হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম: প্রয়োজন বিশেষ উদ্যোগ

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার

পানি নিষ্কাশনের জন্য চট্টগ্রাম শহরে প্রাকৃতিকভাবে একটি চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তারপরও চলতি বছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম শহরে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা যায়। বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগে অর্ধশতাধিক মানুষ মারা গেছে। চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি অঞ্চলে অধিক বৃষ্টি হবে এটা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তাই অধিক বৃষ্টিকে এই দুর্যোগের জন্য দায়ী না করে আমাদের অব্যবস্থাপনা ও সুদূরপ্রাসারী পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে দায়ী করা উচিত। একই সঙ্গে নির্বিচারে পাহাড় কাটাসহ প্রকৃতি ধ্বংসও এজন্য দায়ী। বাংলাদেশের অন্যান্য শহর অপেক্ষা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সচেতনতা এবং যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে চট্টগ্রামের পরিবেশ নানা হুমকির মুখে। এর ফলে চট্টগ্রাম শহর আজ তিনটি প্রধান সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এগুলো হলোÑজলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস; নালা ও খালে পড়ে মৃত্যু।

চট্টগ্রাম শহরে অনেক স্থানে ক্ষেত্রবিশেষে ৩০ মিনিট থেকে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়। জলাবদ্ধতা গভীরতা স্থানভেদে ০.৫০ মিটার থেকে ১.৬০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মূলত জোয়ারজনিত এবং বর্ষাকালীন এ দুই ধরনের জলাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়, তবে মূলত বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রকট। চট্টগ্রামে বর্ষার সময় ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার বৃষ্টিতে মহানগরীর প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিদ্যমান খাল ও নালা পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা প্রকট হচ্ছে। এছাড়া জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজের জন্য কিছু নালা ও খালে বাঁধ দেওয়া, পুকুর-জলাশয় ভরাট, প্লাস্টিকসহ নানা বর্জ্যে পানি প্রবাহে বাধা এবং জোয়ারের প্রভাব ও পলি জমা হওয়া ইত্যাদি। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার চারটি প্রকল্পে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল মেয়াদি সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ শেষ হলেও এর সুফল নগরবাসী কবে পাবেন, তা অনিশ্চিত। আমাদের পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী এই নগরীর জলাবদ্ধতার জন্য মনুষ্যসৃষ্ট কারণ দায়ী ৬৩ শতাংশ । এর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা এবং নিয়মিতভাবে খাল ও নালা পরিষ্কারের অভাব, অপরিকল্পিত বাঁধ, ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক; পাহাড় কর্তন, পুকুর ও জলাশয় ভরাট, চট্টগ্রামের বিভিন্ন খাল ও নালায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সরবরাহ লাইন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন ইত্যাদি। এ সমস্যা দূর করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ টেকসই পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করছে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ অন্যান্য বিপর্যয়।

বাংলাদেশের পাহাড়ের অধিকাংশই বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ ও সিলেটে অবস্থিত। বাংলাদেশের পাহাড়ধসের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৬৮ সালে কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা সড়কে প্রথম পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে, যদিও সেই পাহাড়ধসে কোনো হতাহতের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসজনিত হতাহত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৫টি পাহাড়ধসের ঘটনায় ৭৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়ধসের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটে ১১ জুন ২০০৭; সে সময় চট্টগ্রামের ৬টি স্থানে একসঙ্গে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই প্রতি বর্ষা মৌসুমে (২০০৭-২০২১) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ধস একটি নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের পাহাড়ধসের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দেয় ২০১৭ সালের জুন মাসে। সে সময় টানা তিন দিনের (১১-১৩ জুন) অতিবৃষ্টির পানি পাহাড়ি মাটি ধারণ করতে না পেরে ধসে পড়ে রাঙামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেন ১৬৪ জন; এর মধ্যে শুধু রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় মৃত্যুবরণ করেন ৫ সেনাসদস্যসহ ১২০ জন।

বন উজাড়, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো নষ্ট করে পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের ঢালে বসতি স্থাপন, মাত্রাতিরিক্ত যানবাহন ও পাহাড়ে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ইত্যাদির সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি যোগ হয়ে পাহাড়ধস হয়ে থাকে।

প্রকৃতির ভাঙা-গড়ার নিয়ম অনুসারে পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড়ধস হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যদি অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং পাহাড় কেটে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে, তাহলে এ ধরনের বিপর্যয় বড় আকারে দেখা দেয় এবং এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য প্রকৃতিকে দোষারোপ করা সঠিক নয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ বছরে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ শতাংশ। গত কয়েক বছরের পাহাড়ধসের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুন-জুলাই মাসের বর্ষাকালীন গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক সময় থেকে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। উপরোক্ত কারণের আলোকে ও সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের জন্য সমুদ্রে লঘুচাপজনিত কারণে বিরামহীন ভারী বর্ষণ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন, বন উজাড় এবং বালুকাময় মাটি ইত্যাদি কারণ চিহ্নিত করা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর এ অঞ্চলে বন্যা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসজনিত অপমৃত্যু প্রতিরোধ করতে হলে অবিলম্বে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন, অবকাঠামো ও পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নস্যাৎ করে ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন পরিকল্পনা বন্ধ করতে হবে। নদী, খাল, জলাশয় ধ্বংস করা বন্ধ করতে হবে।

লেখক : প্রফেসর, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৯ জনের মৃত্যু, গণপিটুনিতে ৫২

রায়গঞ্জে স্বপ্নপূরণে ঘাম ঝরাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রমিলা ফুটবলাররা

কুর্দিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে টার্গেট করে ইরানের ড্রোন হামলা

দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে নতুন বেতন কাঠামো

কলাপাড়ায় যুবদল নেতার বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

এসএসসির খাতা পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে চ্যালেঞ্জে শিক্ষা বোর্ড

ফিলিপাইনে শ্রেণিকক্ষে গুলি ছুড়ল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, নিহত ২

শ্রীমঙ্গলে বই পড়া উৎসবে অংশ নিল ২৫ হাজার শিক্ষার্থী

বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

চার বিভাগে ভারি বৃষ্টির সতর্কতা জারি