ফারসি ভাষায় বলা হয় মাহ-ই-আসাল, যার অর্থ ‘মধুর মাস’ বা ‘মধুর চাঁদ’। আর আধুনিক ফরাসি ভাষায় ‘লুন দে মিয়েল’। যদিও ইংরেজি ভাষাটাই বেশি প্রচলিত—‘হানিমুন’; বাংলায় ‘মধুচন্দ্রিমা’। উনিশ শতকের এক তাত্ত্বিক দাবি করেন, প্রতিটি বিয়ের পর ৩০ দিন ধরে মিড অথবা মেথেগ্লিন মধু দিয়ে তৈরি পানীয় পান করার টিউটোনদের উচ্চতর শ্রেণির রীতি থেকে ‘হানিমুন’-এর উৎপত্তি।
রিচার্ড হুলোয়েট ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর একজন ইংরেজ অভিধানকার। তার মতে, ‘হানিমুন’ একটি প্রবাদবাক্য, যা এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা নতুন বিবাহিত, যারা প্রথমেই বিচ্ছেদ ঘটাবে না, কিন্তু শুরুতেই একজন অন্যজনকে অত্যন্ত ভালোবাসে, তাদের অত্যধিক ভালোবাসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যে সময়টিকে অশ্লীল লোকেরা ‘হানিমুন’ বলে। এখন অবশ্য ‘হানিমুন’কে তেমন একটা অশ্লীল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয় না। নবদম্পতি মধুচন্দ্রিমা কাল নির্বিঘ্নে কাটাবে—এমনটাই আধুনিক সমাজে মেনে নেওয়া হয়েছে। বিয়েকে উদ্যাপন করাই এর উদ্দেশ্য। মধুচন্দ্রিমা প্রায় সময় হয় প্রেমময় ও উত্তেজনাপূর্ণ।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সদ্যবিবাহিত দম্পতিদের ছুটি কাটাতে বেড়াতে যাওয়ার ঐতিহ্যের সূচনা হয়েছিল ১৯ শতকে গ্রেট ব্রিটেনে। এই ধারণাটি এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশের অভিজাতদের কাছ থেকে। সমাজের উঁচু পদের বা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিকরা যেসব আত্মীয় বিয়েতে উপস্থিত হতে পারেননি, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বিয়ের পরে একটি ভ্রমণে বের হতেন। কিছু ক্ষেত্রে তা হতো বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে।
ইউরোপে নবদম্পতিদের কাছে মধুচন্দ্রিমার গুরুত্ব অনেক বেশি এবং মার্কিনিদের তুলনায় তাদের মধুচন্দ্রিমা উদ্যাপনে ভ্রমণের হারও বেশি। হানিমুন ভ্রমণের হার সবচেয়ে বেশি জার্মানিতে। সেখানে প্রায় ৯১ শতাংশ নবদম্পতি বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমা উদ্যাপন উপলক্ষে বেড়াতে যান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধুচন্দ্রিমা বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্য। একটি দম্পতি তাদের মধুচন্দ্রিমার জন্য গড়ে ৪ হাজার ৫০০ ডলার ব্যয় করেন। গত শতকের আশির দশকে নায়াগ্রা জলপ্রপাত আমেরিকানদের কাছে একটি জনপ্রিয় মধুচন্দ্রিমা গন্তব্য ছিল, কিন্তু ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে এটি পরবর্তীকালে কম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নবদম্পতি ছাড়াও সম্পর্কের একটি মধুর সময়কে উপলক্ষ করেও মধুচন্দ্রিমা উদ্যাপন করা হয় পশ্চিমা বিশ্বে।
নবদম্পতির মধুর সময় কাটানোর মধুচন্দ্রিমা কালের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক তেমন একটা না থাকলেও যেকোনো নবযাত্রার সূচনাকালকে মূল্যায়ন করতে ‘মধুচন্দ্রিমা কাল’ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সময় পেরিয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার যাত্রা শুরু করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখে শপথ নিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক যাত্রা করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এ সরকারের এক মাস পূর্ণ হতে আর দুদিন বাকি। মধুচন্দ্রিমার ক্ষেত্রে মূলত এক মাসের সময়কালের কোনো উল্লেখ নেই, কিন্তু নববিবাহিত ব্যক্তিদের পারস্পরিক স্নেহকে পরিবর্তিত চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যা পূর্ণিমার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় পেতে শুরু করে। সরকারের ‘মধুচন্দ্রিমা কাল’ও ঠিক কত দিনে সীমিত হবে, সে ব্যাপারে বিতর্ক হতে পারে। তবে যেহেতু চাঁদের সঙ্গে তুলনীয়, সে হিসেবে ধরা যায় এক মাস হতে পারে মধুচন্দ্রিমা কাল বা হানিমুন পিরিয়ড।
সরকারের যে হানিমুন পিরিয়ড চলছে, তা স্বীকার করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ইফতার-পরবর্তী সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডায় তিনি বলেছেন, ‘আমরা হানিমুন পিরিয়ডে আছি বলে সংবাদমাধ্যম যে আমাদের ছাড় দিচ্ছে, তা বুঝতে পারি। হানিমুন কাল শেষ হলে সরকারের দোষত্রুটি যে আপনারা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরবেন, তাও অনুধাবন করি।’ তথ্যমন্ত্রীর এই বুঝতে পারাটা ইতিবাচক।
সরকার প্রথম মাসটিতে সংবাদমাধ্যমের অকুণ্ঠ সমর্থনই শুধু পায়নি, বলা যায় পেশাদারত্বের বাইরে গিয়েও অনেক সংবাদমাধ্যম প্রশংসা ও স্তুতিতে ভাসিয়েছে। মধুচন্দ্রিমা কাল হিসেবে এটাকে পাঠক-দর্শকরাও সম্ভবত খারাপভাবে নেয়নি। তাছাড়া আলোচ্য সময়কালে সরকার অনেকগুলো ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগী হয়েছে। জনসাধারণের জীবনঘনিষ্ঠ বেশ কিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতার মতো ইতিবাচক উদ্যোগগুলো পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে হলেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সদিচ্ছা জানান দিয়েছে।
১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম ১৬ টাকা কমানো, ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় সম্ভাব্য সংকটের মধ্যেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ, খাল কাটার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কমিটি গঠন, শিক্ষার্থীসহ তিন ধরনের যাত্রীর জন্য মেট্রো ও রেলের ভাড়া ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং নারীদের জন্য বিশেষ বাস চালুর উদ্যোগ মধুচন্দ্রিমা কালে সরকারের প্রশংসা করার মতো পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ৬৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবদম্পতিদের ‘ব্যয়বহুল মধুচন্দ্রিমা’র মতোই।
আবার হানিমুন পিরিয়ডে কিছু নেতিবাচক কাণ্ড-কীর্তি জনমনে বিরূপ প্রভাবও ফেলেছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নানা ধরনের অপকর্ম ও আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত-হানাহানি, নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি, হাসপাতালের সেবা বন্ধ রেখে সরকারদলীয় এমপিদের সভা, পরিবহনে চাঁদাকে ‘সমঝোতা’র মোড়কে হালাল করার চেষ্টা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পরিবর্তে দলীয় প্রশাসক বসানো, প্রশাসনে রদবদলে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করে অন্ধ আনুগত্যের প্রাধান্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে পরিবর্তনে ভুল বার্তা, সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদে পছন্দের ক্ষেত্রে সুবিবেচনার অভাব, ১০টি সচিব পদ ও পাঁচ জেলায় ডিসি পদ সিদ্ধান্তহীনতায় শূন্য থাকার ঘটনাগুলো সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে না।
প্রেমময় ও উত্তেজনাপূর্ণ মধুচন্দ্রিমা কালেই কিছু ইস্যুতে অনভিপ্রেত সমালোচনা ও ভার্চুয়াল তুলোধুনোর মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। কিন্তু যথাসময়ে তা মোকাবিলা করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। গত সপ্তাহে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থায় একটি বিতর্কিত ও নেতিবাচক পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়। পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা শিথিল বা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার বিষয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর চাউর হয়। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফেসবুকে সরকার ও বিএনপিকে ধোলাই চলতে থাকে। অনেকে বলতে থাকেন, ‘বিএনপিতে শিক্ষিত লোকের অভাব আছে বলেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।’ সপ্তাহজুড়ে তীব্র সমালোচনা হজম করে শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানালেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
শুক্রবার চাঁদপুরের কচুয়ায় এক বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার কোনো প্রশ্নই আসে না; বরং শিক্ষাগত যোগ্যতা ধাপে ধাপে ঠিক আছে কি না, এটা চেক করার জন্য প্রথম যাচাই-বাছাই করবেন ইউএনও, তারপর করবেন ডিসি অথবা ডিভিশনাল কমিশনার। এরপর নিজ নিজ বোর্ড যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত লোক এই কমিটিতে যাচ্ছে কি না, সেটা দেখবে। কেউ যদি কমিটিতে আসতে চান, তাহলে তাকে তিনটি লেয়ার (ধাপ) পার করে আসতে হবে। তবে সমাজে যাদের অবদান রয়েছে, তাদের বিষয়ে আমরা আলোচনা করছি।’
শিক্ষামন্ত্রী বা সরকারের মুখপাত্রের মাধ্যমে এই বক্তব্যটি আরো আগে এলে গণমাধ্যমে সংবাদ ও ভার্চুয়াল সমালোচনার তীর সরকারকে এতটা বিদ্ধ করত না। আবার হতে পারে, সমালোচনার মুখে সরকার অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। তাতেও ধন্যবাদ পেতে পারে। মনে রাখা দরকার, অশিক্ষিতদের হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রধান চেয়ার তুলে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির আলোচনা যারা তুলেছেন, তাদের উদ্দেশ্য অসৎ। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অশুভ রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির সুযোগ বাড়বে।
একসময় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল না। সেই বাস্তবতায় বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাই এসব পদে বসতেন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ২০২৪ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়। তখন সভাপতির জন্য কমপক্ষে এইচএসসি বা সমমানের ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে সেই মানদণ্ড আরো উন্নীত করা হয়; কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির জন্য স্নাতকোত্তর বা চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি এবং মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জন্য স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়।
বাংলাদেশে মাধ্যমিক, কলেজ ও সমপর্যায়ের প্রায় ৩৫ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানের বাজেট অনুমোদন, তহবিল সংগ্রহ, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বও এই কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকে; অর্থাৎ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে হয়। সেই কমিটির শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা তাই নিছক আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী বিএনপির ২০০১-২০০৬ শাসনকালে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। নকল প্রতিরোধসহ শিক্ষা খাতে অনেক সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসিত ও নন্দিত হয়েছেন। পরিচালনা কমিটি-সংক্রান্ত এবারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোচনায় একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পরিচালনা কমিটির সভাপতি নিয়োগে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা না রেখে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনজনের তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে একজনকে নির্বাচনের প্রস্তাব এসেছে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করে আজকের নিবন্ধের ইতি টানতে চাই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেকগুলো সংসদীয় আসনে ভোটের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তিনি হাইকোর্টে নির্বাচনি আবেদন করতে পারেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৬ জন প্রার্থীর পৃথক ৩৬টি নির্বাচনি আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ৯ জন প্রার্থীর করা পৃথক নির্বাচনি আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে হাইকোর্ট। এই প্রার্থীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও রয়েছেন। ৯টি আবেদনেরই শুনানি হবে বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের একক হাইকোর্ট বেঞ্চে। নির্বাচনসংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ ও শুনানির জন্য গত ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে একক বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন প্রধান বিচারপতি।
নির্বাচনি ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের রিট আবেদনের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সংখ্যাটি কোথায় গিয়ে ঠেকবে বলা মুশকিল। দুপক্ষ পাল্লা দিয়ে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করছে। চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে সিদ্ধান্ত কী আসবে, জানি না। তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে বিএনপি ও জামায়াত দুটি দলই একে অপরের বিজয়কে যে ম্লান করছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ২০০১ সালের পর দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি—কোনোটি ছিল বোঝাপড়ার পাতানো নির্বাচন, কোনোটি ভোটারবিহীন অধিকাংশ দলের বর্জিত নির্বাচন, কোনো নির্বাচনে ‘রাতের ভোটে’র অভিযোগ উঠেছে, আর দ্বাদশ নির্বাচনটি ছিল আমি-ডামির নির্বাচন। পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন।
বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেকোনো বিচারে ইতিহাসসেরা। কোনো সহিংসতা, প্রাণহানি, ব্যালটে সিল মারা এবং বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ছাড়া একটি জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশে হতে পারে, তা ১২ ফেব্রুয়ারির আগে ভাবাই যায়নি। গণনা ও ফলাফল ঘোষণা পর্যায়ে কিছু অভিযোগ এসেছে; তাও সীমাবদ্ধ ছিল পাঁচ-সাতটি আসনে। এখন যেভাবে পরাজিত প্রার্থীরা ভোট কিংবা ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছেন, তাতে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে চব্বিশের জুলাইয়ে পরাজিত শক্তি। শেখ হাসিনার কলঙ্কিত নির্বাচনগুলোকে প্রকারান্তরে হালাল করতে যাচ্ছেন যথেচ্ছ অভিযোগকারীরা। ১০ শতাংশ আসনের ফলাফল যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে কি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা গঠিত সংসদের ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি ক্ষুণ্ণ হয় না? সরকার ও বিরোধী দলের কি এটা বোঝার ক্ষমতা নেই? নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংসকারী শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লেসপেন্সাররা যদি এখন বলেন, আগের তিনটি সংসদ নির্বাচনের মতো ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনও বিতর্কিত, অতএব শেখ হাসিনার দোষ কী? ভোটের দিন সন্ধ্যায় কিংবা ফলাফল ঘোষণার শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের অভিযোগ ছিল না কোনো পক্ষ থেকেই। কিন্তু এখন যেভাবে ফলাফল বাতিলের দাবি বাড়ছে, তা সরকার ও সংসদ—সবার জন্য অস্বস্তির কারণ হওয়া উচিত। এখনই থামানো উচিত।
মধুচন্দ্রিমা কাল শেষে সরকারকে যে ক্রমাগতভাবে শক্ত জবাবদিহিতা ও দৈনন্দিন পদক্ষেপের জন্য কঠোর নজরদারিতে থাকতে হবে, তা বুঝতে অক্ষম হওয়া কাম্য নয়। জুলাই সনদসহ প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন, সুশাসন নিশ্চিতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন, ভিন্নমতকে ধারণ, সংসদকে কার্যকর করা এবং জনআকাঙ্ক্ষাগুলোকে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। পতিত আওয়ামী লীগকে আশকারা দেওয়া ও পুনর্বাসন করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। এসব ক্ষেত্রে বিচ্যুতি বিপদ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ