একটি দেশের সেনাবাহিনী সেই দেশের জনগণের কাছে চোখের কাজলের মতোই প্রিয়। কিন্তু সেই কাজলকে চোখের চৌহদ্দির মধ্যেই রাখতে হয়। চোখ থেকে সামান্য দূরে গালে লাগলেই সেই কাজল আর কাজল থাকে না, কালি হয়ে পড়ে।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের এই কাজলটিকে নয়নের মধ্যেই রাখে! কিন্তু বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই কাজল সারা মুখে লেপ্টে ফেলে!
যারা এই মুখাবয়বটি কুৎসিত বানাতে ভূমিকা রাখেন, নলেজ বেইসড সোসাইটি বানানোর পরিবর্তে পেশিশক্তিভিত্তিক সমাজ গড়েন, তারাই আবার সবার আগে নিজের পরিবারসহ উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমান! ইউনিফর্ম পরে যারা সরকারের বিভিন্ন অধিদপ্তরে চাকরি করেছেন, তাদের নিয়ে একটা সার্ভে করলে আমার এই কথার সত্যতা উপলব্ধি করবেন। গত ষোলো বছর ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে এরা একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন!
দুর্যোগ, জরুরি অবস্থা বা জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বেসামরিক প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্ব ক্রমাগত সামরিক বাহিনীর ওপর পড়লে তা দীর্ঘ মেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রশাসনে সেনাবাহিনীর ব্যবহারটা ছিল পেইনকিলারের মতো। কিন্তু সেই পেইনকিলার দিয়ে রোগ নিরাময় শুরু করতে করতে গেলে যা হয়, আমাদেরও তাই হয়েছে!
অন্য অনেক বিষয় নিয়ে কথা বললেও আমরা ‘মিলিটারাইজেশন অব সিভিল বুরোক্রেসি’ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই না। অথচ আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থায় এটি একটি বড় রোগ হিসেবে উঁকি দিচ্ছে!
বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি এবং আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাউথ এশিয়ান জার্নালের প্রকাশক এবং সম্পাদক গোলাম সোহরাওয়ার্দী গত ২ নভেম্বর ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সরকারি চাকরির সামরিকীকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী কলাম লিখেছিলেন। সেখানে তিনি প্রশাসনের এই ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের সম্ভাব্য বিপদগুলো তুলে ধরেছেন। তার এই লেখাটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে!
দেশ ও দেশের সেনাবাহিনী দুটোকেই ভালোবাসি বলে এ ব্যাপারে চুপ থাকতে পারি না! একদিন সামরিক বাহিনীকে রক্ষীবাহিনী দিয়ে শেষ করতে চেয়েছিলÑঅর্থাৎ তখন বিষ খাইয়ে মারতে পারেনি। তারাই এখন মিঠাই খাইয়ে মারতে চাচ্ছে! এই জায়গায় মুশকিল হলোÑমিঠাই আক্রান্ত সদস্যরা শত্রুকে মিত্র এবং মিত্রকে শত্রু ভাবা শুরু করে! এমনই এক মিঠাই খাওয়ার ইতিহাস আজ তুলে ধরব!
বাংলাদেশ নেভির এক প্রাক্তন অফিসার একটি সহযোগী দৈনিকে ‘জাতীয় নিরাপত্তায় মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক একটি নিবন্ধন লিখেছেন। তার এই লেখার মাধ্যমে যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, তাদের কয়েকজন এই লেখাটির ওপর আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন! লেখাটি পড়ে আমার গবেষণার জন্য এক বড় খনি পেয়ে গেলাম!
ওই লেখক মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্যও ছিলেন! মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিকে কীভাবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একক কর্তৃত্ব থেকে নেভির এক কর্তৃত্বে নিয়ে গেলেন, তার এক সুখপাঠ্য(?) বর্ণনা দিয়েছেন!
প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক অফিসাররা অবসর নেওয়ার পর লেখক হলে যা হয়, তার লেখাটিও সেই দুর্বলতায় ভরপুর! তখনকার নেভাল চিফকে কনভিন্স করে মাফিয়া রানিকে তার সেই টোপ কীভাবে গিলিয়েছিলেনÑসেই কৃতিত্ব গাঁথাও বিধৃত করে গেছেন! এগুলো নিয়ে অস্বস্তি অনুভব করলেও কেউ কোনো আপত্তি তুলবে না!
ঘোরতর আপত্তি উঠেছে যখন তিনি লিখলেন, ‘প্রস্তাবিত খসড়ায় ভিসি ও প্রো-ভিসি পদ শুধু সমুদ্রগামী জাহাজে ক্যাপ্টেন বা চিফ মাস্টার মেরিনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। বুয়েটসহ অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে আমি যুক্তি তুলি যে, বিশ্বজুড়ে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদ খাঁটি শিক্ষাবিদদের (Academicians) জন্য সংরক্ষিত থাকে। উচ্চতর একাডেমিক ডিগ্রি ছাড়া শুধু পেশাগত ট্রেনিং দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চালালে সাধারণ মানুষ ভাববে ‘নৌকার মাঝিরা বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছে’! এই তর্কে সভার সবাই একযোগে সমর্থন দেয়।’
মার্চেন্ট মেরিনের যে কমান্ডেটের ব্যাপারে তিনি উল্লেখ করেছেন তার কঠিন সমালোচনা আমিও করেছি! একই মেরিন একাডেমির সিনিয়র ভাই হলেও খুব বেশি খাতির করিনি! কারণ উনি ভিসি পদটিকে শুধু একজন ব্যক্তিকে (তার নিজেকে) টার্গেট করেই সাজিয়েছিলেন। প্রথম চয়েজের সেই জায়গায় নেভির কয়েকটি র্যাংক বসিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে হয়ে গেছে। নতুনদের বেশি খাটাখাটি করা লাগেনি!
কিন্তু এটি সত্যিকারের একটি মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি হয়ে উঠুক, সেটা আমরা চেয়েছিলাম। আমরা নৌকার মানুষ, বাণিজ্যের মানুষ, টার্গেটও ছিল ছোটখাটো! আপনার বর্ণিত এই নৌকার মাঝিগুলো দেশের জন্য সর্বোচ্চ ইমেজ এবং একেকজন দশ-পনেরো-বিশ হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়ে আসছে। আমরা চেয়েছিলাম এর মাধ্যমে এদের কোয়ালিটি এবং কোয়ান্টিটি দুটোই বাড়াতে! দেশের নিরাপত্তা ভাবনা শুধু মিলিটারি মগজ থেকেই আসে না, বাইরে থেকেও আসতে পারে। লেখার শেষদিকে একটি নমুনা দেখাব। এখানে প্রশ্ন, বাদবাকি পাবলিক ইউনিভার্সিটির সবগুলো কি জাতীয় নিরাপত্তার ভাবনা থেকে তৈরি করা হয়েছে? তবে মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিকে তার মূল টার্গেট থেকে বিচ্যুত করে এই দায়টি চাপানো হলো কেন?
আপনারা যদি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে একটি নেভাল ইউনিভার্সিটির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেনÑতা করতে পারতেন। এখন তো প্রতি রাস্তায় রাস্তায় ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও শতকের ঘর স্পর্শ করছে। মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আরেকটি নেভাল ইউনিভার্সিটি বেশি হলে কী আর এমন ক্ষতি হয়ে যেত?
একটা সম্মানজনক এবং হাইলি রেসপেক্টেড পেশার প্রতি চরম বিদ্বেষ দেখিয়ে অমার্জনীয় অপরাধ করেছেন! যাদের বিরাট অংশ কোনো দিন এসব পদ-পদবির জন্য নোংরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি। এরা নীরবে প্রতি মাসে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করেছে!
একটি মডার্ন জাহাজ কয়েক লাখ টনের ওপরে কার্গো বহন করে এবং দৈর্ঘ্যে কয়েকশ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। আধুনিক নেভিগেশন এবং শত শত অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে ভরপুর একটি জাহাজ যেকোনো ইন্ডাস্ট্রির চেয়েও বড় এবং আয়তনে বিশাল! এমন একটি অত্যাধুনিক স্থাপনার ক্যাপ্টেন বা প্রধান প্রকৌশলীকে এভাবে খাটো করা একজন সুস্থ মানুষ কখনোই করতে পারে না।
একটা আধুনিক জাহাজ চালাতে যতটুকু প্রকৌশল কিংবা নেভিগেশনাল নলেজ প্রয়োজন, একজন ক্যাপ্টেন এবং প্রধান প্রকৌশলীকে সেই জ্ঞানটুকু দেওয়া হয়। একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে (আট থেকে দশ বছর) প্র্যাকটিক্যাল ও থিওরিটিক্যাল জ্ঞান দিয়ে তাদের সমৃদ্ধ করা হয়। তাদের এই নলেজের ওপর কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের জাহাজ এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের কার্গোর জিম্মাদারি অর্পিত হয়। আর আপনি এমন কুতুব সেজে গেছেন, তাদের নৌকার মাঝির সঙ্গে তুলনা করেন!
এখান থেকে যখন এডুকেশন বা অন্য ফিল্ডে কেউ যেতে চান, তবে তাকে প্রয়োজনীয় উচ্চশিক্ষা নিতে হবে। আমাদের মাস্টার মেরিনার এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকেই পিএইচডি করেছেন! ওই লেখক যাকে প্রতিপক্ষ গণ্য করে ওনার জিহাদ করেছেন, তিনি নিজেও চিফ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির সঙ্গে মালমো মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স এবং পরে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। একটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হলে কী ধরনের একাডেমিক সনদ নিতে হবে, এ বিষয়ে সবাই ওয়াকিবহাল। তারপরও এই বালখিল্যতা ও স্পর্ধা কেন দেখালেনÑতা বোধগম্য হচ্ছে না!
সমস্যা হয়েছেÑতিনি নেভাল এবং মেরিটাইম শব্দ দুটি গুলিয়ে ফেলেছেন! প্রতিষ্ঠানটিকে নেভির নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বুয়েটসহ বিভিন্ন একাডেমিশিয়ানের দোহাই দেওয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। মেরিটাইম নামের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত নৌবাহিনীর বাইরে থেকে কোনো ভাইস চ্যান্সেলর বা প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের নজির নেই। ফলে নাম ‘মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি’ হলেও এর পরিচালনা ও নেতৃত্ব কাঠামো কার্যত এটিকে একটি ‘নেভাল ইউনিভার্সিটি’তে পরিণত করেছে।
লেখাটি পড়ে এখন মালুম করতে পারলাম যে কী যুক্তি দেখিয়ে সব মেরিটাইম পোস্ট নেভি চিরস্থায়ীভাবে দখল করেছে। সবগুলো সমুদ্রবন্দর, ডিজি অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ মেরিটাইম প্রতিষ্ঠান থেকে ‘নৌকার মাঝিদের’ তাড়িয়ে ইউনিফর্মড অফিসাররা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। আর এসব অফিসার নিজেরা ও পরবর্তী বংশধরদের থাকার জন্য যেসব পশ্চিমা দেশ বেছে নেন, সেসব দেশের বোকা নেতারা কিন্তু তাদের ‘নৌকার মাঝিদের’ দিয়েই এসব অফিস পরিচালনা করেন!
সাপোর্টিং ডকুমেন্টস কিংবা দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকলেও তিনি দাবি করেছেন, ‘আজকের মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি সুনীল অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে বিকাশ লাভ করছে।’
এর পরের দাবিটি আরো উদ্ভট এবং হৃদয় বিদারক ঠেকেছে। অত্যন্ত সন্তুষ্টি নিয়ে তিনি লিখেছেন, “এই খাতে সামরিক নেতৃত্বের যোগ্যতার বড় দৃষ্টান্ত মেরিটাইম জগতের ‘কিংবদন্তি’ রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। ...যদিও রাজনীতিবিদরা এই সমুদ্রজয়ের কৃতিত্ব দাবি করেন, কিন্তু তার প্রজ্ঞা ও কার্যকর পেশাদার জ্ঞান ছাড়া প্রতিবেশী দুই শক্তিশালী দেশের কবল থেকে এই সমুদ্রসীমা উদ্ধার করা সম্ভব হতো না...! ”
সমুদ্রবিজয় নিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকার যে নর্তন-কুর্দন করেছে, তা ছিল পুরো একটা ভাঁওতাবাজি। এসব নিয়ে অতীতে বেশ কয়েকটি কলাম লিখেছি। ‘টেম্পোর দামে বিমান কেনার স্বপ্নে বিভোর’ শিরোনামে গত বছর একটি কলাম লিখেছিলাম। আমার দেশ মাল্টি মিডিয়া থেকে প্রকাশিত সেই উপসম্পাদকীয়টি ভাইরাল হয়েছিল! যারা পড়েননি তারা আর্কাইভ থেকে পড়ে নিতে পারেন।
কথিত এই ‘কিংবদন্তি রিয়ার অ্যাডমিরাল’, হাসিনার লেসপেন্সার হিসেবে কাজ করেছেন। আমাদের দক্ষিণ তালপট্টিসহ বিশাল এলাকা ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিয়ে সেটি নিয়ে আবার সাফাই গেয়েছিলেন! সমুদ্র জয় করে(?) এসে জানালেন, দক্ষিণ তালপট্টি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, এখন সেই তালপট্টি দ্বীপে বিশাল গ্যাসের মজুত পাওয়া গেছে! শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং রিয়াল অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানরা মিলে যে দক্ষিণ তালপট্টি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন, সেই মহামূল্যবান দ্বীপটি ইন্ডিয়াকে দিয়ে এলেন তথাকথিত এই রিয়ার অ্যাডমিরাল! আবার এটারই নাম দিয়েছে সমুদ্রবিজয়! আর সেই সমুদ্রবিজয় নিয়ে এখনো জাবর কাটছেন আমাদের সেনাবাহিনীর এক গর্বিত সদস্য, যিনি জাতীয় নিরাপত্তা ছাড়া কোনো শব্দই উচ্চারণ করেননি! জানি না এটি লজ্জার কথা কি নাÑরিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান (প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুর) এই নৌকার মাঝিদের পড়ানোর জন্য মেরিন একাডেমির প্রথম দিককার বাংলাদেশি কমান্ডেন্টদের একজন ছিলেন।
দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে তাদের এই কথার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তদানীন্তন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবং প্রয়াত বিএনপি নেতা হান্নান শাহ। ২০১৪ সালের ১১ জুলাই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একটি অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগীর বলেছিলেন, ‘সমুদ্রের জলসীমা নিয়ে তারা নাটক শুরু করেছে! ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। দক্ষিণ তালপট্টি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে! তারপরও তারা বলছেন, এটি নাকি বিরাট জয়। জয় তখনই হয়, যখন আপনি বাড়তি কিছু নিয়ে আসতে পারেন! আমাদের যে দাবি ছিল, সেই দাবি থেকেই তো ৬ হাজার বর্গমাইল চলে গেছে! তাহলে সেটি সমুদ্রবিজয় হলো কেমনে?’ একই অনুষ্ঠানে হান্নান শাহ বলেন, ভারতকে খুশি করতে সরকার দক্ষিণ তালপট্টির অস্তিত্বই বিলীন করে দিয়েছে!
আর হাসিনার সেই লেসপেন্সারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণায় জীবন অতিবাহিত করা এক গবেষক! সেটিও করছেন হাসিনা পালানোর পর!
সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তিকে অনেকেই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরলেও বিষয়টি ছিল মূলত Arbitration বা সালিশি প্রক্রিয়া, যেখানে উভয় পক্ষই কিছু পেয়েছে এবং কিছু ছেড়েছে।
আমরা নিজেদের মূর্খতা বা চরম আবালপনার পরিচয় দিয়েছি! ইন্ডিয়া এবং মিয়ানমার উভয়ের সঙ্গেই আমাদের দাবি ছিল ন্যায্যতার (Equitable) ভিত্তিতে বণ্টন । আমাদের প্রতিপক্ষের দাবি ছিল সমদূরত্বের বণ্টন (Equidistantly delimitation)। দেখা গেছে, আমাদের চেয়ে প্রতিপক্ষের দাবিই (Equidistantly delimitation) বেশি প্রাধান্য পেয়েছে! এখানে আমাদের টেকনিক্যাল ক্যাপাবিলিটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেÑযেটার দায় এই তথাকথিত কিংবদন্তি রিয়ার অ্যাডমিরালের ওপরে বর্তায়।
চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে—মিয়ানমার ও ভারত আমাদের চেয়ে কৌশলগতভাবে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে । সবচেয়ে বড় জটিলতা বাংলাদেশের ২০০ নটিকেল মাইলের ইইজেড (ইইজেড) এবং দূরবর্তী কন্টিনেন্টাল শেলফ (Extended Continental Shelf) নিয়ে। এমন কিছু অমীমাংসিত এলাকা (Grey Area) তৈরি হয়েছে, যেখানে সমুদ্রতল বা তলদেশের অধিকার বাংলাদেশের হলেও তার উপরের জলভাগ প্রতিবেশী দেশগুলোর ইইজেডের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সহজ ভাষায়—তলদেশের মালিক আমরা, কিন্তু তার উপরের পানির অধিকার অন্যের!
আজ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হয়তো বড় কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যখন সত্যিকার অর্থে Blue Water Navy গড়ে তুলতে চাইবে অথবা দূরবর্তী কন্টিনেন্টাল শেলফে তেল, গ্যাস কিংবা অন্য কোনো মহামূল্যবান সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে, তখন এই বাস্তবতা আমাদের বিরুদ্ধে জিও-পলিটিক্যাল অস্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়তে পারে! কারণ আমাদের ইইজেড থেকে কন্টিনেন্টাল শেলফের দিকে যাওয়ার মুখেই পশ্চিমে ভারত ও আগে মিয়ানমারের ইইজেড-সংক্রান্ত Grey Area রয়েছে।
তাই এই নিষ্পত্তিকে শুধু আবেগ দিয়ে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে দেখলেই চলবে না; এর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব নিয়েও নির্মোহ আলোচনা প্রয়োজন। জাতির শত বছরের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক স্বার্থ কোনো ব্যক্তি বা ‘কিংবদন্তি’ তকমার চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, তাদের এখনো বন্দনা করা হচ্ছে—আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রশ্নটি প্রায় অনালোচিতই থেকে যাচ্ছে।
এই কাজটি করছেন আবার প্রায় এক যুগ আগে মেরিটাইম সিকিউরিটি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটির গবেষকরা, যারা মনে করেন জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা শুধু সামরিক মগজ থেকেই বের হতে পারে ! এটাই বোধহয় তার নমুনা।
লেখক: কলামিস্ট