কিংবদন্তি, কৃতবিদ্য, স্বনামধন্য, সত্যনিষ্ঠ—এমন বহু বিশেষণে রুজু হতে পারেন বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক। আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে, কালের পরিক্রমায় গেঁথে তুলতে পারি বরণীয় ও প্রতিবাদী বহু নাম, যারা সাংবাদিকতা-সাহিত্যকে নিবেদন করেছেন জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে। মানুষকে সত্যটা জানানো, বোঝানো এবং মুক্তির পথ দেখানো—সব মিলিয়ে জাতি ও রাষ্ট্রসত্তার নৈতিক নির্মিতিই ছিল তাদের উদ্দেশ্যযাত্রা। মধ্যবিত্ততার টানাটানি সংসারে মলিন হাতে কলম ধরার দলবদ্ধ যে রোখ, তা প্রতিরোধের আর কোনো ইতিহাসে শ্রুত হয় না। এদের মধ্যে আতাউস সামাদ একটু বেশি আলাদা। পৃথক মূল্যায়নের দাবিদার। আজ তার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।
আতাউস সামাদকে মনে করার বড় কারণ হলো, সাংবাদিকতায় অ্যাকিউরেসি (Accuracy) সর্বতোভাবে বজায় রাখার গুণ। ফেক নিউজ (Fake news) তাঁর জগতে ছিল নিষিদ্ধ। খবর পেলেই ঘর্মাক্ত হয়ে সত্যতা যাচাই করতেন। পবিত্র কোরআনে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের অমোঘ নির্দেশ তিনি পালন করেছেন। জীবনের সব উপমা ও উদাহরণসমৃদ্ধ কোরআনের সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা প্রথমেই যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’
স্বৈরাচার এরশাদের আমলে মতিঝিলে বিসিআইসি ভবনে একটি ঘটনায় তিনি জেল খেটেছেন। এরশাদের ওই অফিস পরিদর্শনকালে কর্মচারীরা তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছিল। এ খবর বিবিসিতে আতাউস সামাদ প্রচার করেন। এ জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। খবরটি সঠিক ছিল এবং ‘ভুয়া খবর’ প্রচারের জন্য তিনি ক্ষমাও চাননি। সাহসী সাংবাদিকতার এমনি নজির পাই আমার দেশ সম্পাদক প্রতিবাদী সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের একটি ঘটনায়। ‘চেম্বার জজ মানে স্টে’—এই শিরোনামের খবরটি ছিল ফ্যাসিবাদী হাসিনার সুপ্রিম কোর্টের চরিত্র। আপিল বিভাগের শুনানিতে এ খবরের জন্য তিনি ক্ষমা না চাওয়ায় তাঁকে জেল খাটতে হয়। আপিল বিভাগের এক বিচারক জঘন্য এক মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মতে, ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। মাহমুদুর রহমান উল্লেখ করেছিলেন ‘ট্রুথ ইজ ডিফেন্স’। সত্যকে রক্ষাকবচ মানার সংগ্রাম এবং সত্যকে মিথ্যা, অর্থাৎ ফেক (fake) বলার ঘটনায় ট্রাম্প-হাসিনা বনাম সাংবাদিকদের লড়াই এখনো চলমান।
দ্বিতীয়ত, তাঁকে অনায়াসে সব্যসাচী সাংবাদিক বলা যায়। তিনি বার্তা সংস্থা, দৈনিক, সাপ্তাহিক, রেডিও, টেলিভিশন—গণমাধ্যমের সব শাখায় কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। পূর্বসূরিদের অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি দিল্লি থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারী তৎকালীন রাজনীতির নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। এর আগে পাকিস্তান অবজার্ভারের চাকরিকালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার খবর করেছেন। তিনি এবং আরেক বরেণ্য সাংবাদিক অবজার্ভারের আবদুর রহিমের কাছে শেখ মুজিব কাঠগড়া থেকে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর জন্য একটি চিরকুট দিয়েছিলেন। এতে শেখ মুজিবের অনুরোধ ছিল তাঁর মুক্তির জন্য মওলানা যেন আন্দোলন করেন। ভাসানী ওই চিরকুটের সত্যতা সম্পর্কে নিঃসংশয় হয়েছিলেন বহনকারীদের দেখে। এরপরই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা এবং মুজিবের মুক্তি। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তদানীন্তন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি স্বাধীনতাকামী সাংবাদিকদের একটি মিছিল বের করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ও তাঁর পরিবার সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শহীদ লে. সামাদ ছিলেন তার আপন ভাতিজা।
পেশাগত সততা এবং প্রকৃত নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য তিনি সব মহলে সম্ভ্রম ও সমীহ অর্জন করেছিলেন। রাজনীতিকরা তাকে হ্যান্ডেল করতে ভয় পেতেন। বিরাশি থেকে নব্বই বিবিসির বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবে কালজয়ী রিপোর্ট করেছেন। আর বিবিসিও সে সময়, অর্থাৎ সেন্সরশিপের আমলে, মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য অবিস্মরণীয় জনপ্রিয়তা পায়। তিনি নিজে ‘এখন’ নামে একটা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বের করেছেন। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’, ‘সচিত্র সন্ধানী’তে অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ কলাম লিখতেন। আমার দেশ-এর সফল উপদেষ্টা সম্পাদক, এনটিভির দুঃসময়ে প্রধান নির্বাহী কর্তা হিসেবে তাঁর পরিচালনা তাঁকে বিশেষ সুনাম এনে দেয়। সাপ্তাহিক হলিডে, ডেইলি স্টার, প্রথম আলোতেও কলাম লিখেছেন। তাঁর অবিস্মরণীয় ভূমিকা দেখতে পাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের রাজনৈতিক সংকটে দুই নেত্রীর মধ্যে দূতিয়ালির জন্য গঠিত সুশীল সমাজের পাঁচ সদস্যের কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে।
তিন নম্বর যে কারণের জন্য তিনি আলাদা, তা হচ্ছে সাংবাদিকতার শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মযজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অনার্স চালুর পর এক ঝাঁক নামি সাংবাদিক খণ্ডকালীন শিক্ষকতার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন এস এম এ চৌধুরী, শহীদুল হক, আতাউস সামাদ, আহমেদ হুমায়ুন, হাসান সাঈদ, নজরুল ইসলাম, খোন্দকার আলী আশরাফ, এম এ হালিম প্রমুখ। আতাউস সামাদ সাংবাদিকতা পড়ানোকে ভীষণ ভালোবাসতেন। কিন্তু বিভাগের আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা পরে তাঁকে বাদ দেন। নজিরবিহীন একটা ঘটনা হলো, আতাউস সামাদের অন্যতম গুরু মশহুর সাংবাদিক এ বি এম মূসা ওই বিভাগে তাঁর শিষ্যের নামে একটা চেয়ার প্রবর্তনের জন্য ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। আমি আতাউস সামাদের অন্যতম প্রিয় ছাত্র বলে মূসা ভাইয়ের মূল্যবান স্নেহ পেয়েছিলাম।
আতাউস সামাদ রিপোর্টিং পড়াতেন এবং বহু মুগ্ধ ছাত্র তৈরি করেছেন। এসব ছাত্র অথবা না-ও ছাত্র, যারা তার সময়ে সাংবাদিকতা করেছেন, নিয়মিত ফোন পেতেন আতাউস সামাদের। প্রশংসা বা মাঙ্গলিক ভর্ৎসনার মাধ্যমে রিপোর্টের ভালো-মন্দ বুঝিয়ে বলতেন। অর্থাৎ, তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার মান-মন্দির। আমরা রিপোর্ট লিখতে বসলে আতাউস সামাদের চেহারাটা চোখে ভাসত। বলতেন, সাংবাদিক মাত্রই আদি সাম্যবাদী সমাজের লোক। প্রতিটি মানুষই তার স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে বহু যুগবাহিত স্মৃতি সংস্কারের শিকার। তিনি ধর্মপ্রাণ ছিলেন, ধর্মান্ধ নন।
রক্ষণশীল, শিক্ষানুরাগী এক মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান আতাউস সামাদের বাবা ছিলেন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, নিরহংকারী ভদ্রলোক ছিলেন। হাফ-হাতা ঘিয়ে বা আকাশি রঙের শার্ট ও পাজামা-পাঞ্জাবি ছিল স্যারের প্রিয় পোশাক। রেনু ভাবি ছিলেন আতাউস সামাদের সাংবাদিকতা ও মধ্যবিত্তের গৃহস্থালির সুশীল সমন্বয়ক। প্রেস ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরিয়ান হিসেবেও পেয়েছি ভাবিকে। একমাত্র ছেলে সন্তু, মেয়ে সাথী ও শান্তা এবং ছোট ভাই বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আতিকুস সামাদÑকেউই আর দেশে নেই। স্যার মারা যাওয়ার কদিন পরই শোকাহত ভাবি চলে গেছেন পরপারে।
সর্বত্রই সাংবাদিকদের ও তাদের পরিবারদের এই পরিণতি। না-মেটা সাধে অস্থিরতা, অপূর্ণ স্বপ্নের গ্লানি আমাদের তাড়িয়ে ফেরে। সাংবাদিকের জীবন মানে ঘর ও বাহির। মানুষ তাঁর উদ্দিষ্ট। মজলুম মানুষের মুক্তির স্বপ্নে মাতোয়ারা। নিজের সঙ্গে একা একা থাকার একটা বিবাগি সৃজনসুখ আছে। সত্যের দরজায় হানা দেওয়ার আনন্দটা আতাউস সামাদ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতেন। তুরপুন দিয়ে মিথ্যার উপরিতল ভেদ করে ফুটোফোঁকর বানিয়ে চুইয়ে পড়ার কিছু না কিছু পেয়ে যাওয়া—এটাই ছিল তাঁর স্টাইল। এ জন্য ফ্যাসিবাদী আমলে অনেক আওয়ামী লীগ নেতার গালাগাল হজম করতে হয়েছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তাঁকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। মনে আছে, বেগম জিয়া যখন সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর ব্রেকিং নিউজটা আতাউস সামাদ করেছিলেন বিবিসিতে।
তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ঈর্ষা কোনো দিন শেষ হবে না। তাঁর বই ‘একালের বয়ান’-এ একটা অভিমানী উক্তি আছে। ‘জীবনের এতটা পথ হাঁটলাম কিন্তু আলোর দেখা পেলাম না’—এই অনুভূতি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সবার। আজ বেঁচে থাকলে একমাত্র আতাউস সামাদ রাজনীতিবিদদের বলতেন—আপনারা লিখতে দিন, বলতে দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভুয়া খবর’ বা মানহানিকর অশ্লীল মন্তব্য—এসবের জন্য সাংবাদিকদের দোষারোপ করেন কেন? সাংবাদিকদের বাঁচতে দিন। আর অপছন্দের কিছু পত্রিকায় ছাপা হলে বা টিভিতে প্রচার হলে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন কেন? দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার সঙ্গে দরকার রাজনীতিবিদদের সত্য সইবার সহিষ্ণুতা ও সংযম।
লেখক: জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি