হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

হাওরে বোরো বিপর্যয়ে কৃষকের কান্না

সৈয়দ আবদাল আহমদ

হাওর অঞ্চলের মানুষের সারা বছরের স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হলো বোরো ধান। কিন্তু এবারের অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় কৃষকদের সোনালি স্বপ্ন মুহূর্তেই তলিয়ে গেছে পানির নিচে।

চোখের সামনে কষ্টের ফসল হারিয়ে কৃষকরা দিশাহারা। অনেক কৃষককে এ জন্য বুকফাটা আর্তনাদ ও আহাজারি করতে দেখা গেছে। ঘটনা সইতে না পেরে একাধিক কৃষক হার্টঅ্যাটাকে মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়েন। কৃষকের এই চরম দুর্দশা ও চোখের পানি দেশবাসীকে ব্যথিত করেছে।

হাওরের এই বিপর্যয় দেখা দেয় এপ্রিলে। মাসের শুরুতে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় সাতটি হাওর জেলায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত সময়ে ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। হাওর অঞ্চলে কৃষিজমির প্রায় ১০ দশমিক ৭৮ ভাগ বা প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। আনুমানিক ২ লাখ ১৩ হাজার টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দুই লক্ষাধিক কৃষক সরাসরি দুর্যোগের শিকার হয়েছেন। কৃষকের জন্য বোরো ধানই বছরের একমাত্র আয়ের উৎস।

হাওর অঞ্চলে এই বিপর্যয় সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ থেকে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝিÑঅর্থাৎ এপ্রিল মাসের শুরু থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে দেখা দেয়। এ সময়টিকে স্থানীয়ভাবে ‘আগাম বন্যা’ বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ সময় বলা হয়।

বাংলাদেশে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে। হাওর অঞ্চলে বছরে মূলত একটিই ফসল হয়, সেটি বোরো ধানের আবাদ। এটি স্থানীয় ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সাধারণত শীতকালে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয় এবং মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ধান কাটার মাধ্যমে শেষ হয়। দেখা গেছে, অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বীজ বপন করা হয় এবং ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে চারা রোপণ শুরু হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে সাধারণত ৩৫-৪৫ দিনের সুস্থ চারা রোপণ করা ভালো। এ উপদেশ তারা কৃষকদের দিয়ে থাকেন। ভালো উৎপাদনের জন্য বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) সারের গড় মাত্রা নির্ধারণ করে দেনÑইউরিয়া ২৭ কেজি, টিএসপি/ডিএপি ১২ কেজি, এমওপি ২২ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি এবং দস্তা দেড় কেজি। বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর। তবে শীতের তীব্রতা বা শৈত্যপ্রবাহের সময় চারা রক্ষায় জমিতে ৫-৭ মিটার পানিও ধরে রাখতে হয়। হাওরের প্রধান সমস্যা হলো আগাম বন্যা, যা প্রতিবছর ফসল কাটার ঠিক আগে কৃষকদের ক্ষতির মুখে ফেলে। এ সমস্যার কারণে ব্রি-ধান ৯৬ বা ব্রি-ধান ২৮-এর মতো আগাম জাতগুলোর চারা হলে ১৫/২০ দিন আগেই ধান ঘরে তোলা যায়।

এবার অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় সাতটি হাওর জেলায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং কিশোরগঞ্জ জেলা। সুনামগঞ্জে ১৪ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায় পানিতে। দেখার হাওর ও করচার হাওর এলাকায় পড়েছে এসব জমি। কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে যায়। ইটনা, অষ্টগ্রাম, নিকলি, মিঠামইন, তাড়াইল এবং করিমগঞ্জ উপজেলার হাওরের জমিগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। নেত্রকোনার ১১ হাজার ৫২২ হেক্টরের বেশি জমির ধান ক্ষতি হয়েছে। খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া এবং কেন্দুয়া এলাকার জমি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের মেদির হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং কাওয়াদীঘি হাওর ও কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউনিয়নের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হবিগঞ্জ ও সিলেট এলাকার ৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।

অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় ফসল হারিয়ে দিশাহারা অন্তত দুজন কৃষকের মৃত্যুর দুঃখজনক খবরও ছাপা হয়েছে পত্রপত্রিকায়। একজন হলেনÑব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুরা গ্রামের বাসিন্দা আহাদ মিয়া নামে ৫৩ বছরের এক কৃষক। শ্রমিক নিয়ে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে তিনি দেখেন তার ছয় বিঘা জমির পাকা ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে। তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন তাদের সামনে পানির নিচে দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তীব্র মানসিক শোকে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারান ও মারা যান। চিকিৎসকদের মতে, তিনি হার্টঅ্যাটাকের শিকার হন। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আলীনগর পশ্চিমপাড়া গ্রামের আক্তার হোসেন নামে ৬০ বছরের এক কৃষকও একইভাবে মারা যান।

হাওরের বোরো ধান বিপর্যয়ের এ ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষদিকে হাওর এলাকার সদস্যরা বোরো ধানের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সংসদে তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি নেন। তিনি প্রশাসনকে দ্রুত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দেন এবং তাদের সহায়তামূলক বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাওর এলাকার বোরো বিপর্যয়ের সম্মুখীন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন। তাদের আগামী তিন মাস খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে মাসিক ভিত্তিতে সাড়ে ৭ হাজার, ৫ হাজার এবং আড়াই হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। হাওরাঞ্চলের ছয়টি জেলাÑসুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ‍সুবিধার্থে সরকার ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে সরকার-পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য হাওর অঞ্চলের একটি সমন্বিত উন্নয়ন রোডম্যাপ তৈরির কাজ করছে। এর পাশাপাশি ১৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী ও খাল পুনঃখনন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সরকার আরো সিদ্ধান্ত নেয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় রোধে ধান রোপণ ও কাটার সময় কিছুটা এগিয়ে আনার এবং স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবনে কৃষিবিজ্ঞানীদের সহায়তা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে হাওর অঞ্চলের বোরো বিপর্যয় পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, হাওর এলাকার সংসদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছাতে হবে এবং স্বচ্ছ ও নির্ভুল তালিকা তৈরি করে কৃষকদের সহায়তা করতে হবে। অতিবৃষ্টি বা আগাম বন্যা আসার আগেই ধান কাটা শেষ করা যায়, এর উপায় বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জেলা প্রশাসকদের কৃষকদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। এদিকে হাওর অঞ্চলের অপরিকল্পিত স্থাপনাও যাতে সমস্যার সৃষ্টি না করে, তা খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন। গত শনিবার সরকারের কৃষিমন্ত্রী ও পানিসম্পদমন্ত্রী নাসিরনগর উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মারা যাওয়া কৃষক আহাদ মিয়ার পরিবারকে সান্ত্বনা ও সহায়তা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চল সফর করেন। সেখানে তিন বলেন, হাওর রক্ষায় কেবল সাময়িক ত্রাণ বা মানবিক সহায়তা যথেষ্ট নয়, বরং এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে যাচ্ছে। তিনি জানান, তালিকাভুক্ত প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারকে মাসে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এ সহায়তা তিন মাস পর্যন্ত চলবে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ ইয়াছিন সফর করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাছিরনগর উপজেলা। তিনি মেদির হাওরে গিয়ে নষ্ট হওয়া বোরো ধানের বিস্তীর্ণ এলাকা দেখেন। তিনি বলেন, ‘আমিও একজন কৃষক, কৃষকের দুঃখ-কষ্ট আমি বুঝি। আমার ধান এভাবে নষ্ট হলে আমিও সেই বেদনা অনুভব করতাম।’ তিনি নিহত কৃষক আহাদ মিয়ার পরিবারের হাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন। তিনি আরো বলেন, দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের ঋণমুক্ত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।

লেখক : প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব

সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে জাতীয় প্রেস ক্লাব

এসব ভিসি লইয়া আমরা কী করিব

অভিবাসীদের নিরাপত্তা কোথায়

বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য যৌক্তিকীকরণ কীভাবে হতে পারে

উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সহায়তা

রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাম্প্রতিক ভাবনা

ভারতীয় গণতন্ত্রের হিসাব মেলানোর পালা

সরকার কি পথ হারাচ্ছে

পুরুষতন্ত্রের ছায়ায় নারীর রূপান্তর

‘মোদি হটাও, ভারত বাঁচাও’