১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে পৃথিবীতে প্রথম সোনারগাঁকে রাজধানী করে, আজকের বাঙ্গলার সকল ভূখণ্ডকে নিয়ে বাঙ্গলা নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাজ্য প্রতিষ্ঠা থেকে নিয়েই, কোরবানীর ঈদ এই বাঙ্গলা সংস্কৃতির প্রধান পার্বণ, উৎসব।
একটি ধর্মীয় আচার আর তাকে ঘিরে একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক উদযাপনের এই পার্বণ। যেকোনো সমাজেরই সাংস্কৃতিক আচার আচরণই মূলত উৎসারিত হয়ে থাকে সে সমাজের সামগ্রিক অবচেতনতার সুগভীরে অন্তর্নিহিত প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরের ঐতিহাসিক বিবর্তনে রূপায়িত হয়ে আসা ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ থেকে। বাহ্যিকভাবে দৃষ্ট সাংস্কৃতিক আচার আচরণ সে মূল্যবোধের ব্যঞ্জনা হিসেবেই সংস্কৃতি হয়। সংশ্লিষ্ট সমাজের ব্যাপকতর অংশের সমাজ-সামগ্রিক অবচেতন মূল্যবোধের সঙ্গে ব্যঞ্জনামূলক এই সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সে সব বাহ্যক আচার আচরণ অপসংস্কৃতিতে পর্যবসিত হয়।
কোরবানী আর কোরবানীর ঈদের ক্ষেত্রেও তাই । আর একটি ধর্মাচারকেন্দ্রিক পার্বণকে এভাবে নষ্ট করে ফেলাটা, ধর্মতও চরম পাপ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বাঙ্গলার কোরবানীর ঈদকে আজ তার মূল্যবোধগত মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, পশুখাদকদের গোশত খাওয়া, টিভিতে ঈদের নাটক দেখা আর আমোদ-প্রমোদের এক প্রায় অশ্লীল উৎসবে পরিণত করা হয়েছে। এই পাপ মোচন প্রয়োজন, দৃষ্টিভঙ্গী ও আচরণের যথার্থ সংস্কারের মাধ্যমে।
মূল্যবোধের প্রাণ হয় তার সংশ্লিষ্ট চেতনা, আর তার বোধ এসে থাকে যে মূল ঘটনার ভেতর দিয়ে সংশ্লিষ্ট মূল্যবোধটি সমাজের অবচেতনায় দাগ কেটেছিল ঐতিহাসিক অতীতে, তার জ্ঞান।
কোরবানীর মূল ছিল হাজারো বছর পূর্বে, ‘খোদার প্রেমে’ এক ব্যক্তির এক অপূর্ব আত্মদানের ঐতিহাসিক ঘটনায়।
শতবর্ষেরও অধিক ছিল তাঁর জীবন। তাঁর সে সারা জীবনই তাঁর কেটেছে বিশাল অনাদি অনন্ত অসীম অস্তিত্বের সাদরে সম্পর্কে অতিক্ষুদ্র সসীম মনুষ্য-সংক্ষিপ্ত জীবনের অর্থ ও যথার্থতার সত্যসন্ধান ও খোদারই প্রেমে জীবনের চরম প্রাপ্তি বলে উপলব্ধ সেই সত্য, তাতেই সিদ্ধ জীবনসাধনায়।
সত্যগ্রহের এক শতবর্ষী জীবন
মূলত ও প্রধানত: দ্রাবিড় সেমিটিক অনার্য জাতির বাঙ্গলার হাজারো বছর পূর্বের আদি নিবাস, আরব্যভূমের পূর্ব প্রান্তে, দক্ষিণ ইরাকের উর দেশে এই উপাখ্যানের সূচণা। সেখানকার তখনকার সরকারী ‘বৈজ্ঞানিক’ উপদেষ্টাদের পূর্বাভাস অনুসরণে প্রণীত সরকারি নীতি মোতাবেক তাঁর তো বেঁচে থাকারই কথা ছিল না। সেকালের তথাকথিত বিজ্ঞানীদেরও, আজকালকার তথাকথিত বিজ্ঞানীদের মতোই বিজ্ঞানসাধনার কোনো এক পর্যায়ে বিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞানের মতোই দেখানো অপবিজ্ঞানে পিছলে পড়ার বাতিক ছিল। ফলে একালের মতোই সেকালেও প্রকৃত বিজ্ঞানী (scientist) থেকে বিজ্ঞানীসুলভ ভাষা আর ভাবভঙ্গী বেচা খল বা হাতুড়ে ‘বিজ্ঞানী’ (quack) আলাদা করে চেনার উপায় বিজ্ঞানী নয়, এমন সবার জন্য ছিল খুবই দুরূহ—আজকালকার মতোই। আজকালও যেমন অনেক সময় খলবিজ্ঞানী বিজ্ঞানী সেজে সরকারের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হয়ে বসে সরকারের নীতিকে ভ্রষ্ট করে, সেকালেও তেমন হতো। উর দেশের ওই ‘বৈজ্ঞানিক’ উপদেষ্টারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পিছলে পড়া স্খলিত রূপ, জ্যোতিষশাস্ত্র মতে পূর্বাভাসের জায়গায় ভবিষ্যদ্বাণী দিতে শুরু করেছিল। আর আজকের মতোই, এইসব খলবিজ্ঞানীদেরই দোসরসম আবির্ভাব হয় তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক ধর্মে’-এর পসরা করা এমন একধরনের তথাকথিত ‘ধর্মানুরাগী’ যারা ধর্মের সবকিছুকেই তাঁদের খলবৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে মেপে মেপে বৈজ্ঞানিক বলে প্রমাণের প্রাণপণ অপ্রয়োজনীয় ও অবান্তর আহাম্মকী চেষ্টায় ব্যস্ত। আর এর ভিত্তিতেই তারা খলবিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক নেতিবাচক ভবিষ্যৎ ঠেকাতে যথার্থ মনে করা পদক্ষেপাদি নিত।
সেকালের প্রেক্ষিতে উর দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীসাজা জ্যোতিষগণ গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে নানা বিপদ-আপদের ভবিষ্যদ্বাণীকে বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস বলে ঘোষণা করে তা ঠেকাতে নানা গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা-পাটের নীতি প্রণয়ন করত। তাঁর জন্মের একটু আগে সেকালের সরকারি বিজ্ঞান-উপদেষ্টা, জ্যোতির্বিজ্ঞানীসাজা জ্যোতিষগণ পূর্বাভাস বলে ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করেন সরকারকে যে অচিরে একটি বালক জন্ম নেবে দেশে, যে সরকার পতনের কারণ হবে। এই ভবিষ্যৎ আপদ ঠেকাতে সরকারি নীতিরূপে একটি মানবতাবিরোধী নীতি প্রণীত হয় এই যে, সে বছর দেশে যত পুরুষ শিশু জন্মাবে, স্বৈরাচারী সরকার রক্ষার স্বার্থে, তাদের সকলেরই গণহত্যা সংঘটিত করা হবে।
তাঁর জন্মের ওই সময়ে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা মা অনাগত শিশুর প্রাণনাশের ভয়ে আতঙ্কিত হলে, খোদায়ী নির্দেশে নবজাতক শিশুটিকে শহরের উপকণ্ঠে একটি পর্বতগুহায় লুকিয়ে রেখে দিয়ে আসেন। গুহাটির মুখ ঢেকে রাখা হয় একটি বড় পাথর দিয়ে। সরকারি বাহিনী বা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মীরা শিশুটির খবর না পাওয়ায় নিরাপদ থেকে, মা নিয়মিত রাতে গিয়ে শিশুটিকে দেখে আসেন, আর বাদবাকী সময়, জিব্রীল ফেরেশতা তাঁর লালন-পালনের জন্য আসতেন। শিশুটির মুখে তাঁর শাহাদতের আঙুল দিলে, শিশুটি তা চুষতেন, আর তা দিয়ে মিষ্ট দুধ প্রবাহিত হয়ে শিশুর ক্ষুধা-তৃষ্ণা দূর করত।
গুহাবাসী শিশুকে কেউ কোন নামই হয়তো দেয়নি জন্মের সময়।
এক সময় তিনি ‘ইব্রাহীম’, ‘এব্রাহীম’ বা ‘আব্রাহেম’ বলে পরিচিত ও সম্বোধিত হন। মনুষ্যভাষার লিখনপদ্ধতিতে স্বরবর্ণ বা স্বর লেখার নিয়ম ছিল না—শুধু ব্যঞ্জনবর্ণ লেখা হতো। ফলে, নাম যা-ই হোক, স্বরবর্ণ না লিখেই তা লিখলে, ইবরাহীম, এবরাহেম, আব্রাহেম, বা আব্রাহাম লেখা হয়, ‘বরহম’। তা সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘ব্রহম’, আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘ব্রহ্ম’ও হয়ে থাকতে পারে। এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে, ইবরাহীম, এবরাহেম, আব্রাহেম বা আব্রাহাম ও ব্রহ্ম—এ সবই একই ব্যক্তিরই নাম হয়ে থাকবে।
সম্ভবত শিশুটির এইভাবে গুহাবাসী হিসেবে বেড়ে ওঠার সময়ই—অথবা তাঁর জন্মের আগেই তাঁর বাবা তারেহ ইন্তেকাল করলে, তাঁর মা তারপর তাঁর ভাই আজরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধা হন। বা আরো একটু পরে।
একসময় শিশুটি বালক হন, বালকটি বাড়ী আসেন।
বাড়ীতে সৎ বাবা আজরের কর্ম ও চিন্তার সঙ্গে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ইব্রাম বা ইব্রাহীমের অন্তর্দৃষ্টিজাত দৃষ্টিভঙ্গির মিল হলো না। সৎ বাবা আজর সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি, ও তজ্জাত কর্ম-আচার, আচরণ—আর তৎসংশ্লিষ্ট চিন্তার অভ্যাসেরই দাস ছিলেন, যেমনটি হয়ে থাকে সমাজের অধিকাংশই। আজও, যেমন সেকালে। গড্ডলিকায় প্রবহমান। তখনকার সমাজে লোকেরা বিজ্ঞান হিসেবে চর্চিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্খলিত অপবৈজ্ঞানিক প্রহসনরূপ জ্যোতিষশাস্ত্রকে ভিত্তি করে ধর্ম বলে প্রচলিত করে দেয়া চিন্তাচেতনা ও আচার-অনুষ্ঠানে আকাশের নক্ষত্ররাজিকে বিভিন্ন শক্তিধর ভাগ্যনির্ধারক দেবদেবী মনে করে, তাদের কল্পিত শক্তির মূর্ত রূপ বলে কল্পিত অবয়বকে মূর্তিরূপে সৃষ্টি করে সে সবের পূজাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ইব্রাহীমের নিজ বাবা ও মা একেশ্বরবাদী সত্যধর্মের বিশ্বাসের যা কিছু তখনও প্রকৃতিগতভাবেই বাকী ছিল, তা ধারণ করলেও—তাঁর সৎ বাবা, ‘বাবা আজর’ও সমাজের সঙ্গে ওই নক্ষত্রপূজারী মূর্তিপূজকদের চিন্তাচেতনা মত, সেসবের পূজা করতেন। শুধু সে সব পূজাই শুধু করতেন না, সে পূজাভিত্তিক যে ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল ভণ্ড ধর্মযাজকদের, তার ব্যবসায়িক দোসর শিল্পকলা-বিক্রেতা হিসেবে আয়-উপার্জনও করতেন। আজও করেন অনেক অপসংস্কৃতিকৃতিমূলক শিল্পকলা-বিক্রেতা, আমাদের সমাজেও। তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক’ ধর্ম, আর জনপ্রিয় করে তোলা চেতনার ব্যবসাও ছিল এর সঙ্গে, আজকালকার মতোই—সরকারি অনুদানের সঙ্গে সঙ্গে নানা বেসরকারি সংস্থাও এসব ব্যবসায়কে প্রশ্রয় দিয়ে, আর্থিকসহ নানা সুযোগ-সুবিধা করে দিত। আর সেকালের সাধারণের জনপ্রিয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব কুসংস্কারমূলক অপসংস্কৃতি-কর্মী ও কর্মের কর্মকারদের আলোকিত সুশীল মনে করা হতো।
গুহাবাসী বালক ইব্রাহীমের সরল, প্রাকৃতিক বুদ্ধিদীপ্ত অন্তর্দৃষ্টি থেকে উৎসারিত সত্য একেশ্বরবাদী চেতনার সঙ্গে তাঁর সৎ পিতা আজর ও তার ব্যাপকতর সমাজ ও সরকারের ধর্মব্যবসাসহ নানা অপসংস্কৃতিমূলক চিন্তাচেতনা, কর্মকাণ্ডের মিল না হওয়ারই কথা। তাতে যে সংঘাত, তার জেরে তাঁকে বাড়ী, এমনকি নিজের দেশটি পর্যন্ত ছেড়ে যেতে হয়, পৌত্তলিকদের চিন্তাচেতনা, কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আপস করে মেনে না নেওয়ায়।
এক বয়োবৃদ্ধা বন্ধ্যা স্ত্রী, সারাহকে সঙ্গে নিয়ে য়িরূসালেমের নিকটবর্তী এলাকায় এলে, স্ত্রী সারাহর অনুরোধে তাঁর সেবিকা হাজেরার সঙ্গে নিকাহ করলে ইব্রাহীমের বয়স প্রায় ১০০ হলে, হাজেরার গর্ভে পুত্রসন্তান ইসমাঈল জন্মলাভ করলে, অবশেষে যেন তাঁর একটি স্বাভাবিক পরিবার প্রতিষ্ঠিত হয়।
সন্তান উৎসর্গের রীতি
দুনিয়ার অনেকখানের মতোই মধ্যপ্রাচ্যেরও অনেক খানেই লোকে কল্পিত খোদাদের নৈকট্য লাভ করে তাদের খুশি করে তাদের কল্পিত শক্তি থেকে কোনো কিছু পাওয়া, বা তার রোষে কল্পিত বিপদ এড়ানোর জন্য ভেট মনে করে কিছু উৎসর্গ করে দিত। আর তা সম্ভবত অনেক সময়ই করত প্রখর আলোকোজ্জ্বল মধ্যদিনে, ঢাকঢোল পিটিয়ে যথাসম্ভব প্রকাশ করে, যাতে সেই সব কল্পিত খোদার প্রতি তাঁদের আত্মসমর্পণ যে কত চূড়ান্ত তা দেখিয়ে তাদের সর্বোচ্চ সম্ভব খুশি করা যায়।
মনোজগত ও সমাজে এসব কল্পিত খোদার জন্য সন্তান উৎসর্গের এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন রীতির মূলোৎপাটন করে বরং নিজের সর্বোচ্চ প্রিয়কে প্রকৃত খোদার জন্য উৎসর্গের আত্মত্যাগের অভিষেকের জন্যই যেন ইব্রাহীমের হৃদয়ে প্রকৃত খোদার জন্য প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তান, ইসমাঈলের কোরবানীর উৎসর্গের ধারণা হয়, এক খোদায়ী স্বপ্নে। পুত্র ইসমাঈল ১০/১২ বছর বা তার আশপাশের বয়সে কৈশোরের দোরগোড়ায় পৌঁছে প্রায় ১১০-এর আশপাশের কোন এক বৎসর বয়সি বাবার অতি প্রিয় আদৃত সহায়ক সঙ্গীর পর্যায়ে পৌঁছালে। বয়োবৃদ্ধ ইব্রাহীম ঐশী স্বপ্নযোগে খোদার প্রেমে, তাঁর আদেশে, এই অমূল্য আত্মজকে কোরবান করে উৎসর্গ করে দিতে নির্দিষ্ট হলে পিতা-পুত্র এমনকি সম্ভবত পুত্রমাতা, সকলেই প্রেমাপ্লুত আনুগত্যে খোদায়ী প্রেমের ওই দাবিতে সমর্পণ করেন।
মা সম্ভবত সন্তানকে খোদার জন্য উপহার হিসেবে সাজিয়ে-গুজিয়ে, অশ্রুসিক্ত নয়নে বাবার সঙ্গে দিয়ে পাঠালে, তিনি তাঁকে নিয়ে তাঁকে কোরবান করার জন্য মক্কা শরীফের কেন্দ্রে কা’বা শরীফ থেকে কিছু দূরের মীনা এলাকার দিকে রওনা হন। একটি দয়ালু বৃদ্ধের রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়ে শয়তান প্রথমে তাঁদের এ কর্মে রওনা হওয়ার আগেই তাদের গৃহদ্বারে গিয়ে সেখানে কোরবানীর জন্য সন্তানকে ইব্রাহীমের আসার আগেই, তখনো এ বিষয়ে না জানা মাকে এসে বাবার উদ্দীষ্ট এই কর্মের বিরুদ্ধে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টার পর, পিতা-পুত্র সে আত্মত্যাগের তীর্থে রওনা হলে পথে বারবার, মোট তিনবার আত্মপ্রকাশ করে তাঁদের উভয়কে এর বিরুদ্ধে বোঝাতে চেষ্টা করে। প্রতিবারই তাঁরা তাকে পাথর ছুড়ে মেরে বিতাড়িত করে আত্মত্যাগের প্রত্যয়ে সুদৃঢ় থেকে, অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাকেও অতিক্রম করে অবশেষে সেই কোরবানী সম্পন্ন করেন।
উৎসর্গের প্রতীকায়ন
কিন্তু এই কোরবানীর শেষে পিতা দেখতে পান, তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তানের পরিবর্তে কোরবান হয়ে পড়ে আছে একটি ভেড়া।
পিতা-পুত্র সম্ভবত ভেড়ার শরীরটি নিয়েই বাড়ী ফিরে যান হাজেরার কাছে, আর তিনজনেই প্রকৃত খোদার প্রেমের এই বিরাট পরীক্ষায় খোদারই দান হিসেবে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের সক্ষমতায় কৃতজ্ঞতাসিঞ্চিত আনন্দে আপ্লুত হন। আর এই পরীক্ষায় নিজের তরফ থেকে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ—ইসমাঈলের ক্ষেত্রে নিজের প্রাণ, আর ইব্রাহীম ও হাজেরার ক্ষেত্রে, নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তান—উৎসর্গ করে দিলেও, অবশেষে তা’ও হারাতে হয় না, এ ছিল সকৃতজ্ঞ আনন্দে আরো আনন্দের যোগ।
উৎসর্গের পরও প্রাণে বেঁচে যান যে বালক ইসমাঈল, তাঁকে খোদার প্রেমেই তাঁরই কাজে উৎসর্গ করেন পিতা-মাতা ইব্রাহীম ও হাজেরা। বহু প্রজন্ম আগে খোদার এবাদতের প্রথম ঘর—যে কা’বা শরীফ আদম তৈরি করেছিলেন, যা নূহ-এর প্লাবনের সময় বিলীন হয়ে গিয়েছিল, তা পুনর্নির্মাণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণে। ইসমাঈলের পরিবর্তে যে ভেড়াটি কোরবান হয়েছিল, তার শিংও নাকি সে কা’বা ঘরে রেখে দেয়া হয়, আর সম্ভবত আরো বহু প্রজন্ম পরে হজরত মোহাম্মদ (দ.) নিজে তা সরিয়ে নেয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিল।
এ ঘটনার মাধ্যমে কল্পিত খোদার জন্য সন্তান কোরবান করার রীতিই শুধু নয়, আত্মিক বা বস্তুগত কোনোই উপকার ছাড়া, অর্থহীন নিষ্ঠুর সন্তানহত্যার রেওয়াজের অবসান করে, তার পরিবর্তে নিজেরই সন্তানতুল্য আদরণীয় গৃহপালিত এমন পশুর উৎসর্গমূলক রেওয়াজ প্রচলিত হয় ঈদ কোরবান বা ঈদুল আজহার বার্ষিক পার্বণে, যার গোশত শুকিয়ে রেখে সারা বছরের পাশব আমিষের প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা হতে পারে একদিকে—আর যথার্থ আত্মিক উপযোগ পর্যায়ে নিজস্ব সন্তানটিকে উৎসর্গ করা হয় খোদার প্রেমে দেহ-মন-প্রাণ এক করে জীবনযাপনের শিক্ষা ও দীক্ষা দিয়ে, অন্যদিকে। খোদার প্রেমে তাঁর নৈকট্য অর্জনে তাঁর শেখানো মূল্যবোধ ও তদ্ব্যঞ্জক আচার-আচরণ সমৃদ্ধ জীবনযাপন ও প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চসম্ভব চেষ্টায় সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের শিক্ষাকে ব্যক্তিগত ও সমাজ-সামগ্রিক অবচেতনার গভীর সংরক্ষণ ও সক্রিয় রাখার এই মহোৎসব।
‘নৈকট্য’-কে মূল ঘটনার স্থান, আরব্যোপদ্বীপের প্রাচীন অনার্য সেমিটিক ভাষা, প্রাচীন আরব্য ভাষায় ‘কোরব’, ‘কোরবুন’ বা ‘কোরবান’। এ জন্য ‘নৈকট্য’ লাভের সাধনার এই উৎসবকে ‘কোরবানী’ ঈদ বলা হয়। নিজের জীবন-মরণ ধন-সম্পদ, এমনকি নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ উৎসর্গে হারিয়েও খোদার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের সাগ্রহ প্রস্তুতির এই প্রতীকী ব্যঞ্জনামূলক ধর্মাচার করা হয় তার ব্যাপক প্রকাশ সম্ভব যে সময়, মধ্যদিনের প্রোজ্জ্বল আলোকিত লগ্নে। মধ্যদিন, বা তার আলোকে বলা হয়, সেই আরব ভাষায়, ‘দ্জোহা’—আর সে ভাষার বৈয়াকরণিক নিয়মে, এই ‘দ্জোহা’-এর চূড়ান্ত পর্যায়কে বলা হয়, ‘আদ্জহা’। তাই এই কোরবানীকে, ‘আদ্জহা’ও বলা হয়, আর সে ‘কোরবানী’-এর ঈদকে বলা হয়, ‘ঈদুল আদ্জহা’ও।
উপসংহার : অপসংস্কৃতির প্রতিরোধ
কোরবানীর ঈদকে তার মূল মর্মজ্ঞাপক চেতনা নিয়ে পালন করার ভেতর দিয়ে বাঙ্গলার সুগভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্যময় এই প্রধানতম পার্বণকে নিছক গোশত খাওয়ার আর বেলেল্লাপনা-দূষিত নাটক দেখার অশ্লীল-প্রায় অপসাংস্কৃতিক স্খলনের পিচ্ছিল পথ থেকে টেনে তুলে তার গম্ভীর অথচ অনাবিল আনন্দঘন মূল চরিত্রে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।