হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভারতীয় গণতন্ত্রের হিসাব মেলানোর পালা

আমার দেশ অনলাইন

ভারতে এক বিশাল গণজাগরণ শুরু হয়েছে। দেশটির গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন সংকটের মুখে। রাজধানী দিল্লিতে জুলাই মাস থেকে যে বিপুল আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা মূলত ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক বড় লড়াই। যে সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে এই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে, রাষ্ট্রযন্ত্র কি আদৌ সেই সংবিধানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে? আন্দোলনকারীরা এখন এই প্রশ্নই তুলছেন।

সবকিছুর শুরু হয়েছিল গত গ্রীষ্মে, পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। দেশের ছাত্রসমাজ তখন চরম অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। এরপর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন কর্তৃপক্ষ খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই এখন আপিল করছেন। কিন্তু এত বিশালসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। এই ক্ষোভ থেকে হাজার হাজার তরুণ দিল্লির রাজপথে নেমে আসেন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে অন্যান্য বড় শহরেও। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ। দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। দেশে গণতন্ত্র হত্যার জন্য তারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করছেন। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদির কর্তৃত্বের সামনে এত বড় চ্যালেঞ্জ আর কখনো আসেনি।

গত ১২ অক্টোবর একটি বিশাল সমাবেশ করে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। তবে এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি আসলে ‘জেন জি’ বা তরুণ শিক্ষার্থীরা। সরকারের নানা নিষেধাজ্ঞা তারা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি ভেঙে তারা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। সরকারের ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে গিয়ে বহু তরুণ গ্রেপ্তার হতেও পিছপা হননি।

সরকার এই লড়াইকে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। আন্দোলন সামলাতে রাজপথে প্রায় ৪০ হাজার সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মেট্রোস্টেশন। মধ্য দিল্লির বিভিন্ন পথঘাট ব্যারিকেড দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বন্ধ করে রাখা হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট। এ পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। এরপরও সরকারপ্রধান নির্বাচন কমিশনারের পাশেই দাঁড়িয়েছে। বিরোধী দল কিংবা আন্দোলনকারী তরুণদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসতে সরকার স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

অবশ্য এখনই মোদি সরকারের পতন ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশ বা নেপালের মতো আন্দোলনের মুখে এই সরকার রাতারাতি পড়ে যাবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। তবে সরকারের সামনে একটি সূক্ষ্ম ও গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের মানুষের ওপর তাদের যে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, সেখানে ফাটল ধরেছে। মোদি সবসময় নিজের একচ্ছত্র শক্তিমত্তা প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সব ক্ষমতা নিজেদের কেন্দ্রে কুক্ষিগত করে রেখেছে। কিন্তু এই তরুণদের প্রকাশ্য অবাধ্যতা সরকারের সামনে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই তরুণরা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, ধর্ম বা জাতির নন; তারা সব ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে রাজপথে এসেছেন। তাদের সহজে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে আলাদা করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। আর এই কারণেই সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি এখন বেশ নড়বড়ে মনে হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এই আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক পরিসরকে আরো গণতান্ত্রিক করবে, নাকি কঠোর দমন-পীড়নের দিকে ঠেলে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সমতার প্রতিশ্রুতি

আধুনিক ভারতের ক্ষমতার বৈধতা দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে আছেÑএক. নির্বাচন এবং দুই. পরীক্ষা। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ঐতিহ্য বজায় রেখে এসেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের হাতে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে। তাদের নিরপেক্ষতার ওপরই এতদিন টিকে ছিল ভারতীয় গণতন্ত্র।

একইভাবে, সরকারি চাকরি এবং কলেজে ভর্তির জন্য ভারতে জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেশের কোটি কোটি তরুণের কাছে এই পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। পরীক্ষায় সফল হওয়া মানে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সুযোগ পাওয়া। আর ব্যর্থ হওয়ার অর্থ সেই সুযোগের দরজায় চিরতরে খিল পড়ে যাওয়া। তাই এই পরীক্ষাগুলো যেন সম্পূর্ণ সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ভারত এখনো একটি চরম বৈষম্যের সমাজ। টাকা, স্বজনপ্রীতি আর ক্ষমতার দাপটে অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের নিরপেক্ষতা হারায়। এমন এক বাস্তবতায় নির্বাচন এবং পরীক্ষাই সাধারণ মানুষকে সমান সুযোগ পাওয়ার একটা বিশ্বাস দিয়েছে। একটি ভোট একজন দরিদ্রতম ভারতীয়কেও নিজের মর্যাদা ও ক্ষমতার অনুভূতি দেয়। ভারতে তাই নির্বাচনে মানুষের উপস্থিতি সবসময়ই বেশি থাকে। সরকারি পরীক্ষার বিষয়টিও একইভাবে মানুষকে আশাবাদী করে তোলে। এটি তরুণদের মনে বিশ্বাস জাগায় যে শুধু পড়ালেখার জোর দিয়েই সমাজের প্রভাব-প্রতিপালকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব। অবশ্য এই নির্বাচন কিংবা পরীক্ষা পদ্ধতি যে সবসময় ত্রুটিমুক্ত ছিল, তা নয়। তবে সামগ্রিকভাবে এদের সততা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কখনোই সন্দেহ জাগেনি।

কিন্তু গত এক বছরে সরকারের কিছু পদক্ষেপ নির্বাচন ও পরীক্ষাÑএই দুই ব্যবস্থা নিয়েই গভীর সংশয় তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি দেশজুড়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। চারপাশে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। শিক্ষার্থীরা গোটা পরীক্ষা পদ্ধতির নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। এ ঘটনা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির ভূমিকা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। কাজের সুবিধার্থে কেন্দ্রীয়ভাবে এই সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু সব দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে চলে যাওয়ায় এ সংকট আরো গভীর রূপ নেয়। জুলাই মাসে প্রবল আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী।

একইভাবে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার একটি ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) কর্মসূচি হাতে নেয়। এর আগে সর্বশেষ ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে এ রকম সংশোধনী আনা হয়েছিল। এবার নিজের ভোটাধিকার প্রমাণ করার জন্য সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠিন শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি বিতর্কের মুখে পড়ে। কার নাম বাদ যাচ্ছে আর কার নাম যুক্ত হচ্ছে, তা নিয়ে ছিল না কোনো স্বচ্ছতা। নতুন একটি সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু হয়, যার মাধ্যমে সামান্যতম অজুহাতেও নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

সমালোচকদের স্পষ্ট বক্তব্য, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেছেন। ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে অনেকেরই দ্বৈত নাম ছিল কিংবা অনেকে মারা গেছেন, তা ঠিক। কিন্তু এর পাশাপাশি কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এক লহমায় তাদের ভোটাধিকার হারিয়ে বসেন। এখন ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার এক বিশাল বোঝা তাদের কাঁধে চেপেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন কমিশন এখন আপিল করার নিয়ম সহজ করে সমালোচনা কমানোর চেষ্টা করছে।

রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, এই বিশেষ সংশোধন আসলে নির্বাচনে কারচুপি করার একটি হাতিয়ার। পশ্চিমবঙ্গেই প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়ায় গত মার্চ মাসের রাজ্য নির্বাচনে কোটি কোটি মানুষ ভোট দিতে পারেননি। আর সেই নির্বাচনেই জয়ী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে মোদির দল বিজেপি। কমিশন যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এটা না-ও করে থাকে, তাহলেও তাদের চরম অব্যবস্থার কারণে কোটি কোটি মানুষ এখন ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টও এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আদালত পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। তারা দাবি করেছে, যাদের আপিল ঝুলে আছে, তারা নাকি পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।

গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণ আইনজীবীদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন। এই একটি মন্তব্য দেশজুড়ে জন্ম দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র। এই দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে তরুণদের সংগঠিত করতে মূল ভূমিকা পালন করে। তাদের আন্দোলনের মুখেই গত জুলাইয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী। আর এখন এই তরুণরাই জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার হুংকার দিচ্ছে।

তারা প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতার এই সংকটকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তারা ছুড়ে দিচ্ছে তীব্র উপহাস ও কটাক্ষ। এর ফলে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা মোদির ‘অজেয় নেতা’ ভাবমূর্তি যেন এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী নিজে রিলস বানিয়ে তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের তুচ্ছতাচ্ছিল্য থামানো সম্ভব হয়নি। ক্ষমতার মুখে এই উপহাস ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপর চেপে বসা ভয়ের কালো মেঘ সরিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতার দাপটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তরুণ সমাজ আজ নিজেদের আসল কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে।

মোদির রাজনৈতিক জীবনের জন্য এই আন্দোলন এক বিশাল হুমকি। কারণ এই তরুণদের সঙ্গে চিরাচরিত কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের যোগসূত্র নেই। পরীক্ষা আর নির্বাচনের এই সমস্যাটি সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। আন্দোলনকারীদের এই অনমনীয় তেজ আর ভয়হীন মনোভাব মোদির দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে পুরোপুরি নড়িয়ে দিয়েছে।

নিজেদের ভবিষ্যৎ

দিল্লির রাজপথে এই আন্দোলন এখন রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। সরকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই পদক্ষেপ তরুণদের আরো বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা রাজপথ দখল করে নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে নেওয়ার নতুন শক্তি পান। রাজধানীজুড়ে সরকার হাজার হাজার নিরাপত্তারক্ষী নামিয়ে রেখেছে। বোঝা যাচ্ছে, মোদি সরকার কঠোর অবস্থান থেকে সহজে সরবে না।

সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের বিষয় নয়। মোদি তার দলের ভেতরে অনুগত কর্মীবাহিনী তৈরি করেছিলেন একটাই আশায়Ñযেকোনো পরিস্থিতিতে তারা তাকে রক্ষা করবে। এখন সেই আশ্বাস ভঙ্গ হলে মন্ত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যাবেন। তাই কুমারের পাশে দাঁড়িয়ে মোদি মূলত তার দলের ভেতরের আনুগত্য টিকিয়ে রাখতে চাইছেন।

তাছাড়া, যেকোনো সমালোচনাকে নিজের শক্তিতে বদলে নেওয়ার কৌশলের ওপর ভিত্তি করেই মোদি তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে এমন উপহাস মেনে নিয়ে পিছিয়ে আসা তার জন্য খুবই কঠিন। কুমারকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া। সরকার যদি আজ পিছু হটে, তবে রাজনৈতিক বিরোধীরা আরো সাহসী হয়ে উঠবেন এবং আন্দোলন আরো তীব্র হবে। এর ফলে ২০২৯ সালের নির্বাচনে বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন—এমন জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যাবে।

তবে ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফল কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। জনগণের ক্ষোভ সবসময় সরাসরি ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয় না। নির্বাচন কমিশন হয়তো নতুন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে এই বিতর্ক কিছুটা স্তিমিত করতে পারে। আবার বিরোধীদের ভেতরের কোন্দলের সুযোগ নিয়ে বিজেপি নিজেদের পাল্লা ভারী করতে পারে। ভারতের মতো বিশাল দেশে ভোটারদের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ সবসময় একরকম হয় না। ২০২৭ সালের মার্চে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন হবে সরকারের জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষা। সেখানে বিজেপি জিতলে বোঝা যাবে, তাদের ক্ষমতার দাপট অক্ষুণ্ণ আছে। আর যদি তারা হেরে যায়, তবে রাজনৈতিক সংকট সামলানো সরকারের জন্য আরো কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে ধারণা করা যায়, সরকার আন্দোলন দমনে আরো নির্মম ও কঠোর পথ বেছে নিতে পারে।

বিজেপি এখন আশা করছে, দিল্লির এই পরিস্থিতিকে তারা ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কাজ’ বলে চালিয়ে দিতে পারবে। দেশের বাইরের কোনো শক্তি এই আন্দোলন পরিচালনা করছে—এমন কথা বলে তারা আন্দোলনটির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করতে চায়। বাংলাদেশ ও নেপালের উদাহরণ টেনে সরকার বিদেশি ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব সামনে নিয়ে আসছে।

তবে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, সরকার যদি নিজেদের তৈরি করা প্রচারণাতেই বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং জনগণের প্রকৃত ক্ষোভকে পাত্তা না দেয়। বাংলাদেশ ও নেপালে মানুষের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছিল, তা ছিল খুবই স্পষ্ট। ভারতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তরুণ সমাজ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দারুণ চিন্তিত। দেশটিতে বর্তমানে স্নাতক ডিগ্রিধারী ২৩ শতাংশ তরুণই বেকার। ভালো মানের ডেস্ক জবের সুযোগ বৃদ্ধির হার কমে নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই কোনো ধরনের কাজ, পড়ালেখা বা প্রশিক্ষণের মধ্যে নেই। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভরসা করে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার কথা ছিল, তরুণরা এখন সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। মোদির শক্তপোক্ত নেতার ভাবমূর্তিও আজ প্রশ্নের মুখে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোও তরুণদের মনে নতুন কোনো আশার আলো জ্বালাতে পারছে না। তাই দেশের তরুণ সমাজ নিজেদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজেদের শক্তিতেই গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করার পথ বেছে নিয়েছে।

ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর : জুলফিকার হায়দার

অভিবাসীদের নিরাপত্তা কোথায়

বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য যৌক্তিকীকরণ কীভাবে হতে পারে

উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সহায়তা

রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাম্প্রতিক ভাবনা

সরকার কি পথ হারাচ্ছে

পুরুষতন্ত্রের ছায়ায় নারীর রূপান্তর

‘মোদি হটাও, ভারত বাঁচাও’

আলিয়া মাদরাসা জাতীয়করণ : সময়ের দাবি

হালাল সনদ ও খাদ্যনিরাপত্তা

গণহত্যার মুখে ভারতের মুসলমানরা