হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভূরাজনীতির কেন্দ্রে বাংলাদেশ

ড. মাহরুফ চৌধুরী

ছবি: এ আই

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি বহুল আলোচিত উক্তি হলো, ‘ভূগোল রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে না, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার কাঠামো নির্ধারণ করে’। এই উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান নিজে থেকেই তাকে সমৃদ্ধ বা শক্তিশালী করে তোলে না; বরং সেই ভূগোলকে রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করে তার ভবিষ্যৎ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব রাষ্ট্র তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে, তারা নিজেদের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে, যেসব দেশ নিজেদের অবস্থানের তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা প্রায়ই অন্যদের ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশে পরিণত হয়েছে কিংবা বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বলয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় ভূগোলকে আর শুধু মানচিত্রের একটি অবস্থান হিসেবে দেখা হয় না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগরীয় জলপথ—এই অবস্থান বাংলাদেশকে একটি স্বাভাবিক আঞ্চলিক সেতুবন্ধে পরিণত করেছে। উত্তরদিকে হিমালয়-সংলগ্ন অঞ্চল এবং ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকার বিস্তৃত ভূপ্রকৃতি বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক করিডোর, একটি সম্ভাব্য বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং একটি সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবেও দেখা হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী এই অবস্থান এমন একটি স্বাভাবিক সংযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতিমালার মাধ্যমে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, লজিস্টিকস এবং উৎপাদন নেটওয়ার্কের একটি অপরিহার্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

আধুনিক ভূরাজনীতির আলোচনায় একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, একবিংশ শতাব্দীতে কোনো ভূখণ্ডের গুরুত্ব শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের কারণে নয়; বরং সংযোগ, বাণিজ্য, সমুদ্রপথ, জ্বালানি প্রবাহ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক কর্মতৎপরতা বৃদ্ধিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত নিয়মনীতির পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে ভূগোলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রিটিশ ভূরাজনীতিবিদ হলফোর্ড ম্যাকিন্ডার (১৮৬১-১৯৪৭) তার বিখ্যাত ‘হার্টল্যান্ড তত্ত্ব’ উপস্থাপন করেছিলেন। তার মতে, ইউরেশিয়ার কেন্দ্রভাগ নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিই বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। পরে মার্কিন ভূরাজনীতিবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান (১৮৯৩-১৯৪৩) যুক্তি দেন যে বিশ্বের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হার্টল্যান্ডে নয়, বরং উপকূলীয় ‘রিমল্যান্ড’ অঞ্চলে নিহিত। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরেশিয়ার উপকূলঘেঁষা অঞ্চলগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিকে অধিক কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, স্পাইকম্যানের বিশ্লেষণ অনেকাংশে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব প্রমাণ করে যে সমুদ্রসংলগ্ন অঞ্চলগুলোই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

বাংলাদেশ এই রিমল্যান্ড অঞ্চলের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আজ চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে। কারণ এ অঞ্চল শুধু সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য নয়; বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি, সমুদ্রসম্পদ, উপকূলীয় বন্দর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, বঙ্গোপসাগর বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সামুদ্রিক করিডোরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাময়িক কূটনৈতিক বাস্তবতা নয়; বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনীতি ও ভূ-অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি।

বাংলাদেশের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকালেই হবে না; উত্তর ও পূর্ব দিকেও তাকাতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার, দক্ষিণ-পশ্চিম চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সম্ভাব্য স্থলসংযোগ তৈরি করতে পারে। এই অবস্থান এমন একটি স্বাভাবিক যোগাযোগ কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল (তথা সেভেন সিস্টারস), মিয়ানমারের রাখাইন ও সাগাইং অঞ্চল, নেপাল এবং চীনের ইউনান প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক সংযোগপথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভূগোল শুধু নিজস্ব অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি সমগ্র অঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক একীকরণের ক্ষেত্রেও একটি কৌশলগত উপাদান।

বর্তমানের পারস্পরিক নির্ভরতা ও সংযুক্তির যুগে এ কারণেই বাংলাদেশকে অনেক বিশ্লেষক ‘সংযোগ রাষ্ট্র’ (কনেকটিভিটি স্টেট) হিসেবে অভিহিত করেন। আধুনিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-চিন্তায় সংযোগ রাষ্ট্র বলতে এমন দেশকে বোঝায়, যার ভৌগোলিক অবস্থান বিভিন্ন অঞ্চল, অর্থনীতি বা সভ্যতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে। যদি সড়ক, রেল, নৌ ও বন্দরভিত্তিক অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলা যায় এবং তার সঙ্গে শুল্কব্যবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সংযোগ ও লজিস্টিকস সেবাকে আধুনিক করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হতে পারে। তখন বাংলাদেশ শুধু পণ্য পরিবহনের একটি করিডোর হবে না; বরং আঞ্চলিক উৎপাদন, গুদামজাতকরণ, মূল্য সংযোজন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারবে। এ ধরনের সংযোগভিত্তিক সহযোগিতামূলক অর্থনীতি সাধারণত প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্বরাজনীতির আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহান (১৮৪০-১৯১৪) যুক্তি দিয়েছিলেন যে সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। তার বিখ্যাত ‘ইতিহাসে সামুদ্রিক শক্তির প্রভাব’ (দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব সি পাওয়ার আপন হিস্টোরি) গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্র সমুদ্রপথ, বন্দর এবং নৌবাণিজ্যের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। আজকের পৃথিবীতে তার সেই তত্ত্ব আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ বিশ্ববাণিজ্যের অধিকাংশ এখনো সমুদ্রপথে পরিচালিত হয় এবং জ্বালানি, কাঁচামাল ও শিল্পপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রবিন্দুও সমুদ্রপথ। বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবস্থানও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) সম্প্রসারিত হয়েছে, যা নীল অর্থনীতি, সামুদ্রিক সম্পদ এবং সমুদ্রভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সমুদ্রসম্পদের মধ্যে মৎস্যসম্পদ, অফশোর জ্বালানি, সামুদ্রিক খনিজ, নবায়নযোগ্য শক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প, সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন এবং সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তির মতো বহু সম্ভাবনাময় খাত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলরাশি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সমুদ্র গবেষণা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং উপকূলীয় অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো বেড়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক সহযোগিতার ধারণার উত্থানের কারণে। একসময় বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র ছিল আটলান্টিক মহাসাগর। আজ সেই কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়া-প্যাসিফিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ, বিশ্বের ব্যস্ততম সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অংশ এখন এই অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা—এসব কৌশলগত উদ্যোগের মধ্যেই বঙ্গোপসাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব উদ্যোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কৌশলগত অগ্রাধিকার ভিন্ন হলেও একটি বিষয়ে তারা প্রায় অভিন্ন। আর তা হলো বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক গুরুত্বকে তারা সমানভাবে স্বীকৃতি দেয়। এটিই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক মূল্য শুধু একটি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেই এর ভিত্তি নিহিত।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ভূরাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বকে কীভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়? রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার দিক থেকে শুধু ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকাই যথেষ্ট নয়; সেই অবস্থানকে কাজে লাগানোর রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, লোকবলগত ও অবকাঠামোগত সক্ষমতাও থাকতে হয়। উন্নত বন্দর, দক্ষ কাস্টমস ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ছাড়া ভৌগোলিক সুবিধা অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না। ইতিহাসে বহু রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও দূরদর্শিতার অভাবে উন্নয়নের সুযোগ হারিয়েছে, আবার সিঙ্গাপুরের মতো ছোট রাষ্ট্র সীমিত ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও ভূগোলকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখানেই যে, ভূগোলকে ভাগ্য হিসেবে নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় কৌশলের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য, আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধির এক শক্তিশালী ভিত্তিতে রূপান্তর করা। বাংলাদেশের জন্যও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং মানবসম্পদকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশটি সত্যিকার অর্থে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় সংযোগ-কৌশল, যেখানে সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, জ্বালানি অবকাঠামো, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, শিল্পাঞ্চল এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে। কারণ আধুনিক বিশ্বে অবকাঠামো তখনই সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে, যখন তা উৎপাদন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত হয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি প্রাকৃতিক সুবিধা দিয়েছে; এখন প্রয়োজন সেই সুবিধাকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যা কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষকরা একে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি) বলে অভিহিত করেন। এর অর্থ কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করা নয়; বরং এমন স্বাধীন কূটনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে বাংলাদেশ নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় এ ধরনের কৌশলই তুলনামূলকভাবে ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এতে একদিকে যেমন বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে তেমনি কোনো একক শক্তির প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতার মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমে আসে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই ভবিষ্যৎ জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-চীন সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব (তথা ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’) বাংলাদেশের সামনে তাই এক ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। আমরা যদি সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে পারি, তাহলে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া কোনো কল্পনা নয়; বরং সেটি হবে আমাদের জন্য একটি বাস্তবসম্ভব লক্ষ্য। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নিজের ভূগোলকে নিয়ে নতুন করে ভাবা, তাকে নতুন করে আবিষ্কার করা। বহু দশক ধরে আমরা আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে অনেকাংশে একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা হিসেবে দেখেছি; অথচ বর্তমান বিশ্বে এটি একটি কৌশলগত সম্পদ।

বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, ভূখণ্ড একসময় ছিল সাম্রাজ্য, সভ্যতা ও বাণিজ্যের সংযোগস্থল, সেই ভূখণ্ডই আজ আবার নতুন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়ন-চিন্তাও আরো বিস্তৃত এবং কল্যাণমুখী হবে, যেখানে ভূগোল শুধু সীমান্ত নির্ধারণের বিষয় নয়, বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কল্যাণমুখী ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম ভিত্তি। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক আকারে নয়; অনেক সময় তার অবস্থানেই নিহিত থাকে।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

Email: mahruf@ymail.com

শুধু ইরান নয়, হুথিদের অভিযানের তাৎপর্য আরো বড়

অসুস্থ প্রতিযোগিতার আবর্তে সন্তানের শৈশব

অর্থনীতি কতটা সইতে পারবে

একটি আইফোন ও আমাদের সামাজিক পচন!

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ের সামগ্রিক পাঠ ও মূল্যায়ন

ভারতপ্রেমীদের গুপ্ত আশঙ্কা

আর কোনো দফা নয় এবার একটা রফা করুন

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঘোষিত ইশতেহার

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয় স্বার্থ

বাংলাদেশে জিন্নাহবিদ্বেষের পূর্বাপর