হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে কারা

এম ডি জিয়াবুল

ছবি: এআই

যে বয়সে কাঁধে থাকার কথা স্কুলব্যাগ, চোখে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই বয়সে যদি কোনো কিশোরের চোখে জমে ওঠে দম্ভ, মুখে উচ্চারিত হয় হুমকি আর তার চারপাশে তৈরি হয় আতঙ্কের বলয়, তবে বিষয়টি নিছক কয়েকজন কিশোরের বেপরোয়া হয়ে ওঠার গল্প নয়। এর পেছনে থাকে একটি সময়, একটি পরিবেশ, কিছু অদৃশ্য প্ররোচনা এবং কোথাও কোথাও এমন কিছু প্রাপ্তবয়স্কের হাত, যারা নিজেদের স্বার্থে কৈশোরদের ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না।

‘কিশোর গ্যাং’ শব্দ দুটি এখন আমাদের নগরজীবনের পরিচিত আতঙ্ক। পাড়ার গলি, বাজারের মোড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ কিংবা জনবহুল এলাকার নির্জন কোণে দল বেঁধে ঘোরাফেরা করা কিশোরদের নিয়ে মানুষের মনে উৎকণ্ঠা তৈরি হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘাত, দাপট দেখানোর প্রবণতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রতার প্রদর্শন—এসব দৃশ্য আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। অথচ এই কিশোরদের অনেকেই একদিন মায়ের হাত ধরে স্কুলে গেছে, মাঠে ছুটেছে, বইয়ের পাতায় নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজেছে।

তাহলে সেই ছেলেটি কোথায় হারিয়ে গেল

একটি কিশোর এক সকালে ঘুম থেকে উঠেই অপরাধী হয়ে যায় না। তার পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে। পরিবারে অশান্তি, অভিভাবকের সময়ের অভাব, শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা, সঙ্গদোষ, অর্থনৈতিক অনটন, সামাজিক অবক্ষয় ও অরাজকতা, অবসর সময়ের অপব্যবহার এবং অনলাইন জগতের নেতিবাচক প্রভাব—বিভিন্ন উপাদান তার মনোজগতে জমা হতে থাকে। যেখানে সুস্থ বিনোদন নেই, খেলাধুলার মাঠ নেই, বই পড়ার পরিবেশ নেই, সেখানে শূন্য জায়গা দখল করে নিতে পারে বিপথগামী সঙ্গ।

কিশোর মন খুব সহজেই স্বীকৃতি চায়। সে চায়, কেউ তাকে গুরুত্ব দিক, তার কথা শুনুক, তাকে আপন করে নিক। এই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাটিকেই অপরাধী চক্র কাজে লাগাতে পারে। বেশি বয়সি কয়েকজন মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা, তাদের কাছ থেকে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া, অর্থ বা নানা সুবিধা লাভ—এসবের মধ্য দিয়ে একটি কিশোরের মনে জন্ম নিতে পারে কৃত্রিম ক্ষমতার অনুভূতি। তখন তার কাছে ভয় দেখানো হয়ে ওঠে সাহস, দাপট হয়ে ওঠে মর্যাদা আর অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করাই হয়ে ওঠে সাফল্যের মাপকাঠি।

এখানেই আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন—কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে কারা?

শুধু কিশোরদের দিকে আঙুল তুললেই কি উত্তর পাওয়া যাবে? কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু তাকে প্রভাবিত করেছে কে, অপরাধের পরিবেশে টেনেছে কে, তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে কেÑসেসব প্রশ্নও সামনে আনতে হবে। বাংলাদেশ নিয়ে ইউনিসেফের গবেষণায় শিশুদের অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং সামাজিক সুরক্ষার নামে গড়ে ওঠা সম্পর্কের জটিলতার কথা উঠে এসেছে।

আরো গভীরে গেলে দেখা যায়, স্থানীয় ক্ষমতার সংস্কৃতিও কিশোরদের মানসিকতায় বিষ ঢেলে দেয়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তোলা, তার নাম ভাঙিয়ে এলাকায় দাপট দেখানো কিংবা অপরাধের পরও পার পেয়ে যাওয়ার গল্প—এসব দৃশ্য কিশোরদের মনে আইনের প্রতি ভীতি ক্ষয় করে। তারা তখন ভাবতে শেখে, শক্তিই শেষ কথা। এই মানসিকতা এক দিনে তৈরি হয় না; সমাজের চোখের সামনেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ফলে কিশোর অপরাধের সঙ্গে লড়াই করতে হলে অপরাধকে আশ্রয় দেওয়া সামাজিক কাঠামোর দিকেও নজর দিতে হবে। অনেক স্থানীয় নেতা ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষকে দমনসহ বিভিন্ন নোংরা প্রয়োজনে কিশোরদের ব্যবহার করেন।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্ধ অনুকরণও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভার্চুয়াল জগতের প্রদর্শন যখন বাস্তব জীবনে মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন কিছু কিশোর দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার নেশায় অস্বাভাবিক আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারে। দাপটের দৃশ্য, সংঘাতের ভিডিও কিংবা অপরাধীসুলভ ভঙ্গি অনুসরণ করার প্রবণতা তাদের স্বাভাবিক মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। তাই ডিজিটাল পরিসরেও পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সচেতন উপস্থিতি প্রয়োজন।

আরেকটি বড় সংকট হলো মাদক ও অপরাধের পারস্পরিক যোগসূত্র। মাদকের বিস্তার কোনো একটি পরিবারের ক্ষতি করে থেমে থাকে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে মহল্লা থেকে মহল্লায়। কিশোর বয়সে ভুল সঙ্গ ও মাদকের সংস্পর্শ একজন তরুণকে আরো গভীর অপরাধজগতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইউনিসেফও শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সামাজিক পরিবেশ, মাদকসহ বিভিন্ন ঝুঁকির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে।

তবে দায় শুধু পরিবারের নয়। একটি শিশু প্রতিদিন যে সমাজের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে, সেই সমাজও তার চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রাখে। আমাদের পাড়ায় মাঠ কমে যাচ্ছে, পাঠাগারের দরজা বন্ধ হচ্ছে, সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর যে মাঠে কিশোরদের দৌড়ানোর কথা, সেখানে হয়তো বহুতল ভবনের ছায়া। যে জায়গায় বই নিয়ে বসার কথা, সেখানে নেই কোনো পাঠচক্র। অব্যবহৃত সময় তখন অন্য কারো হাতে চলে যায়।

কিশোরদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে জীবনের পথে ফিরিয়ে দিতে হলে খেলাধুলার মাঠ ফিরিয়ে দিতে হবে, সৃজনশীলতার দরজা খুলতে হবে, অপরাজনীতির ছায়া থেকে তাদের মুক্ত রাখতে হবে। পরিবারকে সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে হবে, শিক্ষককে শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা পড়তে হবে, সমাজকে তার চারপাশের বিপজ্জনক সম্পর্কগুলো চিনতে হবে।

লেখক: কবি ও ছড়াকার

ইসরাইলের নির্বাচন: মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এর তাৎপর্য কী

বিজেপির ঘুম হারাম: তাড়া করছে ভিন্নমতের ভূত

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

মোদির ভোটাধিকার হরণের কৌশল

একাডেমিক স্বাধীনতা যখন বুলিংয়ে পরিণত হয়

বিপ্লবের সাইরেন শহীদ আবরার ফাহাদ

নোয়াখালী যেভাবে বদলে দিয়েছিল উপমহাদেশের মানচিত্র

আলোর সুইচ, ভূতুড়ে কণা ও অণুর আয়না

বেসামরিক অভিযান নয়, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা জরুরি

ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা এবং আমাদের সিনিয়র সাংবাদিকরা