হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

একটি আইফোন ও আমাদের সামাজিক পচন!

আমার দেশ অনলাইন

এক প্লেট ভাতের দাম আর কত? ১০, ২০ কিংবা বড়জোর ৫০ টাকা। কিন্তু এক প্লেট ভাতের জন্য জীবন দিতে হলো এক তরুণকে। বলছিলাম খুলনায় খুন হওয়া আজমলের কথা। মেসের নিয়ম ছিল, খাবার খেতে হলে আগে থেকে জানাতে হবে। কিন্তু আজমল সে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্যের জন্য রেখে দেওয়া খাবার খেয়ে ফেলে। আর তাতেই জীবন দিতে হলো তাকে।

এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের তেরো বছরের সন্তান অপ্রতিমকে জীবন দিতে হলো একটি আইফোনের জন্য। পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন নামের ১৯ বছরের এক বালক অপ্রতিমকে হত্যা করেছে এবং আইফোনটি তুহিনের বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, এভাবে আট মাসে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৬ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে।

তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে দেশজুড়ে হত্যা ও খুন বেড়ে চলছে। নরকের রাজ্যে পরিণত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। প্রশ্ন হলো, কিশোর সমাজ কেন এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে? কেনইবা মানুষের সহনশীলতা দিন দিন কমে যাচ্ছে? এ পরিস্থিতি কি এক দিনে তৈরি হয়েছে?

মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই চরম অবক্ষয়ের পেছনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। যেমন : ড. আলবার্ট বান্দুরা তার সোশ্যাল লার্নিং থিওরিতে লিখেছেন, কিশোররা তাদের চারপাশের সহিংস আচরণ কিংবা পরিবেশ দেখে শেখে। এছাড়া রবার্ট কে মার্টন তার স্ট্রেইন থিওরিতে দেখিয়েছেন, তরুণ সমাজের সামনে যখন বস্তুগত সাফল্যকে (যেমন : দামি ফোন, বাইক, গাড়ি) মূল লক্ষ্য হিসেবে দাঁড় করানো হয়, কিন্তু তা অর্জনের বৈধ পন্থা বা উপায় থাকে না, তখন তারা অপরাধের পথ বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, একজন মানুষের ‘যা পাওয়া উচিত’ আর ‘যা সে পাচ্ছে’—এ দুটোর মধ্যে যখন পার্থক্য সৃষ্টি হয়, তখনই সহিংসতার জন্ম নেয় বলে দাবি করেছেন আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গার।

আমরা আমাদের কিশোরদের শিক্ষামুখী করে তুলতে পারিনি। শিক্ষিত সমাজ যখন দিনকে দিন অবহেলিত, তখন সে সমাজে মাস্তানি করে বেড়ানো কিশোর গ্যাংদের জন্ম নেওয়াই তো স্বাভাবিক। যে সমাজে গালি দিয়ে কনটেন্ট বানালে রাতারাতি ভাইরাল হওয়া যায়, সেখানে ভদ্রতার আভিজাত্য কীভাবে প্রত্যাশা করবেন? শিক্ষিত যুবক যখন বেকারত্বের খাতায় নাম লেখিয়ে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন তুচ্ছ বিষয়ের জন্য খুন হওয়া অস্বাভাবিক ভাবা যায় না। একটি রাষ্ট্র যখন তরুণদের সুস্থ ভবিষ্যৎ, মানসম্মত কর্মসংস্থান ও নৈতিক মূল্যবোধের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নীতিকথা দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব হয় না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যখন অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, খুন করার পরও আসামি নিশ্চিত থাকে তার ফাঁসি হওয়া অতটা সহজ ব্যাপার নয়—তখন আরো দশজন অপরাধে জড়ানোর উৎসাহ পায়।

শুধু কাঠামোগত উন্নয়ন কখনো উন্নত ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পারে না। বরং শিক্ষার ইতিবাচক সংস্কার, তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও কর্মসংস্থানমুখী করে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ। এছাড়া কিশোর গ্যাং ও অপরাধীদের রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রেহাই দেওয়ার পথ রুদ্ধ করতে হবে। কারণ নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ বলেছিলেন, যে রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা থাকে না, সেখানে সামাজিক শৃঙ্খলা ধরে রাখা অসম্ভব।

অতএব, সমাজবিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা ও প্রতিদিনের রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা আমাদের লাল সংকেত দেখাচ্ছে। আমরা কি আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ একটি সমাজ উপহার দিতে পারব? নাকি একের পর এক তাজা প্রাণের বিনিময়ে শোকস্তব্ধ হয়ে থাকব? এই সমাজের পচন এখনই রোধ করতে না পারলে আগামীর প্রজন্ম তলিয়ে যাবে এক অন্ধকার অতল গহ্বরে।

লেখক: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ের সামগ্রিক পাঠ ও মূল্যায়ন

ভারতপ্রেমীদের গুপ্ত আশঙ্কা

আর কোনো দফা নয় এবার একটা রফা করুন

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঘোষিত ইশতেহার

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয় স্বার্থ

বাংলাদেশে জিন্নাহবিদ্বেষের পূর্বাপর

অর্থবছর বদলালেই কি সমস্যার সমাধান

বাঙালির অবিস্মরণীয় গৌরবময় অধ্যায়

এসআরবি কি বিলুপ্ত র‍্যাবের মতোই হবে

মুছে ফেলা হচ্ছে মুসলিম ভারতের সব চিহ্ন