রাষ্ট্র শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি ন্যায়, সমতা ও নাগরিক মর্যাদার এক নৈতিক অঙ্গীকার। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সংবিধান, আইন কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো নয়—তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নাগরিকের এই বিশ্বাস যে, রাষ্ট্র তার সঙ্গে বৈষম্য করবে না। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে থাকে, যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে আইন নয়, পরিচয়ই শেষ কথা; যোগ্যতা নয়, সুপারিশই সাফল্যের চাবিকাঠি; তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কাঠামোর পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য কাঠামো জন্ম নিয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই অদৃশ্য কাঠামোর নাম ‘তদবির-সংস্কৃতি’। দুই দশক আগে একই শিরোনামে আর একটি জনপ্রিয় দৈনিকে কলাম প্রকাশিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়—অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
তদবির শব্দটির আভিধানিক অর্থ ইতিবাচক—কোনো কাজের জন্য যথাযথ উদ্যোগ বা ব্যবস্থা গ্রহণ। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিধানে এর অর্থ বহু আগেই পাল্টে গেছে। এখন তদবির মানেই প্রভাব খাটানো, নিয়ম অতিক্রম করা, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আইনের ওপরে স্থান দেওয়া, ক্ষমতার নৈকট্য ব্যবহার করে অন্যায্য সুবিধা আদায় করা। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধানকে পাশ কাটিয়ে যে অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় গড়ে উঠেছে, তদবির তারই কার্যকর ভাষা। ফলে আইন বইয়ে যা লেখা থাকে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে কার সঙ্গে কার সম্পর্ক, কে কার লোক কিংবা কার পেছনে কোন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশ্রয় রয়েছে।
এই সংস্কৃতি কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার এবং জবাবদিহির অভাব মিলেই এটি আজ প্রায় সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার, লাইসেন্স, অনুমোদন, তদন্ত, এমনকি ন্যায়বিচার লাভের ক্ষেত্রেও অনেক সময় মানুষ প্রথমেই আইনের আশ্রয় নয়, একজন ‘প্রভাবশালী মানুষ’-এর সন্ধান করে। এ যেন রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র, যেখানে লিখিত আইন নয়, অলিখিত সম্পর্কই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।
এই বাস্তবতা যে শুধু সাধারণ মানুষের উপলব্ধি, তা নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও প্রকাশ্যে একই উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন। চলতি বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান দেশের বীমা খাতে পেশাদারিত্বের সংকট, অব্যবস্থাপনা এবং তদবিরের সংস্কৃতিকে মানুষের আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, যেখানে বিদ্যমান অনেক বীমা কোম্পানিই কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না, সেখানে নতুন কোম্পানির লাইসেন্সের জন্যও বিভিন্ন মহল থেকে তদবির অব্যাহত রয়েছে। এই বক্তব্য শুধু বীমা খাতের সংকট নয়; বরং গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার এক গভীর ব্যাধির প্রতীক।
একইভাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনরত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও প্রকাশ্যে বলেছেন, সরকার সব ক্ষেত্রে তদবির নয়, মেধার মূল্যায়ন করতে চায়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর তিনিই আবার আক্ষেপ করে বলেছেন, আজকাল তদবির ছাড়া কোনো কাজই হয় না; এমন একটি সংস্কৃতি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ দুটি বক্তব্যের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার নির্মম বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নীতিগত ঘোষণা একদিকে আর বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্যদিকে। রাষ্ট্রের জন্য এ এক গভীর সতর্কবার্তা।
তদবির সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার তারা, যাদের আমি ‘তকদির-বঞ্চিত মানুষ’ বলতে চাই। ধর্মীয় অর্থে তকদির মানে নিয়তি বা ভাগ্য। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এরা ভাগ্যের নয়, কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার। তাদের ব্যর্থতার কারণ ব্যক্তিগত অযোগ্যতা নয়; বরং এমন এক সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে মেধার চেয়ে সংযোগের মূল্য বেশি। দরিদ্র কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই মেধাবী তরুণ, যে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় ভালো ফল করে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি সুপারিশের অভাবে পিছিয়ে পড়ে—সে ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে, রাষ্ট্র তার জন্য নয়। তার চোখে তখন নিজের ব্যর্থতা নয়, নিজের ‘কপাল’ই সবচেয়ে বড় অপরাধী হয়ে ওঠে।
কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, তার তকদির লুণ্ঠন করেছে একটি অন্যায্য ব্যবস্থা। সে ভাগ্যের কাছে নয়, তদবিরের কাছে পরাজিত হয়েছে। তার স্বপ্ন ভেঙেছে কোনো অদৃশ্য নিয়তির আঘাতে নয়; বরং এমন এক সংস্কৃতির হাতে, যেখানে যোগ্যতা প্রায়ই পরিচয়ের কাছে পরাজিত হয়। রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে যে, একজন নাগরিক নিজের মেধার ওপর নয়, নিজের পরিচয়ের অভাবকে জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়?
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি শুধু কয়েকজন মানুষের চাকরি হারানো নয়; এর অভিঘাত পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর পড়ে। যখন মেধার পরিবর্তে তদবির পুরস্কৃত হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কর্মদক্ষতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি একে একে বিদায় নিতে থাকে। যে ব্যক্তি অন্যায্য সুবিধার মাধ্যমে কোনো পদে অধিষ্ঠিত হন, তিনি খুব কম ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার কথা ভাবেন; বরং নিজের অবস্থানকে নিরাপদ রাখা এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের প্রতিদান আদায়ের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। এভাবেই দুর্নীতি আর তদবির পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। একজন আরেকজনকে জন্ম দেয়, লালন করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে তোলে।
এই বাস্তবতার আরেকটি নির্মম পরিণতি হলো নাগরিক আস্থার অবক্ষয়। মানুষ যখন বারবার দেখে যে নিয়ম মেনে চলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, তখন তারা ধীরে ধীরে নিয়মের প্রতিই অনাস্থাশীল হয়ে ওঠে। তখন আইনকে আর ন্যায়ের প্রতীক বলে মনে হয় না; বরং সেটিকে ক্ষমতাবানদের সুবিধামতো ব্যবহৃত একটি উপকরণ বলে মনে হয়। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই যদি সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে পরিচয় ছাড়া অধিকার অর্জন সম্ভব নয়, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র তখন বাহ্যিকভাবে টিকে থাকলেও তার ভেতরের প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে থাকে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই পরিস্থিতি দেশের মেধাবী তরুণদের সামনে এক গভীর হতাশার দিগন্ত উন্মোচন করে। তারা উপলব্ধি করে, কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে যোগাযোগের মূল্য বেশি; সততার চেয়ে তোষামোদ অধিক কার্যকর। ফলে অনেকে বিদেশমুখী হয়, আবার অনেকে নিজের সম্ভাবনাকেই বিসর্জন দেয়। এই ‘ব্রেন ড্রেন’ শুধু জনশক্তি হারানোর ঘটনা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা হারানোর নাম। কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন মেধা হারিয়ে টিকে থাকতে পারে না।
অতএব, তদবির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো প্রশাসনিক সংস্কারের সীমিত কর্মসূচি নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অপরিহার্য শর্ত। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার ও লাইসেন্স—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং অনুসরণযোগ্য পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে নীতিনির্ভর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি দপ্তরে মৌখিক নির্দেশ কিংবা অদৃশ্য চাপের পরিবর্তে প্রতিটি সিদ্ধান্তের লিখিত জবাবদিহি থাকতে হবে। একই সঙ্গে তদবিরের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার কিংবা নিয়মবহির্ভূত সুবিধা আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ যদি সমান না হয়, তাহলে আইন কখনোই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
তবে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ক্ষমতার অনুগত তদবিরবাজদের নয়, সততা, কর্মদক্ষতা ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা। দলীয় আনুগত্যকে যদি যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একসময় দলীয় স্বার্থের সম্প্রসারিত কার্যালয়ে পরিণত হবে। গণতন্ত্রের শক্তি তখন দুর্বল হবে, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা আরো কমবে।
সমাজকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমরা নিজেরাই যখন ছোট একটি প্রশাসনিক কাজের জন্য পরিচিত ব্যক্তির ফোন খুঁজি, নিয়মের পরিবর্তে সুপারিশের পথ বেছে নিই, তখন অজান্তেই এই সংস্কৃতিকে দীর্ঘায়িত করি। তদবির শুধু ক্ষমতাবানদের সৃষ্টি নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি আমাদের সামাজিক মানসিকতারও প্রতিফলন। কাজেই পরিবর্তনের সংগ্রাম রাষ্ট্রের যেমন, নাগরিকেরও তেমনি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কোন পথ বেছে নিই এর ওপর। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে একজন কৃষকের সন্তান, একজন রিকশাচালকের সন্তান কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী শুধু নিজের যোগ্যতার বলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে পৌঁছাতে পারবে? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাই, যেখানে জন্ম, পরিচয় ও তদবিরই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী বাংলাদেশের চরিত্র নির্ধারণ করবে।
আমি বিশ্বাস করি, অধিকার-বঞ্চিত মানুষের মুক্তি কোনো অলৌকিক নিয়তির হাতে নয়; তাদের মুক্তি নিহিত রয়েছে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যে। যে রাষ্ট্র মেধাকে মর্যাদা দেয়, আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখে এবং নাগরিকের অধিকারকে ক্ষমতার চেয়ে বড় বলে স্বীকার করে, সেই রাষ্ট্রেই প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ বাস্তবায়িত হয়। তদবিরের অন্ধকার থেকে মেধার আলোকিত সমাজে উত্তরণের এই সংগ্রামই আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রিক কর্তব্য। কারণ কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার তদবিরবাজরা নয়; নির্ধারণ করে সেই সব নীরব, পরিশ্রমী এবং দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত মানুষ, যাদের প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াই একটি সভ্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়