মীর জাফর থেকে ‘নিয়াজি’
বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন প্রবাদ আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের মুখে মুখে ফিরছে—‘যে লড়াই করে সে বীর, যে মাথা নত করে সে মীর জাফর, আর যে দেশ ছেড়ে পালায় সে নিয়াজি।’
এই বাক্যটি কেবল শব্দসমষ্টি নয়, বরং আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের সংকটের এক গভীর প্রতিচ্ছবি। পাকিস্তানি সামরিক ইতিহাসে একটি বিদ্রূপাত্মক প্রবাদ প্রচলিত আছে, যা আজ বাংলাদেশের ১৬ বছরের দুঃশাসন-পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—‘যে মারা যায় সে শহীদ, যে বেঁচে থাকে সে গাজী, আর যে পালিয়ে যায় সে নিয়াজি।’ ১৯৭১ সালে জেনারেল নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্য হাতে থাকা সত্ত্বেও রেসকোর্স ময়দানে মাথা নত করে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। একটি বিশাল সুপ্রশিক্ষিত বাহিনী ও যুদ্ধের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও তিনি লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন। আজ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যখন নানামুখী সংকটে প্রশ্নবিদ্ধ, তখন এই ‘নিয়াজি’ শব্দটি কেবল একজন পরাজিত জেনারেলের নাম নয়, বরং এটি একটি কাপুরুষোচিত ও আত্মসমর্পণকারী মানসিকতার প্রতীক। যারা দেশের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভিনদেশের পদলেহন করে কিংবা বিচার এড়াতে সংকটে পালিয়ে যায়, তারাই আধুনিক বাংলার ‘নিয়াজি’।
মীর জাফর ও জগৎ শেঠ : ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার সিন্ডিকেট
পলাশীর ষড়যন্ত্রে মীর জাফরের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়ংকর ভূমিকা ছিল জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ ও ঘষেটি বেগমদের। আজকের বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী মহলে যখন আমরা দেখি একদল মানুষ দেশের চেয়ে প্রতিবেশী দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখছেন, তখন ইতিহাসের এই চরিত্রগুলো নতুন রূপে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
জগৎ শেঠের পরিবারের বার্ষিক আয় ছিল বর্তমানের মুদ্রামান অনুযায়ী প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। বর্তমানের অনেক উচ্চপদস্থ আমলা ও সচিবের অঢেল সম্পদের পাহাড় ঠিক তেমনই। এই আমলারা জগৎ শেঠের মতোই বিদেশি শক্তির স্বার্থ হাসিলে রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না।
রায় দুর্লভ ছিলেন নবাবের দেওয়ান, যিনি যুদ্ধের ময়দানে সশরীরে উপস্থিত থেকেও তার বিশাল বাহিনী নিয়ে নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আজকের আমলাতন্ত্রেও এমন অনেক ‘রায় দুর্লভ’ রয়েছেন, যারা জাতীয় সংকটে দেশের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে নির্লিপ্ত থাকেন, যা প্রকারান্তরে শত্রুর হাতকেই শক্তিশালী করে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিগত ১৬ বছরের অবক্ষয়
এই প্রশাসনিক ও নৈতিক অবক্ষয় রাতারাতি তৈরি হয়নি। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে আমরা দেখেছি, কীভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে পরাধীনতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আজ থেকে দুই দশক আগে আমি যখন ডেপুটেশনে একটি সংবেদনশীল সংস্থায় কর্মরত ছিলাম, তখন খুব কাছ থেকে সিভিল আমলাতন্ত্র এবং বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কার্যকলাপ ও মানসিকতা দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমার সেই পর্যবেক্ষণে আমি দেখেছিলাম, দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের কিছু সংখ্যকের মধ্যে এক অদ্ভুত অনাগ্রহ ও দেশপ্রেমের তীব্র অভাব।
সেখানে সামরিক বাহিনীর থেকে আসা কর্মকর্তারা যেখানে দেশের জন্য যেকোনো সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত থাকতেন, সিভিল আমলারা তখন ব্যস্ত থাকতেন কীভাবে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া যায় বা বিদেশি প্রভুদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নেওয়া যায়। তাদের এই ‘রিলাক্ট্যান্ট’ বা অনীহাপূর্ণ আচরণ আমাকে তখন চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছিল। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে এই আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যার ফলে সচিবালয়ের ফাইলে আমাদের সার্বভৌমত্ব আজ পণবন্দি হয়ে পড়েছে।
সামরিক বাহিনীর অবক্ষয় : ইউনিফর্ম যখন পণবন্দি
সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে তখন, যখন আমরা লক্ষ করেছি খোদ সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এই ‘নিয়াজি’ মানসিকতায় আক্রান্ত হয়েছেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত স্খলন নয়, বরং যখন তিন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা অনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তখন তা জাতীয় নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যখন দেখি একজন সাবেক সেনাপ্রধান বা বিমান বাহিনী প্রধান দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে দেশ ছেড়ে পালান কিংবা ধরা পড়েন, তখন তা পুরো বাহিনীর পেশাদারিত্বকে কলঙ্কিত করে। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, এই শীর্ষ কর্মকর্তারা যখন দুর্বল আইন প্রয়োগের সুযোগ নিয়ে বা ভিনদেশের সহায়তায় পলায়নের চেষ্টা করেন, তখন তারা স্রেফ ইউনিফর্ম পরিহিত অপরাধীতে পরিণত হন।
যে ইউনিফর্ম দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক, সেটি যখন অর্থ পাচার আর ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন এর চেয়ে বড় জাতীয় অবমাননা আর কিছু হতে পারে না। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে আমরা দেখেছি লজ্জিত হওয়ার মতো সব দৃশ্য। যেই জেনারেল প্রধানমন্ত্রীর পা ধরে সবার সামনে ‘কদমবুসি’ করেছেন, তার এই পবিত্র ইউনিফর্ম পরার কোনো নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না।
এটি কেবল ব্যক্তিগত চাটুকারিতা নয়, বরং পুরো সশস্ত্র বাহিনী এবং জাতির জন্য এক বিশাল অসম্মান। আজ ২০২৫ সালের শেষভাগ এবং ২০২৬ সালের শুরুতে আমরা দেখছি সাবেক বিমান বাহিনী প্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মানি লন্ডারিং ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে এবং আদালত তার পরিবারের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল দুর্নীতির দায়ে ধরা পড়ে আজ শ্রীঘরে। অনেক জেনারেল অবসর গ্রহণের পর সামান্য কিছু ডলারের লোভে বা বিদেশি ইন্টেলিজেন্সের স্বার্থ হাসিলে নিজের ইউনিফর্মের সম্মান ও পবিত্রতা বিক্রি করে দিচ্ছেন। এমনকি তারা নিজেদের সহকর্মী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করার মতো জঘন্য কাজেও লিপ্ত হচ্ছেন।
আমলাতান্ত্রিক পলায়নপরতা ও ‘বেগম পাড়া’র বিভীষিকা
এই পলায়নপরতা কেবল সামরিক বাহিনীতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পুলিশ ও সিভিল আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের পলায়ন ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গালে এক চরম চপেটাঘাত। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে বিমানবন্দরকে ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন, তা আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য চরম লজ্জার।
শুধু পুলিশপ্রধানই নন, গত ১৬ বছরে একদল আমলা দেশের কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠন করে কানাডার ‘বেগম পাড়া’ বা ইউরোপ-আমেরিকায় নিজেদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন। এরা দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় বিলাসিতা করেছেন, আর সংকট দেখামাত্রই জনরোষ থেকে বাঁচতে ইঁদুরের মতো পালিয়েছেন। এদের কাছে দেশ মানে কেবল লুণ্ঠনের ক্ষেত্র, আর বিদেশি নাগরিকত্ব মানেই মুক্তি।
শেষকথা : ইতিহাসের অমোঘ বিচার
ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বাসঘাতকদের শেষ পরিণতি কখনোই সুখকর হয় না। মীর জাফর গালিতে পরিণত হয়েছে এবং তার বংশধরেরা কলঙ্কিত হয়ে আছে। জগৎ শেঠের সেই বিশাল ৯০০ কোটির সাম্রাজ্য গঙ্গার প্রবল স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে। একইভাবে জেনারেল নিয়াজি পরাজয় ও ধিক্কার নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে যেসব আমলা, পুলিশ বা জেনারেল দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, কিংবা চাটুকারিতার মাধ্যমে দেশ লুণ্ঠন করেছেন, তারা ইতিহাসের অমোঘ বিচারের হাত থেকে রেহাই পাবেন না।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। এই চেতনা যাদের নেই, তাদের জন্য এই পবিত্র দেশের মাটিতে কোনো সম্মান অবশিষ্ট থাকতে পারে না।
যিনি দেশের জন্য লড়বেন তিনি গাজী, যিনি দেশের তরে প্রাণ দেবেন তিনি শহীদ, কিন্তু যিনি জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে ‘বেগম পাড়ায়’ পালিয়ে যাবেন কিংবা ভিনদেশের দপ্তরে সামান্য অনুমতির জন্য ধরনা দেবেন, তিনি কেবলই একজন আধুনিক ‘নিয়াজি’।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি