বিশ্ব রাজনীতিতে সময় ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন একটি কৌশলগত বিষয়। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিই বলে দেয়, সে সময়ের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রটির লক্ষ্য কী।
প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের সময়েই পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ধারণা ছিল। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর যাত্রা শুরু ১৬৪৮ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি আরো বাস্তবমুখী ও স্বার্থকেন্দ্রিক বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়। তখন উপনিবেশবাদের পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের কৌশলের মাধ্যমেই নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিকাশ ঘটে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীতি প্রণয়নকারী রাষ্ট্রের আগ্রহ, অনাগ্রহ ও স্বার্থের অগ্রাধিকার। পৃথিবীর সব পররাষ্ট্রনীতিই একটি রাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতি মূলত এ লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়ে আসছে। নিজ ভূখণ্ডের বাইরে একটি রাষ্ট্রের স্বার্থান্বেষণ থেকেই এর সূচনা।
পররাষ্ট্রনীতি ব্যবস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন-কৌশল কিছু দেশকে সুবিধা দেয়, বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি যখন পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকে। ভারসাম্যপূর্ণ নীতির একটি বিশেষত্ব হলো—এটি একটি রাষ্ট্রকে শক্তিধর দেশগুলোর রোষানল থেকে রক্ষা করতে সহায়ক। তবে এ নীতির ক্ষেত্রেও একটি দেশ তার স্বার্থকেই সামনে রাখে।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হলো—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ ভেবে দেখার বিষয় হলো, এ নীতি আমাদের জাতীয় স্বার্থকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে কি না। যেখানে এর ব্যত্যয় ঘটে, এ নীতির প্রয়োগের আর সুযোগ থাকে না। তবে দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে এ নীতিতে সংশোধন এনে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। বর্তমান সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতি সেরকমই একটি সংশোধিত প্রয়াস। স্বাভাবিকভাবেই পররাষ্ট্রনীতি একটি রাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে বলে সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রই তার পররাষ্ট্রনীতিতে স্থির থাকেনি। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তারা তাদের নীতি সংশোধন করেছে অথবা নতুন কোনো নীতিকে ধারণ করেছে। যেসব দেশ তা করেছে, তাদের অস্তিত্ব পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর হুমকিতে বিলীন হয়ে যায়নি। বরং তারা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতায় নজর দিতে পেরেছে। অন্যদিকে, যারা স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে এগিয়ে থাকতে পারেনি, তারা পরাশক্তিদের দ্বারা শোষিত হয়েছে।
স্বার্থভিত্তিক নীতি-প্রণয়ন কৌশল একটি দেশকে তার রাজনীতি, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা এনে দেয়। একটি দেশ যখন তার প্রতিবেশী শক্তিধর রাষ্ট্রের সন্তুষ্টি লাভে স্বীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করে, তখন তা তার স্বাধীনতার শক্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। ফলে তার অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়নেও ওই রাষ্ট্রের সন্তুষ্টি লাভই মুখ্য হয়ে ওঠে। এভাবে শক্তিধর রাষ্ট্রটির প্রভাব তার রাজনীতি, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। বিষয়টি বোঝার জন্য ভিয়েতনামের সঙ্গে আমাদের দেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পার্থক্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ১৯৭৫ সালে দুই ভিয়েতনাম এক হওয়ার পর দেশটি পররাষ্ট্রনীতিকে ঢেলে সাজায়। দেশটি তার অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নীতিতে পশ্চিমা নীতি-মডেল অনুসরণ না করে নিজেদের চিন্তাপ্রসূত নীতি-কৌশলকেই অগ্রাধিকার দেয়। ফলে যা ঘটেছে, সেটিও আমাদের জানা—অনেক দিক দিয়ে ভিয়েতনাম আজ আমাদের থেকে এগিয়ে।
সুশাসন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পভিত্তিক উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগসহ উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে তাদের অগ্রগতি একটি স্বাধীন ও কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা প্রদর্শন করে, যা উন্নয়নের প্রচলিত পশ্চিমা মডেলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। পক্ষান্তরে, আমরা এখন উন্নয়নের ভিয়েতনাম মডেল নিয়ে গবেষণা করার আগ্রহ দেখাচ্ছি।
কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে আমাদের দুর্বলতা অত্যন্ত প্রকট। বাইরের শক্তিগুলোর চাপের মধ্যেও কীভাবে নিজের স্বার্থকে অটুট রাখা যায়, এ বিষয়ে আমাদের অতিমাত্রায় অনাগ্রহ রয়েছে। বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের আশঙ্কায় তাদের আমদানি-রপ্তানির দরকষাকষি ও আন্তঃসীমান্ত বিতর্কে ছাড় দেওয়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতিফলন করছে না। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে উৎপাদন, বাণিজ্য ও আন্তঃসীমান্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কই হতে পারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রকৃত প্রতিফলন, যার বিপরীত চিত্রই এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তিস্তা নদীর পানির হিস্যার সংকট কয়েক দশকের। এখন এটি বলাই যুক্তিসংগত যে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিগত দুর্বলতাই এ ন্যায্য অধিকার অর্জনকে বিলম্বিত করেছে। বিপরীতে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ও প্রতিযোগিতামূলক পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পারলে তিস্তার ন্যায্য হিস্যা লাভের পাশাপাশি আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভারতের সঙ্গে আমাদের সমমর্যাদার অবস্থান তৈরি হতো।
অতি বৃষ্টিতে তিস্তার পানি বৃদ্ধি ও ভারত কর্তৃক পূর্ব অবহিতকরণ ছাড়াই পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে আমাদের দেশে বন্যা হয় প্রতি বছরই। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এ বছর বন্যার সময় ঘনিয়ে এলেও সরকার এখনো ভারতের সঙ্গে বিষয়টি সমাধানে কার্যকর আলোচনা শুরু করেনি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়