একটি শিশুর রঙিন ও আনন্দময় শৈশব আজ বন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ-ছয় ইঞ্চির আলোকিত পর্দায়। সন্তানকে ভালোবেসে, আদরের বশবর্তী হয়ে কিংবা শান্ত রাখার কৌশল হিসেবে যে মোবাইল ফোনটি আমরা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি, তা অনেকের জন্য ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনছে। সম্প্রতি সংবাদপত্রের পাতা ওলটালেই চোখে পড়ে মোবাইল গেম বা সাইবার জটিলতায় জড়িয়ে শিশু-কিশোরদের অপহরণ কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো শিউরে ওঠা খবর। ‘ফ্রি ফায়ার’ বা ‘পাবজি’র মতো গেমের ভার্চুয়াল লড়াই এখন আর শুধু পর্দার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; তা নেমে এসেছে বাস্তব জীবনের রক্তপাতে। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কিশোর অপরাধের একটি বড় অংশের পেছনে রয়েছে মোবাইল গেমের আসক্তি এবং গেমের অ্যাকাউন্ট কেনাবেচা বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংঘাত। যে প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার কথা ছিল, আমাদের সামান্য অসচেতনতায় তা আজ কেড়ে নিচ্ছে সন্তানদের অমূল্য প্রাণ। আদরের ছলে তুলে দেওয়া এই যন্ত্রটি তাই শুধু শৈশবই নয়, কখনো কখনো কেড়ে নিচ্ছে তাদের আয়ুও।
শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, শিশুর মনোজগতেও এই যন্ত্রটি প্রতিদিন চালিয়ে যাচ্ছে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্রাতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে শিশুদের মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশের বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মোবাইলের পর্দায় দ্রুত পরিবর্তনশীল রঙিন দৃশ্য ও ছোট ভিডিওগুলো মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে কৃত্রিমভাবে ‘ডোপামিন’ হরমোন নিঃসৃত করে, যা শিশুদের মাদকের মতোই চরম মাত্রায় আসক্ত করে তোলে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ কমে যাচ্ছে, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্পষ্টতই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের স্ক্রিন টাইম শূন্য বা একেবারেই সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ এ সময়েই মস্তিষ্কের সবচেয়ে বেশি বিকাশ ঘটে। অথচ আমরা আধুনিকতার মোড়কে শিশুদের হাতে এমন এক আসক্তির উপাদান তুলে দিচ্ছি, যা তাদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছে।
ইন্টারনেটের সীমাহীন জগৎ একটি অপরিপক্ব শিশুর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্ধকার ও বিপজ্জনক এক গভীর অরণ্য। ইন্টারনেটে এমন অসংখ্য বিষয়বস্তু রয়েছে, যা কোনোভাবেই শিশুদের দেখার উপযোগী নয়; অথচ তা এখন তাদের হাতের মুঠোয় উন্মুক্ত। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকের নজরদারি ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের একটি বিশাল অংশ মাত্র ১১ বছর বয়সেই পর্নোগ্রাফি, চরম সহিংসতা বা বিকৃত রুচির কনটেন্টের মুখোমুখি হয়। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে শিশুরা একবার কোনো নেতিবাচক বিষয় দেখলে, তাদের সামনে প্রতিনিয়ত সে রকম কনটেন্টই আসতে থাকে। এ ধরনের অনুপযোগী দৃশ্য তাদের কোমল মনে গভীর মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে এবং স্বাভাবিক মানসিক বৃদ্ধি স্থবির করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা সাইবার বুলিং বা ব্ল্যাকমেলিংয়ের শিকার হয়ে তীব্র মানসিক অবসাদে ভোগে, যা কখনো কখনো আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পরিণতির দিকেও ঠেলে দেয়। অজান্তেই আমরা আমাদের নিষ্পাপ সন্তানদের এক বিষাক্ত ভার্চুয়াল চোরাবালিতে নিক্ষেপ করছি, যেখান থেকে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এক দুঃসাধ্য লড়াই।
মোবাইল আসক্তির এই নেতিবাচক প্রভাব শুধু মনস্তাত্ত্বিক বা সামাজিক নয়, এর একটি বড় অর্থনৈতিক ও পারিবারিক মূল্যও আমাদের চোকাতে হচ্ছে। অনেক পরিবারের বাবা-মায়েরা নিজেদের অনেক শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের আবদার মেটাতে দামি স্মার্টফোন ও নিয়মিত ইন্টারনেট ডেটা কিনে দিচ্ছেন। অথচ এই বিনিয়োগ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনার বদলে এক অর্থনৈতিক ফাঁদ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক গেমিং ইন্ডাস্ট্রিগুলো ‘মাইক্রো-ট্রানজ্যাকশন’ বা গেমের ভেতরের কেনাকাটার মাধ্যমে প্রতিবছর শত শত কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে, যার প্রধান লক্ষ্য এই অপরিণত শিশু-কিশোররা। গেমের পেছনে টাকা ওড়াতে গিয়ে অনেক শিশুই পরিবারের টাকা চুরি করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, একই ছাদের নিচে বাস করেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরত্ব। ড্রয়িংরুমে বসে সবাই যার যার স্ক্রিনে ব্যস্ত, নেই কোনো পারস্পরিক কথোপকথন। যে অর্থ আমরা সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করছি, সেই অর্থই প্রকারান্তরে আমাদের পারিবারিক বন্ধন শিথিল করে দিচ্ছে।
ডিজিটাল এই বিভ্রম থেকে জেগে ওঠার এখনই উপযুক্ত সময়, নতুবা আমাদের চোখের সামনেই একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে যাবে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার জন্য কোনোভাবেই তাদের দোষারোপ করা যায় না; এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমাদের মতো প্রাপ্তবয়স্কদেরই নিতে হবে। শিশুদের হাতে যন্ত্রের বদলে তুলে দিতে হবে গল্পের বই, তাদের নিয়ে যেতে হবে খোলা মাঠে, পরিচয় করিয়ে দিতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে। তাদের একাকিত্ব দূর করতে ডিজিটাল স্ক্রিন নয়, বরং বাবা-মা হিসেবে আমাদের গুণগত ও আন্তরিক সময় দেওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট বয়স ও পরিমিতি থাকতে হবে, যা কঠোরভাবে পরিবার থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। আসুন, আজই আমরা সংকল্পবদ্ধ হই—শিশুদের ছোট ছোট হাতগুলো থেকে নিষ্প্রাণ মোবাইল ফোনটি সরিয়ে নিয়ে সেখানে তুলে দিই আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন, এক নিরাপদ ও আনন্দময় শৈশবের প্রতিশ্রুতি।
লেখক: শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা