ভারতের জাতীয় রাজনীতির বর্তমান পালাবদলের দুটি দিক রয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও আসলে তা নয়। প্রথমত, লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও বিজেপি ভারতকে প্রায় একদলীয় শাসিত রাষ্ট্রে পরিণত করার এক রাজনৈতিক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু আঞ্চলিক দলগুলোকে ভেঙে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে বা ধ্বংস করে এ প্রক্রিয়াটি চালানো হচ্ছে, তাই কংগ্রেসই একমাত্র উল্লেখযোগ্য বিরোধী দল হিসেবে টিকে আছে। এর ফলে ভারতীয় রাজনীতি এখন কার্যত দুই দলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে মাত্র ১০ শতাংশ বা তার কাছাকাছি জয়ের হার নিয়ে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারছে না কংগ্রেস।
এ ধরনের দ্বিদলীয় ব্যবস্থা বিজেপির জন্য সুবিধাজনক, কারণ নির্বাচনে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের মুখোমুখি হলেই শুধু তাদের বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু এখন এসব দলের বেশির ভাগই কোণঠাসা অথবা বিলীন হওয়ার পথে। আর অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টিকে এবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথের কঠিন ‘চ্যালেঞ্জের’ মুখোমুখি হতে হবে।
এ ক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এক. মোদি-অমিত শাহর নেতৃত্বাধীন বিজেপি কেন কংগ্রেসকে এত সুবিধাজনক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে? দুই. কংগ্রেসের কী ঘাটতি আছে, যার ফলে তারা বিশ্বাসযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারছে না? তিন. কংগ্রেস কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে? প্রথম প্রশ্নের উত্তরটি সহজÑবিজেপি চারটি ইঞ্জিনের ওপর ভর করে এগিয়ে চলেছে। এগুলো হচ্ছেÑকট্টর হিন্দুত্ববাদ, আরো কট্টর জাতীয়তাবাদ, দক্ষ ও সুষ্ঠু জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং সবার চোখে পড়ার মতো বিশাল ভৌত অবকাঠামো।
কংগ্রেসের কাছে এর কোনো বিশ্বাসযোগ্য পাল্টা জবাব নেই, যা দ্বিতীয় প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। কংগ্রেসের মতে, বিজেপির সব কাজই যদি ভুল হয়, তবে ক্ষমতায় এলে তারা কী করবে? অর্থনীতি, কৌশলগত বিষয় এবং প্রতিরক্ষাÑএসব ক্ষেত্রে তারা কীভাবে বিজেপির চেয়ে আলাদা হবে? পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তারা কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করবে? প্রতিরক্ষা খাতে তারা কীভাবে ব্যয় করবে? বিজেপির বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
বিজেপি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত, ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি-তোষণকারী এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করছে’Ñএসবই নিছক মতামত, যা প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কংগ্রেস ঠিক কী ভিন্ন পদক্ষেপ নেবেন? কংগ্রেস যদি চায় ভোটাররা বিজেপির চেয়ে তাদেরই বেছে নিক, তবে তারা যে ‘পণ্য’ বা বিকল্প তুলে ধরছে, তা বিজেপির চেয়ে কতটা আলাদা? কংগ্রেসকে সবার আগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। এরপর মোকাবিলা করতে হবে সেই ‘চারটি ইঞ্জিনের’ যা বিজেপির রথকে (বা রেলগাড়িকে) এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রথমত, হিন্দুত্বের প্রশ্নে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয় কংগ্রেসের। ওই ক্ষেত্রটি বিজেপি এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নেতারা যত মন্দিরেই যান না কেন, বিজেপির সেই অবস্থানে তারা কোনো ফাটল ধরাতে পারবেন না। এমনকি শিবসেনাও হিন্দুত্বের এই লড়াই ছেড়ে দিয়েছে। শিবসেনা নেতা উদ্ধব ঠাকরে একবার আমাকে বলেছিলেন, বালাসাহেব (তার বাবা) ‘মহারাষ্ট্রবাদ’ (আঞ্চলিক আবেগ) থেকে সরে এসে ‘হিন্দুত্ববাদ’-এর পথে গিয়ে ভুল করেছিলেন। কারণ এর ফলে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে শিবসেনার নিজস্ব এলাকায় ঢুকে পড়ে তা দখল করে নেওয়া সহজ হয়েছিল।
জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে কংগ্রেস আকাশ-কুসুম প্রতিশ্রুতি দিতেই পারে, যেমনটা তারা কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় সফলভাবে করেছে। কিন্তু পরিকাঠামোর প্রশ্নে তাদের সমস্যা হবে। কারণ, এত দিন তারা বড় বড় প্রকল্পের বিরোধিতা করে এসেছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ নিকোবর প্রকল্প।
ধর্মের বিষয়টি কংগ্রেসের নাগালের বাইরে এবং জনকল্যাণ বা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো আবেগ জাগানোর জন্য খুব একটা জোরালো নয় বলে দলটির হাতে এখন একমাত্র ‘জাতীয়তাবাদ’-এর ইস্যুটিই অবশিষ্ট আছে। ২০১৪-পরবর্তী রাজনীতিতে কংগ্রেস কীভাবে জাতীয়তাবাদের পথ থেকে সরে এসেছে, তা কৌতূহলোদ্দীপক একটি বিষয়। দলের একাংশ হয়তো ইউরোপের ‘গ্রিনস’ বা পরিবেশবাদী দলগুলোর মতো আচরণ করার ভান করতে পারে, কিন্তু প্রকৃত কংগ্রেস কখনোই আবেগপ্রবণ শান্তিবাদীদের দল ছিল না।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধেও তারা নির্মম লড়াই করেছিল। ১৯৬৬ সালের ৫ মার্চ বিদ্রোহীরা আইজলের সরকারি কোষাগার, আসাম রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর এবং ডেপুটি কমিশনারের বাসভবন দখলের উপক্রম করলে সরকার বিমান হামলা চালিয়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। এছাড়া অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা পাঠিয়ে ‘অপারেশন ব্লু-স্টার’ এবং পরে ‘ব্ল্যাক থান্ডার ১ ও ২’ অভিযান চালিয়েছিল।
প্রথম দুটি ঘটনা ইন্দিরা গান্ধীর আমলের এবং পরের দুটি তার ছেলে রাজীব গান্ধীর সময়ে। পি.ভি. নরসিমা রাওয়ের সরকারের আমলে কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে দুটি রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়েছিল। এমনকি নেহরুর সময়েও নাগা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল। তিনিই গোয়া মুক্ত করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। কংগ্রেস হয়তো গান্ধী-নেহরু পরিবারের বাইরের প্রধানমন্ত্রীদের খুব একটা পছন্দ করে না। কিন্তু সত্য হলো, তারা কখনোই এমন কোনো নেতা তৈরি করেনি, যিনি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দুর্বল ছিলেন। তাই অবাক লাগে এটা দেখে যে, উগ্র জাতীয়তাবাদের মূল ধারার দলটি আজ কীভাবে পথ হারিয়ে ফেলেছে।
উরি-পরবর্তী সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, পুলওয়ামার পর বালাকোটে বিমান হামলা, পূর্ব লাদাখ/গালওয়ান সংকট কিংবা সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিন্ধুর’সহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই শুধু প্রশ্ন তুলে ও প্রমাণ চেয়ে কংগ্রেস নিজের অবস্থানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা যেমন বালাকোট নিয়ে স্যাম পিত্রোদা বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে দিগ্বিজয় সিংয়ের মন্তব্যের কথা বলা যায়। ইদানীং রাহুল গান্ধীও এমনটা করছেন।
‘চীনারা আমাদের সৈন্যদের মারধর করছে’ কিংবা ‘তারা আমাদের ২,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে’Ñএমন মন্তব্যের জন্য সুপ্রিম কোর্টের ভর্ৎসনার মুখেও পড়তে হয়েছে রাহুলকে। যদিও মানহানির একটি মামলায় আদালত তাকে অব্যাহতি দিয়েছিল। ‘অপারেশন সিন্ধুর’-এর বিষয়ে সংসদে তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল ভারত কতগুলো বিমান হারিয়েছে এবং কেন হারিয়েছে তা নিয়ে।
এছাড়া, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ১৭ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ টুইট করে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন ভারত কেন পাকিস্তানকে জানিয়েছিল, তারা শুধু সন্ত্রাসী ঘাঁটিতেই হামলা চালাবে, কোনো সামরিক স্থাপনায় আঘাত করবে না। তার দলের পাঞ্জাব থেকে নির্বাচিত একজন এমপি তো ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিমানের ধ্বংসাবশেষ বলে দাবি করা একটি অংশ সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। এসবের মধ্যে কতটা বিচক্ষণতা আছে?
এ ক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধী হলে পরিস্থিতিটা কীভাবে সামলাতেন, এর একটা ধারণা আমি দিতে পারি। প্রতিবারই তিনি প্রথমে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করে তাদের সাফল্যকে স্বাগত জানাতেন, তারপর মোদি সরকারের নানা ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করতেন। যেমন : পুলওয়ামায় ৩০০ কেজি আরডিএক্সের অনুপ্রবেশ, পেহেলগামে নিরাপত্তার অভাব কিংবা ‘অপারেশন সিন্ধুর’-এর শুরুর দিকে অতিরিক্ত নমনীয় মনোভাব দেখানো।
কোনো ভুল করলে তা থেকে সরে আসার মতো নমনীয়তা বা কৌশলগত দক্ষতা বর্তমান কংগ্রেসের নেই। মোদির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিন্তু ভিন্ন। ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবের জবাবে মোদি এমন তিনটি মন্তব্য করেছিলেন, যা আমার দৃষ্টিতে ছিল অবিবেচনাপ্রসূত। এগুলো হচ্ছেÑকাচ্চাথিভু প্রসঙ্গ, ১৯৬৬ সালে আইজলে বিমান হামলা এবং অপারেশন ব্লু স্টার নিয়ে করা মন্তব্য। এগুলোর প্রতিটিই ছিল জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়। তবে তিনি তার এসব মন্তব্যের নেতিবাচক দিকটি বুঝতে পেরে এগুলো নিয়ে আবার কথা বলা থেকে সরে এসেছিলেন।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছে প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ইতিহাস এবং স্বাধীনতা আন্দোলন ও সংবিধানের প্রতি যৌথ অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বিজেপি এটিকে হিন্দুত্ববাদী রূপ দিয়েছে। এখানেই কংগ্রেস একটি জোরালো যুক্তি দিতে পারে বা নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু তারা যদি তাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিই আঁকড়ে থাকেÑঅর্থাৎ শুধু এ কথাই বলতে থাকে যে, ভারত ও তার সশস্ত্র বাহিনী চীন এবং পাকিস্তানের কাছে ক্রমাগত হেরে চলেছে, তবে তাতে কেউ প্রভাবিত হবে না। বরং এর ফলে বর্তমানের দ্বিদলীয় সমীকরণটি সহজেই একদলীয় ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে বলে আমার আশঙ্কা।
দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী