ভারতে ভোটার তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং খেয়ালখুশিমতো ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ড. সীমা খান্নার নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। বর্তমানে তিনি ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে ‘ইসিআইনেট’-এর তদারকি করেন। সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়া তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচন করেছেন, কীভাবে ‘ইসিআইনেট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মাঠপর্যায়ের ‘নির্বাচনি নিবন্ধন কর্মকর্তাদের’ কার্যক্রম এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ভারতে কোভিড মহামারি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে যারা সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, তাদের কাছে ড. সীমা খান্নার নামটি পরিচিত। সে সময় ‘আরোগ্য সেতু’ অ্যাপের দ্রুত উন্নয়ন ও চালুর বিষয়টি তিনিই তদারকি করেছিলেন। কোনো আইনি সুরক্ষা ছাড়াই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চালু করা এই অ্যাপ ব্যবহারকারীদের সংবেদনশীল স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করত এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি করত। তখন সমালোচকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, গোপনীয়তা রক্ষার সুনির্দিষ্ট আইন ছাড়াই চিকিৎসা-সংক্রান্ত ইতিহাস ও সামাজিক যোগাযোগের তথ্য এভাবে সংগ্রহ করা জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার আড়ালে রাষ্ট্রের স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে তুলছে।
কেউ বলতে পারেন, এটি ড. সীমা খান্নার দক্ষতারই প্রমাণ। কিন্তু দক্ষতা অনেক সময় অপরাধের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়। মাঠপর্যায়ের ‘নির্বাচনি নিবন্ধন কর্মকর্তাদের’ কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং তাদের আইনি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বিষয়টিকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে তিনি এসব কর্মকর্তার ‘অজ্ঞতা’র অজুহাত দেখাতে পারেন না।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ও সামাজিক যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি আরো গুরুতর। ১৯৯২ সালের ‘মার্সেল’ মামলায় যুক্তরাজ্যের বিচারক স্যার নিকোলাস ব্রাউন-উইলকিনসনের সতর্কবাণী এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ‘পুলিশ, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং অন্যান্য সংস্থার সংগৃহীত তথ্য যদি একটিমাত্র নথিতে বা ফাইলে একত্র করা হয়, তবে ব্যক্তির স্বাধীনতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। ব্যক্তিগত তথ্যের এমন নথি হলো সর্বগ্রাসী বা একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতীক।’ ব্যক্তিগত তথ্যের এমন নথি যেকোনো দেশের যেকোনো নাগরিকের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
গত সপ্তাহে আমি দেখিয়েছিলাম, কীভাবে ভারতের শূদ্র জনগোষ্ঠীর পরিচয় সুপরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে। তবে ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম এখনই বাদ দেওয়া হচ্ছে না। তাদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি শুধু ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। শূদ্রদের এখন বিশ্বাস করানো হচ্ছে, শুধু মুসলমান, অন্যান্য সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি সৃষ্টির আড়ালেই কার্যত শূদ্রদের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হচ্ছে।
ভারতে জনপরিসর থেকে ‘শূদ্র’ শব্দটি কার্যত মুছে ফেলা হলেও অভিজাতদের নিজ বর্ণের মধ্যে বিয়ের কঠোর প্রথাটি রয়েই গেছে। ‘প্রতিলোম’—অর্থাৎ উচ্চবর্ণের নারী ও নিম্নবর্ণের পুরুষের—সম্পর্কের জেরে সংঘটিত সহিংসতা কিংবা আন্তঃবর্ণ ‘অনার কিলিং’ পুলিশের নথিতে সাধারণ হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করে ধামাচাপা দেওয়া হয়। রাষ্ট্র নাগরিকদের সমান চোখে দেখার দাবি করলেও সমাজ তা করে না। ব্যক্তিগত তথ্যের এমন সব নথি যখন এমন এক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যা উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী অভিজাত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তখন কী ঘটতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
এক দশক আগেই কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছিল, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ তথ্য বা ‘ডিজিটাল পদচিহ্ন’ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমে নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল বা বৈশিষ্ট্য তৈরি করা হয়। এরপর তাদের মানসিক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক ফলাফলকে প্রভাবিত করা হয়।
রুকমিণী এস.-এর ‘হোল নাম্বারস অ্যান্ড হাফ ট্রুথস’ বইটিতে বলা হয়েছে, এই নজরদারি ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য যে তথ্য বা ডেটা ব্যবহার করা হয়, তা গোড়া থেকেই পক্ষপাতদুষ্ট। পুলিশ যখন আন্তঃবর্ণ বিয়েকে অপহরণের ঘটনা হিসেবে দেখানোর জন্য এফআইআরের বয়ান বদলে দেয় কিংবা পৌরসভার কর্মীরা গ্রামীণ এলাকার মৃত্যুর হিসাব বাদ দেন, তখন তারা এই ব্যবস্থার মধ্যে পক্ষপাত ও অদক্ষতাকে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেন। জাতীয় নথিপত্র বা রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এই ত্রুটিপূর্ণ তথ্যকেই ‘বস্তুনিষ্ঠ সত্য’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। অ্যালগরিদম সেই তথ্যকে হাতিয়ার করে নাগরিকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে কিংবা তাদের সম্পর্কে বিশেষ ধারণা বা প্রোফাইল তৈরি করে। সবটাই করা হয় একধরনের ‘অমোঘ নির্ভুলতা’র বিভ্রম সৃষ্টি করে।
নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে ২০০৯ সালে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া (ইউআইএন) আধার চালুর মাধ্যমে নজরদারি রাষ্ট্রের সূচনা হয়েছিল সরলভাবেই। কল্যাণমূলক ব্যবস্থার অপচয় রোধের একটি জনহিতকর উপায় হিসেবে এটিকে প্রচার করা হলেও বাস্তবে এর চরিত্র ছিল পুরোপুরি উল্টো। মুখের ছবি, উভয় আইরিসের স্ক্যান এবং দশ আঙুলের ছাপের মতো জৈবিক শনাক্তকারীকে একটি ১২ অঙ্কের নম্বরের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে নাগরিকরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার ক্ষমতা হারান। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের সব নথিপত্রের ভিত্তিও স্থাপন করা হয়।
২০১৩ সাল নাগাদ শারদ শর্মার সহ-প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান সফটওয়্যার প্রোডাক্ট ইন্ডাস্ট্রি রাউন্ড টেবিল’ বা ‘আইস্পিরিট’ গঠনের পর এই বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রটি বেঙ্গালুরুতে স্থানান্তরিত হয়। এই থিংক ট্যাংকটি ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’ তৈরি করে। সিলিকন ভ্যালি যেখানে বিজ্ঞাপনের জন্য নজরদারি পুঁজিবাদের পথপ্রদর্শক ছিল, সেখানে বেঙ্গালুরু এই সরঞ্জামগুলোকে নজরদারি রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী করে তোলে। এর মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবদ্ধ ও পরিচালনা করার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা হয়।
২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জন ধন, আধার ও মোবাইল—এই তিনটির সমন্বয়ে পরিকল্পনাটি আরো গতি পায়। সরাসরি সুবিধা হস্তান্তরের জন্য প্রচারিত ‘জ্যাম’ একটি ডিজিটাল আবরণ হিসেবে কাজ করত, যা জৈবিক পরিচয়, যোগাযোগের ধারা ও ব্যাংক হিসাবগুলোকে সংযুক্ত করত। এরপর আসে ২০১৬ সালের সেই বিধ্বংসী আঘাত। নোট বাতিলের ফলে নগদ অর্থনীতিকে ডিজিটাল পথে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, যা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) চালুর পথ প্রশস্ত করে। ইউপিআই অনানুষ্ঠানিক বাজারের গোপনীয়তা কমিয়ে আনে এবং আর্থিক আচরণের তাৎক্ষণিক চিত্র তুলে ধরতে লেনদেনগুলো নথিভুক্ত করতে শুরু করে।
২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মোদি সরকারের শাসনব্যবস্থা অ্যালগরিদমনির্ভর শাসনে রূপান্তরিত হয়। এই শাসনব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ ও জনসেবা নিয়ন্ত্রণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ডেটা এবং গাণিতিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়। অ্যালগরিদমগুলো নাগরিকদের সম্মতি ছাড়াই বিচ্ছিন্ন বিভাগীয় ডেটাবেস একীভূত করে একটি একক ভবিষ্যদ্বাণীমূলক প্রোফাইল তৈরি করে। এটি ন্যাশনাল সোশ্যাল রেজিস্ট্রির ভিত্তি স্থাপন করে, যা জীবনের প্রতিটি ঘটনা অনুসরণ করার জন্য কার্যত একটি ডেটাবেস। এর ফলে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নীরবে পেনশন বাতিল করে দেওয়া হয়।
২০২০ সালের কোভিড সংকট মোকাবিলায় তৈরি ‘আরোগ্য সেতু’ অ্যাপের মাধ্যমেই ন্যাশনাল ইনফরমেটিকস সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল। এর কার্যক্রম ড. সীমা খান্নার তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়। ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প ডিজিটাল মিশনে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে সাময়িক মহামারি মোকাবিলার পদক্ষেপ স্থায়ী জৈবিক নজরদারিতে পরিণত হয়।
নজরদারি অবকাঠামো তৈরিতে জড়িত ‘আইস্পিরিট’-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে নন্দন নিলেকানি ও শারদ শর্মা ব্রাহ্মণ, অন্যদিকে সীমা খান্না ক্ষত্রিয় বংশের। অর্থাৎ, ‘আইস্পিরিট’-এর মূল চালিকাশক্তির সঙ্গে যুক্ত সবাই উচ্চবর্ণের মানুষ। তাদের হাত দিয়েই একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের ‘প্যানঅপটিকন’ বা সর্বব্যাপী নজরদারিব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা এখন সক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও সংবিধানের সব সুরক্ষাকবচ সরিয়ে ফেলার পর এই ব্যবস্থাকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা বুঝতে খুব বেশি কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হয় না।
এটি পশ্চিমা গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, সার্চ ইঞ্জিন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় একই ধরনের খবর একত্রিত করার দায়িত্ব পালনকারীদের ভূমিকা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। এসব মাধ্যম চীনের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করতে কখনো ক্লান্ত হয় না। অথচ ভারত সরকারের সমগ্র দেশবাসীর ওপর সর্বগ্রাসী নজরদারির এই খবর খুব কমই ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
এক্সপ্রেস ট্রিবিউন অবলম্বনে মোতালেব জামালী