আমাদের বাল্যা পাড়ার বেলেল্ল্যা ব্যাপারী যখন বলল, ‘বালবাসা দিবসের বালেন্টাইন ডে মারাইতে গারল-ফেরেন্ড খাওয়াইতে (নাকি খাইতে) যাইতাছি, একটু দুয়া কৈরেন’ প্রমাদ গুনলাম। বুঝলাম, গাড়লটা ঠিক, ৪০ বছর পূর্বে আমার যুক্তরাষ্ট্রের এমাইটি আর হার্ভার্ডে উচ্চত গবেষণার সময়, অনেকটা ঘটণাচক্রেই যে একটি মানসিক রোগ আবিষ্কার করে তার নাম দিয়েচিলাম, `কম্প্রাডরাইসিস', তার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। নানা জটীল উতপত্তিতগত কারণ ও উপসর্গের ভেতর তার প্রধান লক্ষণ, হীনমন্যতাবশতঃ নিপীড়ক বিজাতীয়ের অপসংস্কৃতিমূলক সচেতণ অন্ধানুকরণে `জাতে ওঠার' হাস্যকর অবচেতণ অপচেষ্টা।
তখন এ নিয়ে একটি ছোট বইও লিখেছিলাম, দেশে ফিরে আসলে সেই নবাবিষ্কৃত রোগটি, আর সেকালে আমার গবেশণার আরেক বিষয় – ‘ওয়ার নিঊরসিস’ - সহ অন্যান্য মানসিক রগের গণমুখী চিকিতসার জন্য আমাদের অতি শ্রদ্ধেয় অগ্রজ-প্রতীম, এক সময়ের পাড়াতুতো ভাই, ডাঃ জাফরুল্লাহর তখন নতুন শুরু করা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অনুসরণি অনেক্ট, একটি গণ ম্নস্বাস্থ্য কেন্দ্রও শুরু করতে চেয়েচিলাম, ৮০-এর দশকের শেষ দিকে।
সেটা আর হয়ে ওঠে নি। কিন্তু এসব মানসিক অসুখ যে সম্প্রতিই যুদ্ধ-পরিস্থিত ভোগ করা জাতিতে ‘মীম’ নামক মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া মানসিক পর্যায়ে দ্রুত সংক্রমিত হয়ে মানসিক রোগ মহামারীর আকার ধারণ করবে, তার আশঙ্কা করেছিলাম। এক্ষণে বেলাল্ল্যা বাঙ্গালের “বালবাসা দিবস”-এর খায়েশ দেখে সেই কথাই মনে পড়ে গেল।
বেলাল্যার যাই হোক, জাতি ও জনগনের বৃহত্তর স্বার্থে, ভাব্লম বিশয়টি নিয়ে একটু খোলাসা করে বলে দিলে ভাল হবে – যার শোণার শুনবে, যার শোণার নয় সে মজার সোণা লুঠের সুযোগ গুনবে, মরবে!
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’
`ভালবাসা দিবস' বলে - ইংরেজীতে যাকে `সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে' বলে - তার উদযাপনের নামে যে বেলেল্লাপণা গত দু চার বছর থেকে শুরু হয়েছে, তার মূলের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে দু’চার জনের এই নাবালক-বেয়াদব সুলভ বাঁদরামী এক অপসাংস্কৃতিক অশ্লীলতা । তৃতীয় খৃষ্টীয় শতকে, য়ূরোপের যেই বিশ্বাস-প্রদীপ্ত সন্ত ভালেন্তীনের আত্মোতসর্গের স্মরণিকা রূপে তার পালন শুরু হয়েছিল, তাঁর কাহিনীই ছিল এইরূপ অশ্লীলতা ঠেকাতে তরুন তরুনীদের প্রতি তাঁর স্নেহসিক্ত এমন মহান মহত কর্ম, যার জন্য নিষ্ঠুর, অবিশ্বাসি, স্বৈরাচারি রোমক শাওকের হাতে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়।
তাঁর নামই কি ভালেন্তীন, না এটা তঁর জনপ্রিয় উপাধি, তা ঠিক জানি না। সে সময় য়ূরোপের বিশালতর প্রধান শক্তি, soda-সার্বিক সহিংস, নিষ্ঠুর পৌত্তলিক রোমকদের রোমক সাম্রাজ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ঈসা নবী বা য়ীসু খৃষ্ট (আঃ)-এর শেখানো প্রচারিত, মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্যিক ধর্মের যা কিছু সামান্য তখনো, নানা রূপ ভ্রান্তি মিশ্রিত হয়ে পড়া সত্বেও, ‘খৃষ্ট’-ধর্ম পরিচিতি নিয়ে বাকী ছিল, তারi শিক্ষাদান ও প্রচারে ব্যপৃত এক দ্রবেশের মত ছিলেন। এ জন্য সম্ভবতঃ মধ্যপ্রাচ্যিক ধর্ম-ভাষায়, বা তার প্রভাবে, তাঁকে ‘ওয়ালিউন-দীন’ বা ‘ওয়ালীউদ্দীন’, অর্থাত ধর্মের ওলী বা বন্ধু -তথা ‘দরবেশ’ বা ‘সন্ত’ - বলা হত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে য়ূরোপ, তথা রোমক সাম্রাজ্যে যেতে হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যিক ধর্ম, আর ধর্ম ভাষার শব্দাবলিকে তুরষ্ক হয়ে, আর এই এলাকার উচ্চারণাভ্যাসে “দ” উচ্চারিত হয়, ‘ত’ রূপে – আর ‘ই’-কার উচ্চারিত হয়, ‘এ’-কার রূপে। ফলে, ওয়ালীউন-দীন ওয়ালে’ন-তীন বা ওয়ালেন্তীন-এ রূপান্তরিত হয় । তুরষ্কের স্থানীয় উচ্চারণ ও লিখন-পদ্ধতিতে মূল মধ্যপ্রাচ্যের ‘ওয়’ হয়, ‘ভ’। আজকের আধুনিক তুরষ্কেও ‘দ’, ‘ত’ - ‘ওয়’, ‘ভ’ হিসেবে উচ্চারিত ও লিখিত হয় অনেক সময়। এ ভাবে ওয়ালিউদ্দীন রূপান্তরিত হয়, ‘ভালেন্তীন’।
ঐ ‘ভালেন্তীন’ ততদিনে সেমেটিক লিখন-পদ্ধতির অপভ্রংশায়নে ‘রোমান’, অর্থাত ‘রোমক’ বর্ণমালা রূপে উদ্ভূত হরফে ‘Valentin’ লেখা শুরু হয়। রোমকদের ভাষা ছিল লাতিন, তার – বা রোমকদের ভাষা অর্থে ‘রোমান্স’ নামে পরিচিত হয়ে পড়া, তার সাক্ষাত উত্তরসূরী ইতালীয়, স্প্যানিশ ও ফরাসী উপভাষার সর্বশেষ উল্লেখিতটির প্রভাবে, তা ‘Valentine’ লেখা হয়। ফরাসীদের উচ্চারণাভ্যাসে শব্দের শেষে ‘ন’, অর্থাত ‘n’ থাকলে তা সাধারনতঃ চন্দ্র বিন্দু হয়ে যায়, ফারসীতেও অনেক সময় তা’ই হয়। ‘ন’-টা যে চন্দ্র বিন্দু নয়, ণ’ হিসেবেই উচ্চারণ করতে হবে, তা বোজানোর জন্য, ফরাসীতে ও রকম অবস্থানে পড়া `ন’, তথা ‘n’-এর পরে এক্টি অতিরিক্ত ‘ন’ বসিয়ে, তার পরে একটি ‘e’-ও বসিয়ে দেয়া হয় অনেকটা ভাষাগত একটি বিশেষ করনীয় ইঙ্গিত দেয়ার মত। বহু ভাশাহায়ই এমন রেওয়াজ আছে। উদাহরন স্বরূপ চীনা ভাষায় এক্টি বাক্য যদি প্রশ্নবোধক হয়ে থাকে, তা হলে, তা বোঝাতে বাক্যের শেষে ‘মা’ যোগ করে দেয়া হয়। একই ভাবে হিব্রুতে কারো নাম সম্মানিত হলে, নামটির শেষে ‘ম’, প্রাচীন আরবীতে সে ভাবেই ‘ম্ম’ যোগ করা হয় সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালবাসা জ্ঞাপন করতে - যেমন হিব্রু বাইবেলে হজরত মোহাম্মদের নাম লেখা ও উচ্চারোণ করা হয়, ‘মহম্মদম’, আর মুসলমানদের নামাজে শেষের দিকে আল্লাহর নাম বলতে গিয়ে বলা হয়, ‘আল্লাহুম্ম’।
সন্ত , ‘সেন্ট’ – পবিত্র সত্তা
উপরোক্ত ফরাসী অভ্যাসে, মূলতঃ যা সম্ভবতঃ ছিল “ওয়লি-উদ্দীন” তুরশক আর রোমক সাম্রাজ্য হয়ে, পশ্চিম য়ূরোপে এসে লিখিত হতে শুরু করে, ‘Valentin’, ‘Valentinne’ বা ‘Valentine’ রূপে। সেখান থেকে তা আরো উত্তর-পচিমে গিয়ে ইংরেজীতে তা উচ্চারিত হয়, ‘ভ্যালেন্টাইন’। সম্ভবতঃ এভাবেই ‘ওয়লিউদ্দীন’ অপভ্রংশে হয়, ‘ভ্যালেন্টাইন’। উনাকে তাঁর মূলতঃ অনার্য সেমিটিক একেশ্বরবাদী ধর্মের ‘খৃষ্টীয়’ সংস্করণে বিশ্বাসীগণ, নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী, বহু দেব্ দেবI র পুতুল-পূজারি পৌত্তলিক আর্য, রোমান সাম্রাজ্যের নিষ্পেষনেও সত্য ধর্মের যা কিছু তখনও, কিছুটা বিকৃত অবস্থায়ও, থেকে ছিল – তার চর্চা ও শিক্ষাদানের করণ তাঁকে ‘সন্ত’, অর্থাত ‘পবিত্র’, বলা হয়।
কারণ এধরণের ব্যক্তিরা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে – আর নিজের মাধ্যমে, নিজের পরিবেশকে পবিত্র করবার সাধণায়, ভুল দু:খ কষ্টের ভেতর দিয়েও, জীবণ উতসর্গ করেন । এ জন্যই খৃষ্টের উর্দ্ধারোহনের পর তাঁ শিক্ষা জাগরূক রেখে তার প্রচার ও প্রশিক্ষনের নেতৃত্বর দায়ীত্ব তিনি যে সন্ত ‘সমীউন’, যাকে পাশ্চাত্য এখন ‘সেন্ট পিটার’ বলে, তাঁকে নিজের শিক্ষা প্রচার প্রতিষ্ঠার ‘সফা’ বলে সম্বোধন করেন – ‘সফা’-এর বিভিন্ন অর্থের একটি হলো ‘সাফ’, অর্থাত পরিষ্কার বা পবিত্র করা। অন্য আরেকটি অর্থ হল পর্বত-পার্শ্বরূপ বিশাল সমতল প্রস্তর-খন্ড। কোরান শরীফের পরিভাষায় ‘সফা’-কে ‘তাজকিয়া’ বলে, যা কালে বেশী ‘তাসাউ’উফ’ নামে পরিচিত হয়ে পড়ে, অর্থ দু’টোরই মোটামুটি একই, পরিষ্কার বা পবিত্র করা।
আত্মশুদ্ধি সাধণা শিক্ষা কেন্দ্র - ‘সফা’, ‘সুফফা’
আর নবীজ্বীর (দঃ) মদীনা শরীফে এসে মসজিদ নববী (দঃ) প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের পরিবার নিয়ে থাকবার জন্য তাঁর তখনকার দু’জন স্ত্রীর জন্য, আর নিজের কন্যা ফাতেমার জন্য, ছোট ছোট তিনটি কক্ষ সহ ক্ষুদ্র একটি বাসা, আর সব কিছু হারিয়ে তঁর কছে থেকে শিখতে আসা সঙ্গীদের থাকবার জন্য বড় সড় একটি চ্যাপ্টা পাথর বিছিয়ে দেন, তাঁর ঐ সাসার সাম্নে, মসজিদেরই পাশে। ঐ চ্যাপ্টা পাথরটিকে ‘সুফফা’, অর্থাত ‘ছোট্ট পাষাণ’ বলা হয়, আর সব হারিয়ে নবীজ্বীর দোরগোড়ায় আশ্রয় নিয়ে তাঁর (দঃ) কাছে শিখতে থাকেন, তাঁদের ঐ ‘সুফফা’-বাসীদের ‘সূফী’ বলা হয়। নবীজ্বীর ঐ ক্ষুদ্র বাসাটির কক্ষকে কোরান শরীফের ভাষায় বলা হয়, ‘হুজরা’, বা বহুবচণ – ‘হুজুরাত’। তারই অনুকরণে, তাঁদের অনুসারীরা গত দেড় হাজার বছর ধরে যেখানে যেখানে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন সনদ-ধারায় নিয়োগ দেয়া শিক্ষকের দোর গোড়ায় থেকে তাঁর কাছ থেকে শিখতে আসা শিক্ষার্থীদের থাকবার জায়গা সহ শিক্ষকের নিজের পর্দাসহ সপরিবার থাকবার ঘর সহ ক্ষুদ্র বাসা বাড়ী প্রতষ্ঠা করেন।
নবীজ্বীর (দঃ) এই ব্যবস্থাটি তাঁর মসজিদের পাশে এক কোণায় ছিল – আর তার অনুকরণে পরবর্তীরাও সম্ভব হলে তাঁদের মসজিদের পাশে এক কোণায়ই তা প্রতিষ্ঠা করতেন – তাই কালে ঐরকম নবী-নিযুক্ত শিক্ষকের বসবাসের জায়গা কেন্দ্রিক এমন শিক্ষালয় কে, আরবীতে ‘জাবিয়াহ’, অর্থাত ‘কোণা’ বলা হতে শুরু করে। মরোক্কো আর সূদান থেকে মিশর আর সিরিয়া হয়ে ইয়েমেন পর্যন্ত আরবী প্রধান দেশগুলো সহ অনেক জায়গায় আজো এমন বহু “জাবিয়াহ” রয়েছে। এমন কি পাশ্চাত্যেরো অনেক জায়গায়, যেখানে গিয়ে আরবী-ভাষীরা বসত করেন, সেখানের অনেক খানে।
আবার অনেক জায়গায়, বিশেষ করে মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান সহ মধ্য প্রাচ্যের অনেক জায়গা থেকে, বাংলাদেসশ সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কোথাও কোথাও, যেখানে আব্বাসীয় খলীফাদের যুগের এক পর্যায় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত প্রধান সরকারী ভাষা হয়ে পড় ফারসী, সেখানে সম্ভবতঃ আরবী ও ফারসী শব্দের সংমিশ্রণে সৃষ্ট শব্দ দিয়ে, এরকম ভাবে ঐ রকমের সনদ-ধারা নিযুক্ত শিক্ষক্কদের ছোটত বাসাবাড়ী কেন্দ্রিক ধর্ম শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচালনার মূল জায়গাকে, বলা হয় ‘খানকাহ’ – আক্ষরিক অর্থেই ক্ষুদ্র বস্তবাড়ী, বা ‘ছোট্ট সরাইখানা’। আরবীতে সরাইখানাকে বলে ‘খান’, ফারসীতে বাসা-কে বলে ‘খানা’, সংক্ষেপিত রূপে তা’ও ‘খান’, আর ‘ক্ষুদ্র’ জ্ঞাপক ফারসী ‘চা’-র মঙ্গোল-তুর্কী প্রভাবিত রূপে আরবী হরফে ‘ক্বা’ হয়ে পড়া ‘ক্বা’ মিলিয়ে হয় ‘খানক্বাহ’, যা পরে কোন কোন জায়গায় ‘খাঙ্কাহ’ বলে লিখিত ও উচ্চারিত হয়। নবীজ্বী নতুন কোন ধর্ম শেখান নি, শেখান আদি ধর্মের পরিষ্কৃত, পরিবর্দ্ধিত রূপ।
নবী ঈসাও তাই করেছিলেন। তাই জনপ্রিয় হয়ে পড়া পরিভাষাগত কিছু কিছু তফাত থাকলেও, এ দু’ইয়ের শেখানো প্রচারিত ধর্ম-রূপের মূল সুর, মর্ম, একই। নবীজ্বী (দঃ) নিজে, নিজের কাছাকাছি দুই আঙ্গুল দেখিয়ে বলেন, তিনি আর ঈসা (আঃ) এই রকম, অর্থাত অতীব নিকট। তাঁর শেখানো কোরান শরীফে বলা আছে, তিনি (দঃ) যা নিয়ে এসেছেন, তা ঈসা নবী (আঃ)-এর মত পূর্বতন নবীদের শিক্ষারই সত্যায়ন-সহ । আর খৃষ্টের শিক্ষার আকর, “বাইবেল”-এর যে সব শত শত সংস্করণকে রোমক সাম্রাজ্যের স্বৈরাচারী সম্রাট তাঁর পৌত্তলিকতা প্রভাবিত প্রাচীন আর্য রোমক বিশ্বাসের সঙ্গে না মেলার কারণ নিষ্ঠুর ভাবে দমন করেন, পরে প্রাপ্ত এরকম একটি সংস্করণ, যা তাঁর অত্যল্প সঙ্খ্যক সাক্ষাত শিষ্যদের একজন, বারনাবাসের সংকলিত সংস্করণে বলা হয়, নবী ঈসা তাঁর পরে আহমদ নামে যে নবী আসবেন, তাঁর - অর্থাত হজরত মোহাম্মদের (দঃ) অনুসরণের জন্য বলে যান।
এ সব করণ, খ্রিষ্ট ধর্মের সব কিছুই - যা খৃষ্টের পরে তাতে অননুমোদিদত ভাবে যোগ করা হয়েছে বলে নবীজ্বীর শিক্ষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তা ছাড়া- নবীজ্বীর (দঃ) শেখাণো ধর্মে অন্তর্ভুক্ত। আর একই ভাবে, নবীজ্বীর শেখানো ধর্মের অনেক কিছুই খৃষ্টানদের পালিত ধর্ম-রূপে, পূর্ব থেকেই ছিল কোন না কোন ভাবে। আর তার অনেক কিছু খৃষ্টানেরা পরে নবীজ্বীর (দঃ) অনুসারীদের কাছ থেকে শিখে পালন করতে শুরু করেন।
মোনাস্টরী
উদাহরণ স্বরূপ, মধ্য যুগে মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে এসে তাঁদের তসবীহর দানায় জিকির করতে দেখে তা শিখে নিজেদের সঙ্গে য়ূরোপে নিয়ে গিয়ে প্রচলন করেন। আর এভাবেই, নবীজ্বীর আবির্ভাবেরও সাড়ে ৪০০ বছরের মত পূর্বে, আর্য পৌত্তলিক রোমকদের রোমক সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে যেরূসালেমের নিকট নাসারা-তে আবির্ভূত অনার্য সেমিটিক নবী য়ীস, বা যীশু বা ঈসা (আঃ)-এর প্রচারিত আদি ধর্ম চর্চা, প্রচার ও শিক্ষা দিচ্ছিলেন পূর্বোল্লিখিত ওয়লিঊদ্দীন, বা “ভালেন্তীন”, সে সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম-এ, সম্ভবতঃ তাঁর ক্ষুদ্র সরাই-রূপী বাসস্থান, বা ”জাওয়িয়া” বা “খানকাহ” থেকে ।
খৃষ্টধর্ম রোমে গিয়েছিল রোম আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবর্তী সেকালের বিস্তৃততর গ্রীক জগত হয়ে, ফলেয়ূ রোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে তার মূল ধর্মগ্রন্থ ও দলীলাদি গ্রীক ভাষায় অনুদিত হয়ে, মূল ভাষায় সেসবের যা কিছু ছিল – ব্যবহারের অভাবে – তা হারিয়ে যায়। ফলে মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্যিক অনার্য সেমিটিক খৃষ্ট ধর্মের অনেক কিছুই গ্রীক ভাষার মাধ্যমে চলে আসা পৌত্তলিক আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে পড়, কোন কোন ক্ষেত্রে কিছুটা বিকৃতও। যেমনটি হতে বাধ্য মুসলমানদের ধর্মের ক্ষেত্রেও, তুলোণামূলক সম্প্রতিই প্রধানতঃ মূলতঃ, প্রথমতঃ অমুসলিম প্রাচ্যবিদ দের দ্বারা সূচিত কোরান-হাদীস তার মূল ভাশা থেকে অনফ্যন্য অনুবাদ করে তার ওপরই নির্ভর করার ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক অভ্যাসের ফলে।
সামান্য সুবিধার লোভে, এ যেন নাক কেটে নোলক পাবার চেষ্টা ! খৃষ্টের শেখানো মূল, মধ্যপ্রাচ্যিক অনার্য আদিধর্ম ও ভাবে গ্রীক প্রভাবিত হয়ে য়ূরোপে যেতে যেতে তার ধর্মীয় পরিভাষার অনেক কিছুই মূল সেমিটিক ভাষার শব্দ হারিয়ে গ্রীক ভাষাতে তার প্রতিশব্দ যা মনে হয়, তাতে পর্যবসিত হয়। এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যিক সেমিটিক হিব্রু, আরামী, আরবীর ‘সফা’, বা ‘সুফফা’ পরিবর্তিত হয়ে হয়ে পড়ে ‘পেত্রস’, যা কালে ইংরেজীতে হয় ‘পিটার’ – যে জন্য তাঁর প্রধান শিষ্য ও প্রথম ‘খলীফা’ (নেতৃত্বের কার্যভার-প্রাপ্ত অর্থে, ‘স্থলাভিষিক্ত’), যাঁকে তিনি নিজের ধর্মের ‘সফা’, তথা আত্মশুদ্ধি শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি প্রস্তর বলেছিলে, সেই ‘সফা’, বা ‘সূফী’, সমীউন, ইংরেজীতে ‘সেন্ট পিটার’ বলে পরিচিত হয়ে পড়েন। এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে যা পরিচিত ‘সুফফা’, ‘জাবিয়া’, বা ‘খানাহ’ বলে, তা গ্রীক প্রভাবে য়ূরোপে হয়ে পড়ে, ‘মোনাস্ত্রী’, যা ইংরেজীতে হয়- ‘মনাস্টরী’। যেভাবে, অন্যান্য জায়গায়ো এওমন শব্দগত পরিবর্তন হয় – উদাহরণ স্বরূপ মালয়েশীয়া ইন্দোনেশিয়ায় এসে, আরবীর ‘ফন্দক’ হয়ে, স্থানীয় প্রভাবে হয়, ‘পন্ডক’; পাঞ্জাবে কোথাও কোথাও, হয়, ‘গুরুদ্বার’, বা ‘গুরুদুয়ারা’, যেখান থেকে পরে শিখরা ধর্ম সাধণার কেন্দ্র বোঝাতে ‘গুরুদুয়ারা’ নাম ব্যবহার করতে শুরু করে।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন রোমে আত্মশুদ্ধি শিক্ষাকেন্দ্র রূপ তাঁর ক্ষুদ্র আস্তানা, বা মোনাস্টরীতে সস্নেহে তরুণ তরুণীদের শুদ্ধ, পবিত্র জীবণের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দিতেন, পৌত্তলিক শাসকদের নির্যাতনের মুখে – সংগোপণে। অত্যাচারী আর্য পৌত্তলিক স্বৈরাচারী শাসনাধীন সাম্রাজ্যে – আর তা’ও, তাদের রাজধানীতেই, ছিল খুবই বিপজ্জনক। য়ীস খৃষ্ট, তথা নবী ঈসা (আঃ)-এর নাসারা ও যেরূসালেম সহ তার আশপাশে- আর নবী হজরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর মক্কা শরীফে প্রথম দিকে যেভাবে সত্য, আদি ধর্ম প্রচার ও শিক্ষাদান করতেন গোপনে, ঘরের ভেতর – সন্ত “ওয়লিউদ্দীন” বা “ভালেন্তীন”ও সম্ভবতঃ সেভাবেই তা’ করতেন সংগোপনে। ধর্ম চর্চার অনগশ হিসেবে তিনি তাঁর শিষ্য তরুণ তরুণীদের প্রেমে পড়ে পাপে পড়া থেকে বাঁচানোর জন্য ধর্মমতে “নিকাহ” করিয়ে দিতেন, ধর্ম রক্ষা করে যত খানি গোপণে সম্ভব, ততখানি গোপণেই।
যাদু-টোনা, শয়তান-উপাসণা
পৌত্তলিক রোমক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যৌনতার মিথ্যা দেব দেবীর পূজার নামে নানা অশ্লীল উতসব, আচার অনুষ্ঠান হত, এ সবে ধর্মে নিশিদ্ধ নানা পাপাচার হত ।
আর্যগণের পূর্বপুরুষ, নূহ বা মনুঃ-পুত্র ইয়াফেসের অধস্ত:ন পুরুষেরা, তাঁদের সহ মানব জাতির আদি নিবাস, মধ্য প্রাচ্যের দজলা-ফোরাত উপত্যকা ছেড় উত্তর দিকে মধ্য এশিয়ায় এসে এক পর্যায়ে পরিবেশগত কারণ সহ বিভিন্ন কারণে দুর্ধর্ষ, হিংস্র, সভ্যতা বিবর্জিত হয়ে পড়লে – সভ্যতার আদিভূমি, আদি নিবাস মধ্যপ্রাচ্যে থেকে যাওয়া, ইয়াফেস-ভ্রাতা সামের অধঃস্তণ পুরুষ, “সেমেটিক”-রা তাদের এক সময় ‘আর্য’, অর্থাত, উলঙ্গ-নির্লজ্জ অসভ্য বলে অভিহিত করে।
আর্যরা আদি নিবাস ছেড় যে মধ্য এশিয়ায় এসেছিল, এখানেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে টিকতে না পেরে, এক দিকে ইঊরোপ, অন্য দিকে ভারত বর্ষ আর চীনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, অন্য দিকে মধ্য-প্রাচ্যে ণূহ বা মনূঃ-, ও তাঁর পরে তাঁর শ্রেষ্টতম সন্তান – সামের শেখানো, আদি মানব ধর্ম অনেকটা ভুলে গিয়ে, তারা আত্মরক্ষার জন্য তাদের সকলেরী মূল উপাস্য ও আশ্রয় স্থল গণ্য করা নিরাকা r একেশ্বর, ‘আল-এলঃ’, বা, সংক্ষেপিত উচ্চারণে, ‘আল্লঃ’, বা “আল্লহ”-এর পরিবর্তে কল্পিত নানা শক্তি ধরের সাহায্য চাইতে শুরু করে। যাকেই, বা যা কিছুকেই শক্তিমান, ভয়ঙ্কর, বা উপকারী মনে করে – তারি সাহায্য প্রার্থণায় তারই উপাসণা, এবাদত-বন্দেগী শুরু করে। চাঁদ-সূর্য, আকাশের তারা, বাতাস, বড় গাছ, সাপ-খোপ, এমন কি নিজেদেরও কোন দুর্ধর্ষ বা অলৌকি ক্ষমতাধর বলে বিশ্বাস করা দল-পতি – সকলেরই উপাসণায় ব্যপৃত হয়। এই উপাসণায় তাদের কল্পণার সুবিধার জন্য সবের প্রতিকৃত, মূর্তি ইত্যাদি বানিয়ে সে সবেরো পূজা শুরু করে, সে সব কে খুশী করবার জন্য ভেট হিসেবে বলিদান বা উপহারও দেয়। এই পথ ধরেই, এক পর্যায়ে তারা নানা অশরীরী শক্তির, সত্য বা কল্পিত জ্বিন ও প্রেতাত্মারও। তাদের অনেকে এ সব শক্তির পূজা করে তাদের কাছ থেকে বিশেষ শক্তি অর্জন-পূর্বক সমাজে অন্যদের চেয়ে অসাধারণ বেশী ঢনবান, বা ক্ষমতাবান, বা উভয়ই হতে উদ্যোগী হয়। এক পর্যায়ে, এ সব শক্তির চূড়ামণি বলে বিশ্বাস করা ‘শয়তান’ বা সেরকম কিছুর উপাসণা করে তেমন বিশেষ ক্ষমতা অর্জনের নানা পদ্ধতি আবিষ্কার করে বা বা তা অন্যদের কাছ থেকে শিখে, বা চুরি করে তা দিয়ে যাদু করে তা দিয়ে অন্যদের বশ করতে নানা কিছু করতে শুরু করে। এ সব মিথ্যা পূজ্যের পূজায় তাদের অশুভ শক্তিকে খুশী করে ক্ষমতা অর্জনের অশুভ জ্ঞানএর চর্চা ত ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দজলা-ফোরাত উপত্যকায় খোদ ধর্মের শেখানো শুভ সত্য জ্ঞান শিক্ষায় নেতৃত্ব আসীন সাম-বংশীয়দের একাংশের ভেতর শুরু হয়ে গিয়ে ছিল – বিশেষ করে সেখানকার সভ্যতার তখন কার বড় কেন্দ্র, বাব-এলাহুন, সংক্ষেপে – বাবেলন, বা “বাবিলন”-এ ।
সেখান থেকেও এ সব অশুভ কর্ম কান্ডের জ্ঞান আর্যেরা পেয়ে থাকবে। দক্ষিণ পূর্ব য়ূরোপের এসে পড়া গ্রীক আর্যরা আর্য রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের সুযোগে, তাদের পূর্বপুরুষ য়াফেসের আরেক ভাই, হামের বংশের মধ্য প্রাচ্য থেকে বেরোনোর পরের ন্তুন আবাসস্থল, মিশর – আর তার বিস্তার, আফ্রিকায় সে যাদু বিদ্যা নিয়ে গেলে, মিশরও বাবিলণের মত যাদু-টোনার এক্টি প্রধা কেন্দ্রে পরিনত হয়। ভারত বর্ষে যে সব আর্যেরা আসে, তারাও ভারতবর্ষেও যাদু বিদ্যা নিয়ে আসে, এমন কি এক সময় ভারত, বিশেষ করে কামরূপ- কামাখ্যাও বাবিলন ও মিশরের মত যাদু-টোনার বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এ সব যাদু-টোনার জন্য অশুভ শক্তিদের খুশী করতে শুভ শক্তি, খোদার পক্ষ থেকে সত্য-শুভ সাধণার নেতৃত্ব দানকারী জ্ঞানর্ষি, নবী-রসূল, ওয়লি-দরবেশদের শেখানো সত্য শুভের জ্ঞানের সব শিক্ষার বিরুদ্ধাচারণঅই হয়ে দাঁড়ায় শয়তান-উপাসণার মাধ্যমে মে অশুভ শক্তি অর্জনের সাধণার ধাপ ধাপান্তরের কাজ। খোদার শেখানো ন্যায়নীতি ও মূল্যবোধের অনুসরণে তাঁকে রাজী-খুশী করে তাঁর কাছে চেয়ে নিজের চাওয়া সব কিছু পাওয়ার শুভ সাধণা যে ধর্ম – তারই প্রতিপক্ষে, খোদার শেখানো ন্যায়নীতি ও মূল্যবোধের ঠিক উল্টোটা করে, শয়তান সহ বিবিধ অশুভ শক্তি – জ্বিন, প্রেতাত্মা ইত্যাদি – কে সন্তুষ্ট করে তাদের কাছ থেকে নিজের চাওয়া কিছু পাওয়ার অশুভ “সাধণা” হলো যাদুবিদ্যার কাজ।
ইতিহাসবেত্তা গবেশকদের গবেষণায় জানা যায়, যাদু বিদ্যা শিক্ষা ও চর্চার ‘সাধণায়’ তাই অপবিত্রকে ঘৃণার স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা, দয়া মায়া, শ্লীলতা ও লজ্জা-শরম, গুরুজনকে সম্মান, শিশুদের স্নেহ, বন্ধু ও প্রিবার-পরিজন বাতসল্যতা, এ সবই পরিত্যাগ করতে কঠিণ প্রশিক্ষণ দেয়া হয় – তারই অংশ রূপে, নিজস্ব সহ মানুষ ও গরু বা পাঠা সহ পশুর মল মূত্র ও বীর্য খাওয়া, ঋতুবতী নারীর ঋতিস্রাব আর কুমারীর সতিপর্দা ছিন্নের রাক্ত চাটা বা পান করা, অশ্লীলতা ও নির্লজ্জ আচরণ, প্রতারণা-পূর্বক শিশু ও কুমারী, ঘনিষ্ট বন্ধু, ও শাসক হত্যার নরবলি, নরমাংস ভক্ষণ, ধর্ষণ ও যৌণ- নিপীড়ন, স্বাভাবিক প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌনাচার, সমকামিতa ও পশু ধর্ষণ, – এ সব এসব শয়তানী সাধণার বিভিন্ন ধাপের পুজা পাটের আচার-অনুষ্ঠাণ। সাম্প্রতিক কিছু খবরের ভিত্তিতেও ধারণা করা হয়, আজ ও দুনিয়ার নামী দামী, ক্ষমতাবান ও ধনাঢ্য অনেকে যোগ দেয়া এমন কিছু আচার অনুষঠানেও নাকি এ সবের কিছু কিছু হয়, হয়েছে। এখনো যখন – সেই প্রাচীন কালের বাবিলন, মিশর, রোমক সাম্রাজ্যে যাদু টোণার জন্য এ সব ত হয়ত ছিল সাধারণ বিষয়।
এমন প্রেক্ষাপটেই, রোমক সাম্রাজ্যে, বিশেষ করে খোদ রোমে উদযাপিত একটি প্রধান উতসব হত প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারীতে। রোমকদের বিশ্বাস মতে, ‘রুম’, তথা ‘রোম’-এর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত রুমিনা – সংক্ষেপে, ‘রুমিন’- নামের এক কুকুরানী-সদৃশ নেকড়ে রূপিনী, ‘বুক-চোষানো’ তথা স্তন্যদায়িনী তথাকথিত দেবীর স্মরণে বা পূজা করতে, কুকুরের ‘কোরবানী’-কেন্দ্রিক সে উতসব হত। তা’তে লোকেরা উলঙ্গ হয়ে রাস্তা দিয়ে এলোপাথাড়ি ছুটতো, মিথ্যা দেব্দেবীর জন্য নিষ্ঠুর ভাবে কুকুর আর পাঠা খুন করে উল্লাসে মেতে বলি দেয়া পশুর রক্ত মেখে , মাখা চামড়া হাতে নিয়ে দোড়ে দৌড়ে মেয়েদের তাড়া করে তা দিয়ে তাদের পেটাতো, আর নির্লজ্জ অবৈধ যৌন মিলণে লিপ্ত হত। তাদের বিক্ক্রিত ধর্ম বিশ্বাস মতে এসবে তথাকথিত যৌনতা বা ফূর্ত্তির দেব-দেবী খুশী হয়ে তাদের যৌন খমতা বাড়িয়ে দিয়ে অনেক সন্তান সন্ততি দিয়ে দেবে। এমন কিম্ভূতকিমাকার বিশ্বাস থেকে এ সব বেলেল্লাপণায় মেতে ওঠার সামাজিক রীতি থেকে বাঁচাবার জন্য নিজের কোমলমতি তরুণ তরুণী শিষ্যদের তিনি “নিকাহ” বা “বিয়ে” করিয়ে দিতেন।
পাপের জগতে ‘বিয়ে’ অপরাধ!
পৌত্তলিক রোমক সরকারের হুকুমে তাদের আর্য ধর্ম-রূপের মিথ্যা দেব দেবীর অশ্লীল পূজার মাধ্যমে ধর্মতঃ অবৈধ যৌন সম্ভোগের পরিবর্তে, অনার্য সেমিটিক য়ীস খৃষ্টের শেখানো একেশ্বরবাদী ধর্মের এক ও একক খোদার নামে সাদামাটা বিবাহ বন্ধণের যে কোন ঘটণা বা তার আয়োজনকে তারা রাষ্ট্রদ্রোহীতা মনে করে, তার জন্য নিষ্ঠুর মৃত্যু দন্ডের বিডান করে রেখেছিল। এ কারণ কোন এক সময় তারা তরুণ তরুনীদের নির্মল বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক করিয়ে দেয়ার কোন ঘটণায় তাঁকে ধরতে পেরে অন্যায় মৃত্যু দন্ড দেয়। সম্ভবতঃ তাদের ১৪ ফেব্রুয়ারীর যৌণ অনাচারের উতসবের যে মিথ্যা দেব-দেবীর অবজ্ঞা ও অপমান মনে করত এই রূপ ধর্মতঃ বৈধ বিবাহ-বন্ধনকে, সে সব দেব্দেবীকে খুশী করবার জন্য, ঐ তারিখটিতেই।
কালে, সন্ত ভালেন্তীনের শিষ্য ও অনুসারীগন প্রতি বছর ঐ দিন তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করে তাঁর জন্য দোয়া করা, তাঁর মতই আভাবী অত্যাচারিত দরিদ্র অসহায়দের, ক্ষুদ্রাকালে হলেও কাঙ্গালী ভোজ ইত্যাদির ব্যবস্থা করে। এভাবে আর্য রোমকদের স্বাভাবিক প্রকৃতি বিরুদ্ধ অশ্লীলতার উতসবের দিন, ১৪ ফেব্রুয়ারী-তেই, -মূলতঃ অনার্য খৃষ্ট প্রচারিত প্রাকৃতিক, আদি ধর্মানুসারীদের, সন্ত ভালেন্তীনের খোদার জন্য, প্রেমে পড়া তরুণ তরুনীদের ধর্মতঃ শুদ্ধ সহজ বিয়ে করিয়ে দিয়ে সমাজে নৈতিকতা রক্ষায় আত্মোতসর্গ, তাঁর শিক্ষা, আর তাঁকে স্মরণ করবার পার্বণো সুচিত হয়। কালে, নৈতিকতার জয় হলে, রোমক গণ, পুরোপুরি ভাবে না হলেও, খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করলে, ১৪ ফেব্রুয়ারীর অশ্লীল যৌন বেলেল্লাপণার বিকৃত তথাকতিত ‘ভালবাসা দিবসের’ উদযাপণ বন্দধ হয়ে গিয়ে তা শুধু একে অন্যকে পছন্দ করা তরুণ তরুণীদের ধর্মতঃ শুদ্ধ ‘বিয়ের’ শিক্ষা দেয়া, ও সস্নেহ সহায়ক সন্ত “ভালেন্তীন”-এর স্মরণে তাঁর ঐ শিক্ষা প্রচার ও চর্চার উতসব হিসেবে থেকে যায়। ধর্মতঃ শুদ্ধ “বিয়ের” মাধ্যমে সত্যিকারের, বিবাহ বন্ধানাধীন নির্মল ভালবাসার উপায় করে দেয়ার উতসবের দিন হিসেবে।
সহস্রাধিক বর্ষের ও ওপর ধরে এভাবেই য়ূরোপে ১৪ ফেব্রুয়ারী, ‘ভালেন্তীন দিবস’ বলে পালিত হতে থাকে, ধর্মতঃ শুদ্ধ বিবাহবন্ধনাধীন নির্মল প্রকৃত ভালবাসার শিক্ষা ও চর্চার প্রসারের উতসব রূপে। একে সুন্দরভাবে উপস্থাপণে য়ূরোপের কবি সাহিত্যিকরা বিভিন্ন কিছুই বলতে বা করতে থাকেন, সে ধারায়ই, প্রথম ইংরেজী সাহিত্য কর্ম, চসারের লেখায়, এই দিনে পাখীদের জোড়া বাঁধার কথা বলা হয়।
অসভ্যতার পুণরুজ্জীবণ?
পৌত্তলিক গ্রীক-রোমক য়ূরোপীয় আর্য সভ্যতা অনার্য সেমিটিক সভ্যতা লালিত আদি ধর্মে, আংশিক হলেও দীক্ষিত হবার ভেতর দিয়ে যে গ্লানির ভাগী হয়, তা’ তার সুবিধাভোগী, বিশেষ করে পৌত্তলিক ধর্মাচার্যরা সহজে মেনে নিতে পারেনি। তারা, এমন কি অনার্য নিরাকার একেশ্বরবাদীদের যারা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে, তারাও না। আই শুরু থেকেই তারা ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে তাদের সেই প্রাচীন নিয়ম নীতি, আচার অনুষ্ঠান – আর সে সবের মাধ্যমে শয়তান-উপাসণা পূর্বক যাদু-টোনা গত বিশেষ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা চালিয়ে যায়। য়ূরোপীয়দের খৃষ্টধর্ম গ্রহনের ধারা সূচণায়ই তারা নিজেরা খৃশ্তান বনে, সে ধর্মের নেতৃত্ব কুক্ষীগত করে তাতে য়ূরোপীয় পৌত্তলিক আর্যধর্মের নানা বিষয় সংযোজন করতে থাকে, অনার্য সেমিটিক খৃষ্টধর্মীয় প্রিভাষা আর বাহ্যিক ভাবে দেখতে খৃষ্টীয় আচার- অনুষ্ঠানের আবরণে। একই ভাবে, একই সঙ্গে খৃষ্ট ধর্মের নেতৃত্ব দখল করে নানা ছলে তাতে বারংবার ফাটল ধরিয়ে, খৃষ্টানদের বিশ্বজনীন সমাজকে শতধা ছিন্ন করে, অবশেষ খৃষ্টধর্মের যতসামান্যটুকুও সেই নেতৃত্ব তুলে ধরে, তার ধারক হিসেবে তাদের যে ক্ষমতা ছিল – তা’ও উতখাত করে ফেলে প্রথমে ১৭৮৯-এর ফরাসী বিপ্লব, আর তার এক শতাব্দীর একটু পরে, রুশ বিপ্লব, আর তার প্রভাবে অন্যান্য সব দেশেই।
সমাজের মনোজগতে একেশ্বরবাদী অনার্য সেমিটিক ধর্মের মূল্যবোধ ভিত্তিক খৃষ্টীয় সভ্যতা উতখাত করার ফলে সৃষ্ট শূণ্যতা পূরণে তারা ‘নবজাগরন’ বা ‘পূণর্জাগরণ’ (‘Renaissance’)-এর নামে তারা খৃষ্টীয় মূল্যবোধ ব্যবস্থা কর্তৃক দু’হাজার বছর পূর্বে উপড়ে ফেলা, মৃত খৃষ্টপূর্ব অনার্য য়ূরোপীয় পৌত্তলিক আর্য গ্রীক-রোমক “সভ্যতা”, বা অসভ্যতাকে পুণর্জীবিত করতে শুরু করে। নানারূপ চমকপ্রদ কথার ফুলঝুরি দিয়ে এই প্রাচীন, পরিত্যক্ত, মান্ধাতার আমলের ধ্যান ধারণা, আচার-আচরণকে আধুনিক, এমন কি আধুনিকোত্তর, “নবযুগীয়” (“New Age”) ফ্যাশন হিসেবে প্রচার করে জনপ্রিয় করতে সচেষ্ট হয়। সরল্মতি বেকুবেরা তাদের এই প্রতারণামূলক ফাঁদে পড়ে।
এই ধারাতেই, খৃষ্টপূর্ব য়ূরোপীয় অসভ্যতার পুনর্জীবিত করবার বিশ্বব্যাপী প্রতারণামূলক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই, তথাকথিত ‘ভালবাসা দিবস’ বলে ‘সন্ত ভালেন্তীন দিবসের’ নামে, সন্ত ‘ভালেন্তীন’ – ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’ - তাঁর যে শিক্ষার চর্চা ও প্রচারণার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দান করেন, তার সাক্ষাত বিরুদ্ধ, যৌন উশৃঙ্খলতার উতসবকে অতি সম্প্রতিই ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা চলছে। এটাই বাস্তবতা যা না বুঝেই কেউ কেউ এতে মেতে উঠে ভয়ঙ্কর বিপদের ধ্বংসাত্মক পিচ্ছিল পথে দ্রুত পিছলে যাচ্ছে।
সস্নেহে তরুণ তরুণীদের বলি, এ পথে নয়, তথাকথিত ‘ভালবাসা দিবসের’ আসল, মূল চেতণা, বৈধ অথচ সহজ সরল অনাড়ম্বরহীন ও ব্যয়বহুলতামুক্ত বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে প্রতারণাহীন প্রকৃত ভালবাসার রাস্তা উন্মুক্ত করে পূত পবিত্র জীবণে এগিয়ে যান। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের শিক্ষার চেতণা ও চর্চায়। ভালবাসা দিবসের নামে প্রতারণামূলক বেলেল্লাপণার অপসংস্কৃতির পঙ্কিল পথের মরীচিকা সম হাতছানি উপেক্ষা করে। সারাটা জীবণ, সারাটা বছর – বেলেল্লাপণার জন্য বেছে নেয়া কোন এক ধরা বাঁধা দিনে নয় কেবল।
লেখক: প্রফেসর ড আহমদ আনিসুর রহমান, সংস্কৃতি বিশ্লেষণ বিশেষজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যাল্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এম আই টি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।