হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নেপালে হিমবাহ ধস, বিপর্যয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ

সৈয়দ আবদাল আহমদ

নেপালের উঁচু পার্বত্য অঞ্চলের গ্রামগুলোতে ২৬ আগস্টের সকালটা আর দশটা দিনের মতোই শান্ত আর স্নিগ্ধ হয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কেউ জানত না, প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা এক মহাপ্রলয় মুহূর্তের মধ্যে ওলটপালট করে দেবে হাজারো মানুষের সাজানো সংসার। কোনো আকাশভাঙা বৃষ্টি ছিল না, আকাশজুড়ে কোনো মেঘের গর্জনও ছিল না; অথচ মুহূর্তের মধ্যে হিমালয়ের বুক চিরে নেমে এলো এক নারকীয় কাদার স্রোত আর পাথরের পাহাড়।

পাথর আর গুঁড়ো বরফের সেই দানবীয় ঢেউ যখন ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগে ভাটির গ্রামগুলোর ওপর আছড়ে পড়ল, তখন মানুষের ন্যূনতম পালানোর বা নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও ছিল না। মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানি ৩০ ফুট উঁচুতে উঠে গ্রাস করে নিল মাইলের পর মাইল জনপদ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৬৯ জন নিহত এবং প্রায় দেড় হাজার আহত ও দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। নেপালের এই মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্যগুলো যেকোনো মানুষের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার মতো।

বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলোতে নেপালের এই ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে এমন বিপর্যয়ের কারণ কী, তা বিজ্ঞানী ও ভূতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে। আজকের লেখা এ বিষয়গুলো নিয়েই।

আকাশছোঁয়া হিমালয়ের বুকফাটা হাহাকার

নেপালি পত্রিকা দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট, কান্তিপুর ডেইলি ও গোরখাপত্রের বিবরণ অনুযায়ী চোখের পলকে পুরো গ্রাম কাদার নিচে চাপা পড়ে গেছে। যেখানে কিছুক্ষণ আগেও শিশুদের হাসির আওয়াজ ছিল, সেখানে এখন কেবলই শ্মশানের নীরবতা। বহু পরিবারে এমন একজনও বেঁচে নেই, যিনি আপনজনের মরদেহ শনাক্ত করবেন। স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে নেপালের বাতাস।

কাদার স্তূপে আপনজনকে খোঁজার আকুতি: ধসে যাওয়া বাড়িঘর আর মাইলের পর মাইল জমে থাকা ঘন কাদার স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে তাদের মা, বাবা, ভাই কিংবা সন্তানকে। খালি হাতে, নখ দিয়ে কাদা খুঁড়ে প্রিয় মানুষের নিথর দেহটি বের করার এই দৃশ্য পৃথিবীর অন্যতম করুণ এক দৃশ্য। অনেকের ভাগ্যে শেষবারের মতো আপনজনের মুখ দেখার সুযোগটুকুও জুটছে না, কারণ বহু শরীর ভেসে গেছে মাইলের পর মাইল দূরে।

শিশুদের শূন্য দৃষ্টি আর কান্না: অনেক শিশু এই প্রলয়ে হারিয়েছে তার পুরো পরিবারকে। ত্রাণ শিবিরের এক কোনায় বসে থাকা এক এতিম শিশুর শূন্য দৃষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের এই নির্মম নিষ্ঠুরতাকে চাক্ষুষ করিয়ে দেয়। সে হয়তো এখনো বোঝেইনি কেন তার মা-বাবা আর কখনো তাকে বুকে টেনে নেবে না।

সারা জীবনের সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ: হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলের এই মানুষগুলো অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে জীবনযাপন করতেন। এক টুকরো জমি, দুটি গবাদিপশু আর ছোট একটি ঘরই ছিল তাদের পৃথিবী। প্রকৃতির এই তাণ্ডব তাদের সেই শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়ে গেছে। আজ তারা নিজেদেরই ভিটেমাটিতে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, উদ্বাস্তু।

দুর্গমতার কারণে বুকফাটা হাহাকার: পাহাড়ি রাস্তাগুলো ধসে যাওয়ায় এবং সেতুগুলো ভেঙে পড়ায় বহু দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতেই পারছেন না। সেখানে খোলা আকাশের নিচে, তীব্র ঠান্ডায়, ক্ষুধার্ত ও আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছে মানুষ। চোখের সামনে প্রিয় মানুষকে চিকিৎসার অভাবে মারা যেতে দেখা আর দূর থেকে কিছু করতে না পারার এই অসহায়ত্ব বেঁচে থাকা মানুষদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ কেবল ঘরবাড়ি ভাঙেনি, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন আর আশা। আকাশছোঁয়া হিমালয়ের শান্ত শীতল বুক আজ তপ্ত অশ্রু আর বুকফাটা হাহাকারে প্লাবিত।

বিপর্যয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া ২৬ আগস্টের প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মূল বৈজ্ঞানিক কারণ হলো, একটি বিশাল হিমবাহের ধস (Glacier Collapse) এবং এর ফলে সৃষ্ট বরফ-পাথরের ধস (Ice-Rock Avalanche), যা অববাহিকার নদীকে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে একটি কৃত্রিম বাঁধ বা হ্রদ তৈরি করেছিল এবং পরবর্তীকালে সেই বাঁধ ভেঙে এই বিপর্যয় ঘটে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে) এবং বিশ্বখ্যাত জলবায়ু বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক উপগ্রহ চিত্র ও ভূকম্পন বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই বন্যার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ ঘটনা একটি অত্যন্ত জটিল ‘ক্যাসকেডিং ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়’।

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, লাংতাং লিরুং পর্বতের উত্তর পাশে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি হিমবাহের প্রায় ২ হাজার ফুট প্রশস্ত একটি অংশ হঠাৎ ভেঙে প্রায় ৪ হাজার ফুট নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। হিমবাহের এই অংশটি ধসে পড়ার তীব্র আঘাতের ফলে যে ভূকম্পন তরঙ্গ বা শক্তির সৃষ্টি হয়েছিল, তা রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য এনার্জি তৈরি করেছিল। এই কম্পনকে প্রাকৃতিক ভূমিকম্প মনে করা হয়। পরবর্তীকালে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে নিশ্চিত করে যে, কোনো প্রাকৃতিক ভূমিকম্প হয়নি। এটি মূলত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে থাকা হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার কারণে যে তীব্র ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়, সেটাই ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো সংকেত সৃষ্টি করেছিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমবাহের তলদেশের শিলাস্তর দুর্বল হয়ে পড়ায় কয়েক লাখ ঘনমিটার বরফ ও পাথর প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে তিব্বতের লেন্দে নদীতে (Lhende River) ছিটকে পড়ে। এই বিশাল ধ্বংসাবশেষ নদীটির গতিপথ পুরোপুরি বন্ধ করে একটি কৃত্রিম হ্রদ বা বাঁধ সৃষ্টি করে। পানি জমতে জমতে চাপ অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে এই অস্থায়ী বাঁধ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে হু হু করে পানি নিচে নেমে আসে এবং তীব্র বেগে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী এবং উপত্যকায় প্লাবন ডেকে আনে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগার এবং অন্যান্য গবেষক জানান, পর্বত থেকে বিপুল পরিমাণ ওজনের পাথর ও বরফ যখন প্রচণ্ড গতিতে নিচে পড়ে, তখন ঘর্ষণের কারণে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপ মুহূর্তের মধ্যে হিমবাহের বরফকে তরল পানিতে রূপান্তর করে বন্যার পানির আয়তন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই পানি নিচে নামার সময় পাহাড়ের উপত্যকা থেকে প্রচুর পরিমাণে পাথর, মাটি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয় যা অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জেফরি কারগেল জানান, এই কাদার স্রোত, গুঁড়ো বরফ ও পাথরের মিশ্রণে তৈরি মরণঘাতী ঢলটি প্রথম ২২ কিলোমিটার পথ ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার (১২০ মাইল/ঘণ্টা) বেগে অতিক্রম করেছিল। এর ফলে ভাটিতে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যায়। কোনো বৃষ্টিপাত না হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক এই জটিল ও ধারাবাহিক সংকটের (Complex Chain of Hazards) কারণে মুহূর্তের মধ্যে উপত্যকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা দায়ী

২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) সরাসরি ও পরোক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো বলে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন। যদিও হিমালয় পর্বতমালার টেকটোনিক প্লেটের উত্থানের মতো প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এ ধরনের মহাবিপর্যয়ের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর জলবায়ু প্রতিবেদনে ভূতত্ত্ববিদরা উল্লেখ করেছেন, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের ‘পারমাফ্রস্ট’ (যা মূলত পাথর, মাটি ও জৈব পদার্থের মিশ্রণকে হাজার বছর ধরে বরফ দিয়ে আঠার মতো জমিয়ে রাখে) দ্রুত গলে যাচ্ছে।

পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার কারণে হিমবাহের নিচের শিলাস্তর বা ভিত্তি (Bedrock) আলগা হয়ে পড়ে। এ ঘটনার প্রাথমিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, হিমবাহের তলদেশের একটি বিশাল শিলাস্তর ভেঙে ধসে পড়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভিত্তি দুর্বল হওয়ার অন্যতম বড় প্রমাণ।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ প্রফেসর সার্লে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাপমাত্রা বাড়ার কারণে হিমবাহগুলো গলছে এবং আকারে সংকুচিত হয়ে উপরের দিকে চলে যাচ্ছে।

হিমবাহ যত গলছে, পাহাড়ের ঢাল তত বেশি খাড়া ও ঝুলন্ত হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ তার ধারণক্ষমতা বা গ্রিপ হারানোর ফলে পুরো হিমবাহটি একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। সাধারণত ছোট খণ্ড ধসে পড়ে, কিন্তু পুরো হিমবাহ ‘একসঙ্গে’ ভেঙে পড়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের চরম রূপ।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগার এবং আন্তর্জাতিক গবেষক দল লক্ষ করেছেন যে, কেবল ধসে পড়া হিমবাহের বরফ দিয়ে এত বিশাল আয়তনের বন্যা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে হিমালয় অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে

পর্বতের অববাহিকায় বা উপত্যকার তলদেশে আগে থেকেই প্রচুর ‘মৃত ও গলিত বরফ’ (Dead and Decaying Ice) জমা ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ধসে পড়া মূল বরফের প্রচণ্ড আঘাত ও ঘর্ষণে এই মৃত বরফগুলো মুহূর্তের মধ্যে তরল পানিতে পরিণত হয়, যা বন্যার পানির পরিমাণ ও ধ্বংসক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আগেই বলেছি, হিমালয়ের ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় লাংতাং লিরুং শৃঙ্গের কাছের একটি বড় হিমবাহের অংশ ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকার লেন্দে নদীতে আছড়ে পড়ে। এই পতনের প্রচণ্ড অভিঘাত রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি করেছিল যা ভুলবশত ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে মানুষের পরোক্ষ কৃত্রিম কর্মকাণ্ডকেই প্রধানত দায়ী করেছেন। এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা ‘জলবায়ু জরুরি অবস্থা’ হিসেবে দেখছেন।

মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো এবং নির্বিচারে কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্বব্যাপী যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, তার ফলে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। হিমালয় অঞ্চলে এই তাপমাত্রার বৃদ্ধি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। এর ফলে হিমবাহের নিচে ও পাহাড়ি ঢালে দুটি প্রধান নড়বড়ে বা অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়।

উচ্চ পর্বতের শিলা বা মাটিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে স্থায়ী বরফ বা হিমায়িত মাটি (পারমাফ্রস্ট) আঠার মতো শক্ত করে ধরে রাখে, অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে তা গলে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ের ঢাল বা হিমবাহের ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

নেপালের এই দুর্যোগের ঠিক দুদিন আগে ওই অঞ্চলে একটি তীব্র অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছিল, যার ফলে মাটির তাপমাত্রা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই তীব্র গরমে প্রচুর বরফ গলে পানি হিমবাহের ফাটল দিয়ে একেবারে তলদেশে (Bedrock) প্রবেশ করে লুব্রিকেন্ট বা পিচ্ছিলকারক হিসেবে কাজ করেছে যা হিমবাহের বড় অংশকে পাহাড়ের গা থেকে পুরোপুরি আলগা করে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক কারণ অর্থাৎ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার জন্য হিমালয় পর্বত প্রতিনিয়ত উপরের দিকে উঠছে এবং খাড়া হচ্ছে। খাড়া পাহাড়ে মানুষের তৈরি উষ্ণায়নের কারণে যখন বরফের আঠা (পারমাফ্রস্ট) ঢিলে হয়ে যায়, তখন পুরো হিমবাহটি একসঙ্গে হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। আইসিআইএমওডি ও জাতিসংঘের ২০২৩ সালের মূল্যায়ন রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন দশকে (৩০ বছর) জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতার কারণে নেপাল তার হিমবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।

২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দু কুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো তার আগের দশকের তুলনায় ৬৫% দ্রুতগতিতে বিলীন হয়েছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই তীব্র উষ্ণায়নের কারণেই ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডে এবং ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নেপালে একের পর এক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা (Glacial Failures) দেখা যাচ্ছে, যা অতীতে এত ঘনঘন ঘটত না।

আর্থস্কাই (EarthSky) এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিজ্ঞানীদের যৌথ প্যানেল স্পষ্ট জানিয়েছে, মানুষ যেভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে, তার ফলে হিমালয়ের বরফ দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। নেপালের এই বিপর্যয় কোনো একক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বহুমুখী সংকটের একটি প্রত্যক্ষ ফল’।

বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি মারাত্মক সতর্কবার্তা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে ভূবিজ্ঞানী প্রফেসর সার্লে উল্লেখ করেন, হিমালয় পর্বতমালা টেকটোনিক প্লেটের চাপের কারণে প্রতিনিয়ত উপরের দিকে উঠছে (হিমালয়ান আপলিফটিং)। পর্বত যত খাড়া হচ্ছে, হিমবাহগুলো তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও খাড়া হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো হিমবাহটি ‘একসঙ্গে’ ধসে পড়েছে, যা অত্যন্ত বিরল।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, ঘটনার আগের দিনগুলোতে ওই অঞ্চলের বরফ আচ্ছাদন দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছিল। এটি ইঙ্গিত করে যে অস্বাভাবিক উষ্ণ তাপমাত্রা হিমবাহটিকে গলিয়ে দুর্বল করে দিয়েছিল, যার ফলে এই আকস্মিক তুষারধস ঘটে।

দ্য গার্ডিয়ান ও সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর যৌথ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে জাতিসংঘের ২০২৩ সালের একটি রিপোর্টের সূত্র দিয়ে বলা হয়, গত ৩০ বছরে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের পর্বতগুলো তাদের এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। হিমালয়ের এই অঞ্চলে ‘পারমাফ্রস্ট’ (বছরের পর বছর জমে থাকা স্থায়ী বরফ) গলে যাওয়ায় পাহাড়গুলো তাদের কাঠামোগত আঠালো শক্তি হারিয়ে ফেলছে, যা এ ধরনের বিপর্যয়কে ভবিষ্যতে ‘নতুন স্বাভাবিক’ করে তুলছে।

আল জাজিরা ও সিএনএন-এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাধারণত মানুষ মনে করে আকস্মিক বন্যা কেবল ভারী বৃষ্টির কারণে হয়। কিন্তু উচ্চ-পার্বত্য অঞ্চলে বৃষ্টি ছাড়াও তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পারমাফ্রস্ট ক্ষয় এবং পাহাড় ধসের মতো বহুমুখী সংকটের শৃঙ্খল (Complex Chain of Hazards) যে কত বড় প্রলয় সৃষ্টি করতে পারে, নেপালের এই বন্যা তার চাক্ষুষ প্রমাণ। এই জটিলতার কারণেই বিজ্ঞানীদের পক্ষে আগে থেকে নিখুঁত সতর্কতা জারি করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার-এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়, উপগ্রহের ছবি ও বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হিমালয়ের উঁচু পর্বত ল্যাংতাং লিরুং (Langtang Lirung)-এর কাছে একটি হিমবাহ ও পাহাড়ের বড় অংশ ধসে পড়ে। এই হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে গ্লোবাল সিসমোগ্রাফে এটি ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন তৈরি করে। এই ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও কাদার মিশ্রণ তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসে এবং লেন্দে নদী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় প্রলয়ঙ্করী বন্যার সৃষ্টি করে।

প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের (Global Warming) কারণে হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলো দিন দিন চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ গলে যাচ্ছে এবং হিমবাহকে ধরে রাখা পাহাড়ের ভেতরের জমাট বরফের স্তর (Permafrost) নরম হয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক হিমবাহ ধস, পাহাড় ধস ও বন্যার প্রকোপ এবং তীব্রতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

এই দুর্যোগটি আকস্মিকভাবে ঘটেছিল এবং এমন একটি প্রত্যন্ত ও নজরদারিহীন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে যা আগে থেকে অনুধাবন করা বিজ্ঞানীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাছাড়া মেঘলা আবহাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কৃত্রিম উপগ্রহের স্পষ্ট ছবি পাওয়াও কঠিন ছিল।

লেখক: সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ

রাবিতে সাড়ে ৬ বছরে ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

ব্যাগে ছয় দেশের পাসপোর্ট বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায়

বিপিএল ‘অসুস্থ’, মাঠে ফেরার আগে ‘চিকিৎসা’ প্রয়োজন

পশ্চিম তীরের গ্রামের একমাত্র প্রবেশপথ বন্ধ করে দিলো ইসরাইলি বাহিনী

মেসির চার গোলে মন্ট্রিলকে উড়িয়ে জয়ে ফিরল মিয়ামি

আড়াইশ গুম পরিবারে অন্তহীন প্রতীক্ষা

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রকৃত তাৎপর্য

জঙ্গিবাদের ভারতীয় বয়ান ও নিরাপত্তা-হুমকি

নিষেধাজ্ঞায় কি নত হবে ইরান, ট্রাম্পের সামনে বড় প্রশ্ন