হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জিআই পণ্য ইলিশ: গর্ব দিয়ে সম্পদ রক্ষা করা কঠিন

প্রফেসর মো. ফখরুল ইসলাম

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এটি একটি সুস্বাদু খাদ্য এবং ইলিশ বাঙালির সংস্কৃতি, অর্থনীতি, নদীমাতৃক সভ্যতা এবং জাতীয় পরিচয়েরও প্রতীক। আন্তর্জাতিকভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ইলিশকে ঘিরে জাতীয় গর্ব আরো বেড়েছে। কিন্তু শুধু গর্ব কি একটি প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে পারে? গর্ব অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু সম্পদ রক্ষা করে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা, কার্যকর আইন, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাই মৌসুমের মাঝেও যখন বাজারে ইলিশের সংকট, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ছোট আকারের মাছের আধিক্য দেখা যায়, তখন স্বীকার করতেই হয়, কারণ আমাদের অজানা নয়। শুধু এসব প্রতিকারের বাস্তবায়ন দুর্বলতাই আজকের মৌসুমের সময় ইলিশের সংকটের জন্য দায়ী।

বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের সিংহভাগই বাংলাদেশের নদী ও উপকূল থেকে আসে। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত। জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদানও উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন গবেষণা সূত্র থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশের উৎস। দেশের অর্থনীতিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ জিডিপির সমান; এটি একক প্রজাতি হিসেবে মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১০-১১ শতাংশ জোগান দেয়। প্রায় ৬-৭ লাখ মানুষ সরাসরি এবং ২০-২৫ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ইলিশনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫.২৯ লাখ টন। তবে এর আগের বছর উৎপাদন ছিল প্রায় ৫.৭১ লাখ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। এই পতন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা।

তবু বাস্তবতা হলো, সমস্যার কারণ আজ অজানা নয়। আমাদের সরকারি সংস্থা, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, আন্তর্জাতিক গবেষণা, সবাই বছরের পর বছর একই কারণগুলোর কথা বলে আসছেন। কিন্তু কার্যকর প্রতিকার এখনো খণ্ডিত, মৌসুমি এবং অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। তবে এখন এর উত্তর খুঁজতে আর বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। কারণগুলো বহু বছর ধরেই চিহ্নিত।

প্রথম কারণ, নদীর অবক্ষয়। ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। ডিম ছাড়ার জন্য এটি সমুদ্র থেকে নদীতে আসে। কিন্তু দেশের বহু নদী আজ নাব্য হারিয়েছে। পলি জমেছে, অবৈধ দখল বেড়েছে, শিল্পবর্জ্য ও নগরবর্জ্যে পানির মান নষ্ট হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে ইলিশের প্রজননও ব্যাহত হবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। নদীকে যদি শুধু পানি বহনের খাল হিসেবে দেখা হয়, তবে ইলিশের ভবিষ্যৎও সংকুচিত হবে।

দ্বিতীয় কারণ, জাটকা নিধন। সরকার প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ করে। এই উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বহু এলাকায় এখনো জাটকা ধরা বন্ধ হয়নি। এর পেছনে শুধু জেলেদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। একজন দরিদ্র জেলে যদি নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা না পান, তবে তিনি আইন ভাঙার ঝুঁকি নিতেই বাধ্য হবেন। প্রকৃত জেলেরা অনেক সময় সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, আবার রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মের কারণে অযোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা পান। ফলে সংরক্ষণ নীতির সামাজিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

তৃতীয় কারণ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের অবাধ ব্যবহার। প্রতিবছর অভিযান হয়, হাজার হাজার মিটার জাল জব্দ হয়, কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরই একই চিত্র ফিরে আসে। কারণ সমস্যার উৎসে আঘাত করা হয় না। অবৈধ জাল উৎপাদনকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা না নিলে শুধু নদীতে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

চতুর্থ কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন, অনিয়মিত বর্ষণ, ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং নদীর প্রবাহের পরিবর্তন ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় কৃষির পাশাপাশি মৎস্য সম্পদকে সমান গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে সংকট আরো বাড়বে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারব্যবস্থা। উৎপাদন কিছুটা কমলেও খুচরা বাজারে মূল্য যে হারে বাড়ে, তা শুধু উৎপাদন ঘাটতির কারণে নয়। জেলে যে দামে মাছ বিক্রি করেন, শহরের ভোক্তা তার কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার, মজুতদার এবং দুর্বল বাজার তদারকি এই মূল্যবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করে। ফলে ইলিশ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। জাতীয় মাছ যেন শুধু উচ্চবিত্তের উৎসবের খাবারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি মর্যাদার বিষয়। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়িয়েছে। কিন্তু জিআই স্বীকৃতি কোনো মাছের সংখ্যা বাড়ায় না। এটি নদীকে দূষণমুক্ত করে না, জাটকা রক্ষা করে না, অবৈধ জাল বন্ধ করে না কিংবা বাজার সিন্ডিকেট ভাঙে না। জিআই শুধু পরিচয়ের স্বীকৃতি; সম্পদ সংরক্ষণের বিকল্প নয়। তাই ইলিশ নিয়ে অহংকার করার আগে ইলিশের আবাসস্থল রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বাংলাদেশে ইলিশ সংরক্ষণে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধকরণ, জেলে পুনর্বাসন এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির মতো ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে অতীতে উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং কিছু বছরে নিম্নমুখী প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগের সাফল্য ধরে রাখতে নতুন কৌশল প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন, ইলিশ ব্যবস্থাপনাকে শুধু মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী রক্ষা করবে পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে স্থানীয় সরকার ও সমাজকল্যাণ খাত, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এটি একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক সমন্বিত কর্মসূচি হওয়া দরকার।

বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে। নদী খনন করে সেগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ, উজান-ভাটির সংযোগ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। নদীকে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখলে ইলিশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে না।

আমাদের ইলিশের বাজার সংস্কার করাও জরুরি। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমাতে হবে। কোল্ড চেইন, ডিজিটাল নিলামব্যবস্থা এবং জেলে সমবায়কে শক্তিশালী করা গেলে জেলে ন্যায্য মূল্য পাবেন, আবার ভোক্তাও তুলনামূলক কম দামে মাছ কিনতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞা জারি, অভিযান পরিচালনা এবং সচেতনতা কর্মসূচি আয়োজন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা বড় ব্যবসায়ী আইন ভঙ্গ করলে তাদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সংরক্ষণ নীতির প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ইলিশ বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এই সম্পদ হারিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু জেলে নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে একটি জাতির পরিচয়ও।

অতএব, মৌসুমে ইলিশের আকালকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সমস্যার কারণ বহু আগেই চিহ্নিত হয়েছে। নদীর অবক্ষয়, দূষণ, জাটকা নিধন, অবৈধ জাল, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্বল বাজারব্যবস্থা এবং নীতির দুর্বল বাস্তবায়ন। এখন প্রয়োজন এসব কারণের বিরুদ্ধে সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ।

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য সম্মানের। কিন্তু এই সম্পদ রক্ষা করতে হয় দূরদর্শী নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন, গবেষণা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ইলিশকে যদি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে চাই, তাহলে মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়। এজন্য জরুরিভাবে স্থায়ী সংস্কারের পথে হাঁটতেই হবে। অন্যথায় প্রতিবছর বর্ষা আসবে, ইলিশের গল্পও হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পাতে জাতীয় মাছের উপস্থিতি ক্রমেই বিরল হয়ে উঠবে। তখন জিআই স্বীকৃতির গর্ব থাকবে, কিন্তু নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য থাকবে না; থাকবে শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া সম্পদের আক্ষেপ।

আমাদের বাজারে ইলিশের আকালের কারণ বহু আগেই চিহ্নিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন অজুহাত না দেখিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারণ, মৌসুমে ইলিশের আকাল শুধু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়। আজকাল কতিপয় মানুষের চাতুরী ও লোভের কারণে বাজারে ইলিশের সরবরাহ সংকট ও অগ্নিমূল্য চরমভাবে কৃত্রিম সংকটে রূপ নিয়েছে। এই কৃত্রিম সংকট আমাদের নীতি, ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

E-mail: fakrul@ru.ac.bd

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল হ্রাস নজিরবিহীন

ইংরেজিতে দুর্বলতা কাটাবেন যেভাবে

ডাকসুর চমক: চীনা প্রতিষ্ঠানে ৪০০ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান

ইউক্রেনকে নিজস্ব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটেন

রংপুরে ৪ খুন: নেপথ্যে মাদক ও চাঁদাবাজি

সমুদ্রের তাপমাত্রায় নতুন রেকর্ড

যুক্তরাষ্ট্রে দুই লাখ আশ্রয়প্রার্থীর ভিসা বাতিল করবে ট্রাম্প প্রশাসন

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে রাজনীতিকদের অবাস্তব বক্তব্যে অপূরণীয় ক্ষতি

হরমুজ খুলে দিতে ইরানের প্রতি পাকিস্তান সেনাপ্রধানের আহ্বান

নিজ ভূমিতে ফেরা অনিশ্চিত ১৩ লাখ রোহিঙ্গার