হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

৪৮ বছর শেষে বিএনপির বর্তমান রাজনীতি

এলাহী নেওয়াজ খান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮ বছর পার হয়ে গেল গত ১ সেপ্টেম্বর। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হলে হয়তো দুবছর পর ২০২৮ সালে দলটি সরকারে থেকেই সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। বিএনপি তার ৪৮ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবার নিয়ে পাঁচবার ক্ষমতাসীন হয়েছে। কিন্তু একবারই মাত্র-২০০১-এর ১০ অক্টোবর শপথ নিয়ে ২০০৬-এর ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে মেয়াদ পূর্ণ করেছিল। এছাড়া আর কোনো সময় তারা মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি।

এ রকম এক পটভূমিতে বিএনপি ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়ে গেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদলীয় শাসনের অবসান-উত্তর এক কঠিন সংকটকালে দলটির জন্ম হয়েছিল। আবার ২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর আরেক সংকটকালীন সময়ে দলটির ক্ষমতাসীন হওয়া ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা বেশ তাৎপর্য বহন করে।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সমমনা ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট একীভূত হয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব মেনে অভিজ্ঞ ও ঝানু রাজনৈতিক নেতাদের একত্র হওয়ার এ ঘটনা ইতিহাসে নজিরবিহীন একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার অনিবার্য পরিণতি ছিল একটি নতুন দলের অভ্যুদয়। এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিস্ময়কর দিক হচ্ছে, একদলীয় নিষ্ঠুর শাসনের অবসানের পর জনগণই একটি নতুন দল গঠনে জিয়াউর রহমানকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বলা যায়, বিএনপি নামক এই দলটি গঠনে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল খোদ জনগণ। সেটি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত গণভোটকালে। সেদিন ভোট দিতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিপুল উপস্থিতি বলে দিয়েছিল, নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন ইতিহাসেরই অমোঘ দাবি।

আমরা তখন গুলবাগ থাকতাম। আমাদের ভোটকেন্দ্রটি ছিল মৌচাক মার্কেটের উল্টোদিকে আবুজর গিফারী কলেজে। কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর নেতৃত্ব ছাড়া ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল দেখার মতো। এই ভোটকেন্দ্রের পেছনের গলিতেই তখন বাস করতেন ঢাকা মহানগরীর ত্রাস হিসেবে পরিচিত হিসাম উদ্দিন পাহাড়ি নামক এক আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি দলবল নিয়ে সাদা জিপে করে ঢাকা নগরী ঘুরে বেড়াতেন। আর সেটিকে তখন শ্বেত সন্ত্রাসের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তাই স্বাভাবিকভাবে ওই ভোটকেন্দ্র ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সবাইকে বিস্মিত করেছিল। মূলত আওয়ামী লীগের শ্বাসরোধকর শাসন অবসানের পর সাধারণ মানুষ তাদের মুক্তির স্বাদ ঢেলে দিয়েছিল গণভোটে।

সেই স্বতঃস্ফূর্ত জনগণ ছিল মূলত আওয়ামী লীগের সাড়ে ৩ বছরের নির্যাতন-নিপীড়নে নিষ্পেষিত মানুষ। আর রাজনৈতিকভাবে ছিল আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসনবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। সে কারণেই বিএনপির গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে জনগণ। সেই অর্থে বিএনপির মালিক সাধারণ মানুষ।

গণভোটের ১৫ মাস পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি নামক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠিত হয়। তারপর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ছয়টি দল নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ মে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। যে ছয়টি দল নিয়ে ফন্ট গঠিত হয়েছিল, সেই দলগুলোর নেতাকর্মীরা স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগ শাসন আমলে গুম, খুনসহ নানা রকম নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তাছাড়া এই দলগুলোর শ্রেণি-চরিত্র দেখলে বোঝা যায়, বিএনপি গঠিত হয়েছিল মূলত বাম, মধ্য ও ডানপন্থিদের সমন্বয়ে। আর সবকিছুর ওপরে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম । ভারতের সুস্পষ্ট প্রভাব ও নিপীড়নমূলক শাসনে জাতি যখন বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তখন এটি ছিল চমৎকার একটা সমন্বয়।

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত ছয়টি দলের প্রথমটির নাম হচ্ছে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলÑঅর্থাৎ জাগদল। নবগঠিত এই দলের আহ্বায়ক ছিলেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার।

দ্বিতীয় দলটির নাম হচ্ছে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। যদিও জোট গঠনের আগেই ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানী ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন মশিউর রহমান জাদু মিয়া। মূলত তার নেতৃত্বেই ন্যাপ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যুক্ত হয়। পরবর্তীকালে জাদু মিয়া সিনিয়র মন্ত্রী হয়েছিলেন।

তৃতীয় দলটি ছিল শাহ আজিজুর রহমান ও খান এ সবুরের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ। কিন্তু জোটে যোগ দিয়েছিল শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বের অংশটি। পরে শাহ আজিজুর রহমান সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

চতুর্থ দলটির নাম ছিল ইউনাইটেড পিপল পার্টি (ইউপিপি)। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বামপন্থি হিসেবে পরিচিত কাজী জাফর আহমদ ও ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম। উভয়ই পরে মন্ত্রী হয়েছিলেন ।

পঞ্চম দলটির নাম হচ্ছে, বাংলাদেশ লেবার পার্টি। এই পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও মূল নেতা ছিলেন, মাওলানা আব্দুল মতিন।

ষষ্ঠ দলের নাম হচ্ছে, বাংলাদেশ তফসিলি জাতি ফেডারেশন। মূলত এটি ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি রাজনৈতিক দল। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী রসরাজ মণ্ডল।

এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, ওই সময় যেসব রাজনীতিবিদরা জোটভুক্ত হয়েছিলেন, তাদের শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশই ছিলেন তিন সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তারা যেমন ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে রাজনীতি করেছেন, তেমনি একইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও জ্ঞাত ছিলেন। আজ দল গঠনের ৪৮ বছর পর দেখা যাচ্ছে, সেই নেতাদের অধিকাংশই আর বেঁচে নেই। সেই বিবেচনায় জিয়াউর রহমান অত্যন্ত ভাগ্যবান ছিলেন। কারণ তার ক্যাবিনেটে তখন অসাধারণ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতাদের সমাগম ঘটেছিল।

এমনকি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর দলের নেতৃত্বে আসা খালেদা জিয়াও অনেককে পেয়েছিলেন। সে কারণেই তিনি একদম গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এলেও ওই অভিজ্ঞ নেতাদের সুপরামর্শের কারণে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছিলেন নানাভাবে। তাই তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন দেশনেত্রী হিসেবে। বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

বর্তমানে তৃতীয় ধাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে বিএনপিকে আমরা দেখছি, তার নেতৃত্বে আছেন মূলত সেসব রাজনৈতিক নেতারা, যাদের অধিকাংশই স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাজনীতি করে বড় হয়েছেন। যাকে বলা যায় তরুণ নেতৃত্বের এক বিএনপি। এই নেতৃত্ব এখন দেশ চালাচ্ছে। এই তরুণ নেতৃত্ব দলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হলেও জুলাই বিপ্লব-উত্তর সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতিকে কীভাবে মোকাবিলা করবে, এর ওপর নির্ভর করছে তাদের সাফল্য।

কারণ বড় কোনো পরিবর্তনের পর যে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এর অভিঘাত সহ্য করার ক্ষমতা অনেকের থাকে না। শুরু হয় সনাতন ও নতুনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। ইতিহাস বলছে, অতীতে সংঘটিত পৃথিবীর সব বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোন্দল পরিলক্ষিত হয়েছে। আর বিএনপি সৃষ্টি হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে। যেমন ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর একটি প্রতিবিপ্লবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছিল। কিন্তু তিন দিন পর ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার পাল্টা অভ্যুত্থানে পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হতে আরো সময় লেগেছিল। কারণ ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ১৯-২১টি সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সবগুলো চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় এর। ঠিক এ রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, বিএনপির বিগত ৪৮ বছরের ইতিহাসে বারবার ক্ষমতাসীন হয়েছে ফ্যাসিবাদী শাসন-পরবর্তী বড় পরিবর্তনের পর। যেমনটা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ৭ নভেম্বর পরবর্তী দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে তার জন্ম। আবার ৯০ দশকে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৯৯১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতাসীন হওয়ার ঘটনা। সর্বশেষ জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের মাধ্যমে যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে, এর পটভূমিতে বিএনপির পঞ্চমবার ক্ষমতাসীন হওয়া নিশ্চয়ই বিশাল তাৎপর্য বহন করছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার সুযোগ খুব কমই থাকে। ক্ষমতাসীন বিএনপি এখন সে রকমই একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদী শাসনকালে ভেঙে পড়া সবকিছু ঠিকঠাক করতে প্রয়োজন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া। কারণ বর্তমান সংসদে যারা সরকার ও বিরোধী দলে আছেন, তারা উভয়ই জুলাই বিপ্লবের অংশীদার। সুতরাং জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা কোন্দল থাকলে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠবে।

ভালো উইকেটেই বদলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট: আশরাফুল

চোটে কাঁদলেন নেইমার, দায় দিলেন নিজের মাঠের অবস্থাকে

আবেগের পরিণতি অশুভ না হোক

ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে জানেন না ভ্যান্স

সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টেশন ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মুমিনের পরিচয়

নেপালে ৯ দিন পর টানেলে আটকে পড়া ২ জনকে জীবিত উদ্ধার

একনজরে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.)

নতুন পে স্কেলের গেজেট আগামী সপ্তাহে

পাকিস্তান সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দের দাবি ইরানের