হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জনগণের মিলিত সংগ্রাম, আদি পর্ব

আমীর খসরু

ছবি: সংগৃহীত

১.

যেকোনো দেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ঘটনা একদিনে, এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে বা একটি মাত্র ঘটনার ফলাফল নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে যে, এটি একটি যৌথ এবং সমন্বিত ইচ্ছার প্রতিফলন। আর এই প্রতিফলনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানা পন্থায়, দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রামসহ নানা মাধ্যমে এবং মূলত সশস্ত্র লড়াইয়ে।

যুগ যুগ ধরে এ কারণে ‘মুক্তির লড়াই’ দীর্ঘমেয়াদি নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল। মুক্তির সংগ্রাম একক কোনো ব্যক্তি নয়, বরং ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার ঐক্যবদ্ধ জনআকাঙ্ক্ষার ফল। আর এর পাটাতন বা ভিত্তিভূমি রচিত হয় অসংখ্য মানুষের জীবনদান, জনমানুষের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের যৌথ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। কোনো একজন হঠাৎ এসে বললেন, আমরা স্বাধীন, আর স্বাধীনতা এসে গেল, বিষয়টি ঠিক এমন নয়। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির এক অথবা একাধিক নেতা বা নেত্রী থাকতে পারেন এবং থাকেনও; কিন্তু মূল ওই নেতাদেরও জন্ম হয় আন্দোলন, সংগ্রাম, কখনো সশস্ত্র, কখনো পথ ও ভিন্নপন্থার দীর্ঘ পথে। তবে এর কৃতিত্ব এক বা এককের নয়, সবার। যারাই এর ভিন্ন বা ভিন্ন পথে হাঁটবেন, ইতিহাস তাকে বা তাদের আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয় এবং দেবে। এর নজির আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

ভিয়েতনামের কথাই যদি ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে, ভিয়েতনামী মুক্তিকামী মানুষ ১৯৪৬ থেকে ৫৪ সাল—অর্থাৎ আট বছর ফরাসি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আবার ঔপনিবেশিকতার পালাবদলের কারণে ওই ভিয়েতনামীরাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন ১৯৫৫ থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত—অর্থাৎ ২০ বছর। শুধু মুক্তির জন্য যুদ্ধের মধ্যেই ভিয়েতনামীদের কেটেছে ২৮ বছর। এর বাইরের আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিরোধ—এতেও গেছে দীর্ঘ সময়।

উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ার জনমানুষ ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত।

লিবিয়া যুদ্ধ করেছে ইতালির ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর, ওই মুক্তির আশায়। ১৯১১ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত।

এ ধরনের বহু যুদ্ধ হয়েছে মুক্তির সংগ্রামে, স্বাধীনতা লাভের জন্য। কোথাও সফল, কোথাও এখনো চলছে।

শুধু বাংলার মুক্তিসংগ্রাম কত দিনের সে প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ঠিক ছয় বছর পরই তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ বাংলার কৃষক সমাজই প্রথম বুঝতে পারেন যে তাদের দেশ বিদেশিরা দখল করে নিয়ে গেছে। খাতা-কলমের ঔপনিবেশিকতার তত্ত্ব না বুঝলেও তারা আসল সত্যটিই বুঝে গিয়েছিলেন। ১৭৬৩ সাল থেকেই তৎকালীন ব্রিটিশ বাংলায় কৃষকরা শুরু করেন কৃষক আন্দোলন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তৎকালীন বাংলার মধ্যে আসাম, ত্রিপুরাসহ এ অঞ্চলের বিশাল এলাকা ছিল।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন অনিবার্যভাবে যে, অনেক কথিত ইতিহাসবিদ বাংলার কৃষক আন্দোলনকে শুধু কর, খাজনা বৃদ্ধি বা এ কারণে নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হিসেবে উল্লেখ করে প্রকারান্তরে ব্রিটিশ এবং তার এ দেশীয় দালালদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছেন আর এখনো করে যাচ্ছেন। কিন্তু এ কথাই সত্য যে, ওই ইতিহাস ‘জাল এবং ভুয়া’। কৃষকশ্রেণি প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ ও তার এ দেশীয় দালালশ্রেণির বিরুদ্ধে কর, খাজনা সম্পর্কিত বিষয়ের প্রতিবাদের সঙ্গে সঙ্গে ‘বিদেশি খেদাও’য়ের নামে মুক্তির এবং স্বাধীনতা সংগ্রামেরই সূচনা করেছিলেন। কাজেই বাংলার কৃষক বিদ্রোহ এবং সংগ্রামকে এ কারণে ব্র্যাকেট বা বৃত্তবন্দি করার কোনো যুক্তি নেই।

১৭৬৩ সালে শুরু হওয়া কৃষক আন্দোলনকে তৎকালীন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ বলে অভিহিত করেন। এখানে বলা প্রয়োজন যে, কৃষকদের এই লড়াই-সংগ্রাম ছিল বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো, ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্বে এবং পর্যায়ক্রমিক, একটানা নয়। তবে প্রায়ই কোথাও না কোথাও কৃষকের এই মুক্তির লড়াই চলতে থাকত। যার শুরু হয়েছিল ১৭৬৩ থেকে ১৭৬৯ পর্যায়ে—অর্থাৎ প্রথমপর্যায় এবং চলে ১৭৯৩ থেকে ১৮০০০ সাল পর্যন্ত। সারা দেশে এই প্রতিরোধ সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ে। শুধু এই লড়াই, সংগ্রামই নয়, কৃষকদের রক্তাক্ত প্রতিরোধ চলে দেশজুড়ে উনিশ শতাব্দী পর্যন্ত, অন্তত ছয় দফার বা পর্যায়ের ব্যাপকভাবে। শুধু বাংলার কৃষকরাই নন, সাঁওতাল, গারোসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ ধর্ম, জাত, পাত, নির্বিশেষে লড়াই, সংগ্রাম করেছেন, জীবন দিয়েছেন। তাদের এই মহান আত্মত্যাগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা বা মুক্তির সংগ্রামের বীরত্বগাথা অথবা বয়ান তৈরি কি সম্ভব? নীলকরবিরোধী তীব্র কৃষকদের সশস্ত্র লড়াই-সংগ্রামের বলিদান ছাড়া কীভাবে আজকের বাংলাদেশ? মহান কৃষক নেতৃত্ব যেমন ফকির মজনু শাহ, চেরাগ আলী, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, শমসের গাজী, হাজী শরীয়ত উল্লাহ ও তিতুমীর ছাড়া বাংলার ইতিহাস রচনার নাম হবে বেঈমানি, যা আমরা হরহামেশা করে থাকি।

তেমনি ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশবিরোধী সিপাহি সংগ্রামের বীরদের বাদ দিয়ে স্বাধীনতা বা মুক্তির লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করা যায় না, যাবে না। কাজেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মাত্র কয়েক দশকের নয়, অন্তত দুইশ বছরের সম্মিলিত লড়াই, সংগ্রাম আন্দোলনের ফসল। আগেই বলা হয়েছে, মুক্তির সংগ্রাম হয়েছে পর্যায়ক্রমিক, ধাপে ধাপে। কাজেই কৃষক লড়াই থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ একই সূত্রে গাথা। আর প্রকৃত মুক্তির লড়াই, সংগ্রাম এখনো চলছে।

পাকিস্তান পর্ব

এবার আশা যাক তৎকালীন পাকিস্তান পর্বের আন্দোলন-সংগ্রাম প্রসঙ্গে। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিয়ে পশ্চিমা শাসকদের উদ্দেশে আসসালামু আলাইকুম শব্দমালা উচ্চারণ করেছিলেন। এটাই ছিল স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠার প্রথম উচ্চারণ। ১৯৫৫ সালেও তিনি এমন প্রতিবাদী উচ্চারণ করেছিলেন। আর এর পরে তিনি প্রায়ই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন বিভিন্ন জনসমাবেশে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস থেকেই এ কথা বলতেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

১৯৬৭ সালে নিষিদ্ধঘোষিত ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি বা ইপিসিপি-ই (এমএল) প্রথম রাজনৈতিক দল, যারা ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য বিস্তারিত রূপরেখাসহ দুটি দলিল প্রকাশ ও বিতরণ করে।

১৯৬৮ সালের পহেলা ডিসেম্বর সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন নিষিদ্ধঘোষিত ‘পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন’ ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম এবং লড়াইয়ের ১১ দফা ‘থিসিস’ বা করণীয় প্রকাশ করে। এই দুটি দলই এ লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। এই থিসিসের ‘গ’ ধারায় ‘পূর্ববাংলার জনগণের স্বার্থে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের জাতীয় দ্বন্দ্ব’ রয়েছে বলে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং বিপ্লবী যুদ্ধের কর্মনীতি প্রকাশ করা হয়, যা বলতে গেলে অবিশ্বাস্য।

১৯৬৯ সালের এপ্রিলে কাজী জাফর, মেনন, হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বাধীন ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলার সমন্বয় কমিটি’ ‘পূর্ববাংলা জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের’ রাজনৈতিক কাঠামো, পররাষ্ট্র, কৃষি, অর্থনৈতিক রূপরেখাসহ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যা যা থাকা দরকার, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করে। পল্টন ময়দানের জনসভায় স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার পক্ষে জনসভাও অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে বিভিন্ন বামপন্থি, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল স্বাধীনতার লক্ষ্যে কর্মসূচি শুরু করে ফেলেন আগেভাগেই।

পক্ষান্তরে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফায় জাতীয় সংহতি অটুট রাখার স্বার্থে একটি ফেডারেলভিত্তিক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। একইভাবে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনি ইশতেহার দেয়, তাতে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘স্বায়ত্তশাসন’—অর্থাৎ এক পাকিস্তাননীতির কথাই প্রতিফলিত হয়।

অন্যদিকে মওলানা ভাসানী ১৯৭১ সালের পহেলা জানুয়ারি এক ছাপানো প্রচারপত্রে ‘আপস নহে, সংগ্রাম’—ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার জন্য আজাদি রক্ষা এবং মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘোষণা দেন। এর পরের বক্তৃতা-বিবৃতিতেও মওলানা ভাসানী এবং বামপন্থি দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং প্রস্তুতি শুরু করেন।

এ সময়ের পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমাদের অতি অবশ্যই ওই সময়কালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা এবং কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও সাংবাদিক

‘ইরানের চেয়েও বড় হুমকি পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাস’

ইরাকের কাছে ৮০ কোটি ডলারের সামরিক হেলিকপ্টার বিক্রির অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে ভারতীয়রা

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলে ঋণ দিয়ে বিপাকে সোনালী ব্যাংক

নেপালে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা

মালয়েশিয়া যেতে ১৭ হাজার কর্মীকে অগ্রাধিকারের নির্দেশ হাইকোর্টের

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য বিদেশি ‘কৌশলগত অংশীদার’ খুঁজছে সরকার

বিশ্ববাজারে একদিনেই দুই দফা বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

কাজের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো হবে: বিএসইসি চেয়ারম্যান

কাপ্তাই বাঁধের ১৬ গেট খোলা, বাড়তে পারে কর্ণফুলীর পানি