প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম মালয়েশিয়া ও চীন সফরের কারণে সবচেয়ে নাখোশ হয়েছে ইন্ডিয়া! ইন্ডিয়ান মিডিয়া এবং তাদের প্রাক্তন মন্ত্রীসহ অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাতম দেখে বিষয়টি সহজেই আঁচ করা যায়! পাঠকদের হয়তোবা স্মরণে আছে যে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরপর ইন্ডিয়ার প্রাক্তন সেনাপ্রধান শংকর রায় চৌধুরী ‘Delhi can not afford to let Dhaka Slip of it’s Radar’ ওই শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলেন! কাজেই বর্তমান পরিস্থিতি হজম করা ইন্ডিয়ার জন্য কতটুকু কষ্টকর, তা সহজেই অনুমেয়!
বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে এই শংকর রায় চৌধুরীরা কোনোদিন মনস্তাত্ত্বিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। ফলে ‘একই আকাশে একই বাতাসে’ থাকা পাশাপাশি দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে যে চমৎকার সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তা অচিরেই নষ্ট করেছে! আর অল-ওয়েদার বন্ধুত্বের সেই অফারটি নিয়ে এগিয়ে এসেছে চীন! আর উদারচিত্তে সেটি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ! এখানে কোনো ভারসাম্য নয়, নিরাপত্তাই হবে বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সাহসী পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর, ১৩টি সমঝোতা স্মারক এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এসব উদ্যোগকে ভারত তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইন্ডিয়ান মিডিয়ার এসব হা-হুতাশ-হুমকি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালীন সময়েই সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ইন্ডিয়ার এই মনোভাব আঁচ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে শি জিনপিং জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করবে চীন। এই ছোট্ট বাক্যটি অনেকের কাছেই অত্যন্ত ভারী লেগেছে।
নিজের বাবা-মায়ের প্রতি চীনের জনগণের যে ভালোবাসা ছিল—এর পুরোটাতেই আবার অবগাহন করলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। গুটিকয়েক দালালের চোখ ছাড়া প্রায় ৪০ কোটি চোখ অত্যন্ত তৃপ্তিভরে এই দৃশ্যটি উপভোগ করেছেন এবং মনে মনে বলেছেন, আলহামদুলিল্লাহ!
সফর থেকে ফিরে সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইন্ডিয়ার প্রাক্তন কেবিনেট মিনিস্টার ড. সুব্রামানিয়ান স্বামী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘ভারত ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে এমন একটি সমঝোতা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে যদি হিন্দুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ঘটে, তাহলে ভারত তাদের সুরক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করতে পারে। বর্তমান ভারত সরকার সেই অধিকার প্রয়োগ করছে না। আমার মতে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভারতের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নীতিনির্ধারণের এই অশুভ প্রবণতা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের ফলে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কল্পিত নির্যাতনের গল্প ফাঁদা হয়েছে। যখনই ইন্ডিয়ার জন্য বাংলাদেশকে চাপে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তখনই ইন্ডিয়া এই ইতরামোটি করেছে! সেই গল্প আবার ইন্ডিয়ার নিজের সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়!
আইনশৃঙ্খলাজনিত অপরাধকেও সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে! যারা হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি দখল করেছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ঘাঁটলে দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী! হিন্দু সম্প্রদায় সম্পর্কে আওয়ামী লীগের কৌশলটি ছিল—দেশে থাকলে ভোট পাই, দেশ ছাড়লে জমি পাই! এসব জমি দখলকারীর মধ্যে অনেক হাজি থাকলেও একজনও মাওলানা বা মুফতি পাবেন না।
রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিস সংখ্যালঘুদের প্রতি এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। এ ব্যাপারে আমাদের রাসুল (সা.) সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘মজলুম যদি বিধর্মী হয়, তবে কিয়ামতের দিন আমি সেই মজলুমের পক্ষে দাঁড়াব!’ একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান রাসুল (সা.)-এর নির্দেশকে অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করেন।
বিজেপির উগ্রকর্মীরা যেভাবে মুসলমানদের জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করছেন—এ রকম কাজ কোনো মুসলমান করেননি! মুসলমানরা ৮০০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছেন, যখন সারা পৃথিবীতে আজকের মতো মানবাধিকারের সর্বজনীন চার্টারসহ এ রকম বাকস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা মনিটরিং করার মতো কোনো বিশ্ব সংস্থাও ছিল না! কাজেই মুসলমানরা জোর করে কালিমা পড়াতে চাইলে এই উপমহাদেশে হিন্দুরা মেজরিটি থাকা তো দূরের কথা, কোনো হিন্দুরই অস্তিত্ব থাকত না!
এ কারণেই জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামপন্থি দলগুলোকে হিন্দুদের মন্দির বা তাদের বাড়িঘর পাহারা দিতে দেখা গেছে। আর বিপরীতে বিজেপির বড় বড় নেতা প্রকাশ্যে মুসলমানদের লাথি দিয়ে পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে পাঠানোর হুমকি দেন!
প্রকৃতপক্ষে ইন্ডিয়া এবং তাদের এদেশীয় এজেন্টদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দু নাগরিকরাই। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তারাও অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের আলোচনায় আবদ্ধ অবস্থায় দেখতে বাধ্য হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু এ ধারণাটিকেই পাল্টাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন! একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক, জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন—সব নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সমান মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশি হিসেবে দেখা এবং কোনো সম্প্রদায়কে অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগটি না দেওয়া।
হিন্দুত্ববাদী ও মতলববাজ এই গোষ্ঠীটির সঙ্গে পশ্চিমা সমাজের একটি সুসম্পর্ক ছিল। তাদের সেই সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে হিন্দুত্ববাদী এসব মিথ্যা প্রচারণাই বিশ্বব্যাপী ছড়ানোর সুযোগ পায়। ফলে বিশ্বে একটা জুলুমমূলক একতরফা সাংস্কৃতিক বা তামুদ্দিনিক ব্যবস্থা চালু হয়! আর এর বড় শিকার হয় উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং মুসলিম মেজরিটি দেশগুলো—বিশেষ করে, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ!
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে! অন্য কথায় পুরো বিশ্বব্যবস্থা একটি স্বস্তিদায়ক ভারসাম্যে পৌঁছেছে! ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের আউটকাম চীনের প্রভাবকে আরো বৃদ্ধি করেছে এবং চীনকে মুসলিম বিশ্বের আরো কাছাকাছি এনে দিয়েছে!
হিন্দুত্ববাদী শক্তি বাংলাদেশকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। আসাম এবং ত্রিপুরায় আগে থেকেই বিজেপির প্রাদেশিক সরকার ছিল। এবার দখল নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের! এরা সবাই মিলে বাংলাদেশকে যেভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছিল, তাতে চীন এবং পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের অ্যাটমিক আমব্রেলায় যুক্ত হওয়া অতিজরুরি হয়ে পড়েছে!
হিন্দুত্ববাদী এবং আধিপত্যবাদী শক্তির হাত থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য যেমন বাইরের বন্ধুদের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে, তেমনি দরকার একটা ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য।
গত কয়েক দিনে আশাবাদী হওয়ার মতো অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে
এবারের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দীর্ঘ বক্তব্য দেশের মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক বিভাজনের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, সেই প্রেক্ষাপটে দুই নেতার বক্তব্যে অতীতের দ্বন্দ্বের চেয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী একাত্তরের চেতনা নিয়ে একটু বেশি আবেগায়িত থাকলেও আগের টার্মে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তার পূর্ণমন্ত্রী জামায়াতের প্রাক্তন আমির শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ভূয়সী প্রশংসা করতে একটুও কার্পণ্য করেননি। এমনকি বিরোধী দলের এমপিদের বিশেষ বন্দোবস্ত উদার হস্তে দিয়ে প্রশান্তচিত্তে ছবির জন্য পোজ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমরা দেশের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি, অনেক বক্তব্য রেখেছি। অতীতে কী হয়েছে ভালোমন্দ, আমি সেই ডিবেটে আর যাব না। আমাদের অবশ্যই সামনে চলতে হবে। দুঃখজনকভাবে অতীতে একটি চিত্র বারবার দেখেছি আমরা; সেটি হচ্ছে—যত আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছি, তার থেকে বেশি আমরা অতীত নিয়ে আলোচনা করেছি। আমি মনে করি, আজকে দেশের প্রত্যেকটি মানুষ চায় যে—আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলব।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্পায়ন এবং সুশাসনের বিষয়গুলো সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ায় সফরে গিয়ে প্রবাসীদের উদ্দেশে যে বক্তব্য রেখেছেন, সেখানেও জাতিগঠনে অনেকগুলো দামি কথা বলেছেন! সেখানেও তিনি নিজের পরিবারের একটি কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে এই প্রতিহিংসা থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন! আমার মনে হয়, জাতির কিছু ক্রনিক রোগ তিনি সঠিকভাবে ডায়াগনোসিস করেছেন। এখন দরকার সঠিক নিরাময়।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের সমালোচনা করলেও তা ছিল সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি জনগণের স্বার্থ, জবাবদিহি, নৈতিকতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতার প্রশ্নগুলো গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি সংসদীয় সংস্কৃতির পক্ষে মত দিয়েছেন, যেখানে বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয়; বরং বিকল্প মতামতের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী করা।
এই অধিবেশনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা। তারা সংসদ পরিচালনায় যে নিরপেক্ষতা, ধৈর্য এবং সংসদীয় বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন, তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। একটি কার্যকর সংসদের জন্য নিরপেক্ষ সভাপতিমণ্ডলী অপরিহার্য এবং এবারের অধিবেশন সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই পূরণ করেছে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সরকার ও বিরোধী দলের সহাবস্থানে। শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল। একপক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, অন্যপক্ষ গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে ভুলগুলো সংশোধনে সহায়তা করবে—এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল দর্শন।
বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে এমন একটি সংসদের প্রত্যাশা করেছে, যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে নীতিনির্ভর বিতর্ক হবে; যেখানে হট্টগোলের পরিবর্তে যুক্তি স্থান পাবে; যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হবে।
অবশ্য একটি অধিবেশন দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। এই ইতিবাচক পরিবেশকে ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখতে হবে। সরকারকে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, আবার বিরোধী দলকেও গঠনমূলক সমালোচনার ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে। সংসদের মর্যাদা রক্ষায় সব রাজনৈতিক দলের সমান দায়িত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন সময়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। জনগণ সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতা চায়; প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠন চায়; বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্য চায়। বাজেট অধিবেশনের আলোচনাগুলো যদি সেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়ে থাকে, তবে তা হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক অত্যন্ত শুভ লক্ষণ।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং সংসদ নেতা তারেক রহমানের দীর্ঘ বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। উভয়ের বক্তব্যেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন। অতীতের তিক্ততা নয়, বরং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ছিল তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সুশাসন এবং জাতীয় উন্নয়ন নিয়ে তারা গুরুত্বের সঙ্গে মতামত তুলে ধরেছেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত ছিল, যখন সংসদ নেতা বললেন—‘আমি বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ১০১ শতাংশ একমত।’ বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায়নি।
দুই নেতার বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল না, প্রতিহিংসার ভাষা ছিল না, রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যও ছিল না। যেখানে মতভেদ ছিল, সেখানে তারা যুক্তি দিয়ে বিরোধিতা করেছেন; আবার যেখানে প্রশংসা প্রাপ্য, সেখানে অকুণ্ঠভাবে প্রশংসাও করেছেন। এটিই তো সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য। এই ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভূমিকাও অনেকেই উল্লেখ করছেন। সরকারি দলের সদস্যদের পক্ষ থেকেও তার ভদ্রতা, সংযম ও সংসদীয় আচরণের প্রশংসা শোনা গেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা।
প্রথম সংসদ থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসে সংঘাত, বর্জন ও অবিশ্বাসের অধ্যায় কম ছিল না। এখন সময় এসেছে ত্রয়োদশ সংসদ সেই ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করুক—যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দল প্রতিদ্বন্দ্বী হবে, কিন্তু শত্রু নয়; মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐক্যও থাকবে।
আজ ত্রয়োদশ সংসদের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, হয়তো বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আজকে সামনের দিকে তাকালে চ্যালেঞ্জ যতগুলো দেখা যাচ্ছে—সম্ভাবনা তার চেয়ে খুব কম দেখা যাচ্ছে না!
লেখক : কলামিস্ট