটি বড় দায় বহন করেছে।
পাঠ্যপুস্তক বিকৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের মাধ্যমে ইতিহাসকে একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে উচ্চতর গবেষণা পর্যন্ত—সব জায়গায় ইতিহাসকে বিকৃত করে কেবল একটি দল ও পরিবারের বন্দনা করার কাজে এই একাডেমিশিয়ানরা নিজেদের মেধা বিক্রি করেছিলেন। পরিণতি ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শিক্ষা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করার পেছনে একাডেমিশিয়ানদের এই আপস এবং নৈতিক পতন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। একাডেমিশিয়ানদের একটি বড় অংশকে ব্যবহার করে কেবল এভাবে একটি পরিবার ও দলের ভূমিকাকে এককভাবে মহিমান্বিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করার একটি পরিকল্পিত তাত্ত্বিক প্রয়াস ছিল। মাধ্যমিক পর্যায় পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ আবাসিক হলে ছাত্রলীগ কর্তৃক বছরের পর বছর শিক্ষার্থী নির্যাতনের ভয়াবহ সব ঘটনার খবর ভিসি, প্রক্টর, প্রভোস্ট, হাউস টিউটর ও অধ্যক্ষরা জানলেও তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাঁড়াননি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ছাত্রলীগকে কোটি টাকা ‘ঈদ সেলামি’ বা বকশিশ দেওয়ার অডিও ফাঁস এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তিনি পদে বহাল থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীকির দুই মেয়াদে ৯০৭ জন শিক্ষক নিয়োগের নামে অনেককেই দীর্ঘস্থায়ী ভোটার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একাডেমিশিয়ানদের এই সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড ও নীরবতা প্রমাণ করে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের ভিত্তি শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের ওপর ভর করে গড়ে ওঠেনি; বরং এর পেছনে ছিল একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষাব্যূহ। শিক্ষকরা যখন নিজেদের নৈতিক অবস্থান ভুলে মেরুদণ্ড বিক্রি করে ক্ষমতার দাসে পরিণত হন, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের বদলে ফ্যাসিবাদের প্রজননক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে এই কলঙ্কিত অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের কতটা আপসহীন এবং সত্যপন্থি হওয়া প্রয়োজন, এ সংকট তা স্পষ্ট করে দেয়।
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়