হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

চীনের ড্রাগন-রেস্তোরাঁ কূটনীতি

জুলফিকার হায়দার

চীনে সম্প্রতি একটি ছবি বেশ ব্যবসা করেছে। ড্রাগন রেস্তোরাঁ। ছবির পটভূমি তৈরি হয়েছে ইরাকের আদলে বানানো কাল্পনিক একটি দেশকে ঘিরে। সিনেমাটি হয়তো অস্কার পাবে না। গল্পটা বেশ অদ্ভুত, চরিত্রগুলোও কিছুটা কাঠখোট্টা। তাও চীনের বাইরের মানুষের ছবিটি দেখা দরকার। কারণ ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণকে এখানে একদম নতুন এক দৃষ্টিতে দেখানো হয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা সবুজ আলোর সেই শান্ত যুদ্ধ নয়। রাতের নিস্তব্ধ শহরজুড়ে যখন একে একে বোমা এসে পড়ে, তখনকার ভয় আর আতঙ্কের গল্প এটা।

গল্পের নায়ক একজন চীনা বাবুর্চি। যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে সে টাকা বানায়, কিন্তু একসময় যুদ্ধটা তার দিকেই ঘুরে দাঁড়ায়। শুধু একটা ছবির গল্প বলেই এটিকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক অর্থ আছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্বকে চীন কীভাবে দেখে, সেটা এই ছবিতে স্পষ্ট। একটা সিনেমা নিয়ে এত গভীর আলোচনার কথা শুনে হাসি পেতেই পারে। তবে মনে রাখবেন, গত এক দশকে চীনের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি বোঝাতে বিশ্লেষকরা ‘উলফ ওয়ারিয়র’ নামে একটি ছবির উদাহরণই বারবার টেনে এনেছেন। এবার সেই ধারায় বদল এসেছে। জায়গা করে নিয়েছে ড্রাগন রেস্তোরাঁ কূটনীতি। এই নতুন ভাবনার মূল কথা হলোÑসবার সাথে বন্ধুত্ব। রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে এখানে ব্যবসাটাই বড়। সিনেমার গল্পে যেমন, বাস্তব জীবনেও এই নীতি অনেক সময় কিছুটা ওপর ভাসা আর কনট্রাডিক্টরি মনে হতে পারে। তবু পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর বিরক্ত রাষ্ট্রগুলোর কাছে এই কৌশলের একটা বড় আবেদন রয়েছে।

ছবিতে নায়ক শু ফু-র ইংরেজি নাম ‘ওয়ানস আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’। রন্ধনশিল্পে ভাগ্য ফেরাতে সে বাগদাদের মতো এক শহরে এসে রেস্তোরাঁ খোলে। যুদ্ধ শুরু হলে সে আবিষ্কার করে ‘গ্রিন জোন’। আমেরিকান সৈন্যদের আস্তানা। সেখানেই আসল লাভের মুখ দেখে সে। পশ্চিমা সৈন্য আর সাংবাদিকরা তার হাতের রান্না আর মদ উপহার পেয়ে মজে যায়। শু ফু দেদার টাকা কামাতে থাকে। কিন্তু গোল বাধে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায়। এই হামলায় নাম জড়িয়ে পড়ে তার সাবেক ব্যবসাসঙ্গীর। ফলে শু ফু-কে কাটাতে হয় আমেরিকান জেলে। পরে ইসলামিক উগ্রবাদীরা তাকে বন্দি করে। চীনের সরকার সমর্থিত সংবাদমাধ্যম আর গবেষকরা এই ছবিকে চমৎকার এক শিক্ষা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আমেরিকার ধ্বংস করা বিশ্বে চীন কীভাবে শান্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়, সিনেমাটি তারই এক নিদর্শন। তবে একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ছবিতে চীনের সব দিক কিন্তু অত সুন্দরভাবে ফুটে উঠতে পারেনি।

ছবিটির মূল সুর একটাইÑচীন সবার প্রিয় হতে চায়। শু ফু চরিত্রটি একজন দক্ষ চতুর চীনা কূটনীতিকের খাঁটি রূপক। তার স্থানীয় বিজনেস পার্টনার ছিল যুদ্ধপূর্ব সরকারের এক কর্মকর্তা। ক্ষমতা হারানোর পরও শু ফু তার প্রতি অনুগত থাকে। অন্যদিকে আমেরিকান সৈন্যরাও তাকে খুব পছন্দ করে, বিশেষ করে তার রান্নার গুণকে। এমনকি যে সন্ত্রাসী মাস্টারমাইন্ড তাকে আটকে রাখে, সেও তার রান্নার ভক্ত হয়ে যায়। ঘটনা যাই ঘটুক, শু ফু সবার মধ্যে এক সাধারণ মানবিক রূপ খুঁজে পায়। ছবিটিতে কিছু সংঘাতের জায়গাও বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন : এক আমেরিকান সৈন্য তাকে সোজা প্রশ্ন করে, ‘তোমার বিজনেস পার্টনার হলো অপরাধী। আর তোমার বন্ধু হলো ভুক্তভোগী। তুমি সত্যি বিশ্বাস করো এই যুদ্ধের সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই?’ এই প্রশ্নটি চীনের সেই কর্মকর্তাদের আত্মোপলব্ধি ঘটাতে পারে, যারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করেন। আবার যখন বলা হয় চীনের রসদ আর টাকা পেয়েই রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা বেশ বিরক্ত হন। তাদেরও হয়তো একই প্রশ্ন করা যায়। আপনারা কি সত্যি মনে করেন এই যুদ্ধের সঙ্গে আপনাদের কোনো সম্পর্ক নেই?

টাকা কামানোর ব্যাপারে শু ফু বেশ সৎ আর স্পষ্টভাষী। দেনা মেটাতে দ্রুত কিছু টাকা বানিয়ে নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তার চীনা অংশীদার তো বলেই বসে, যুদ্ধের সুযোগে ব্যবসা করতে পারাটা একটা দারুণ ভাগ্যের ব্যাপার। চীনের লোকজন বিদেশে গিয়ে কীভাবে ব্যবসার সুযোগ খোঁজে, এটি তার একটি ছোট্ট উদাহরণ। শুনতে হয়তো বিষয়টি কিছুটা খারাপ শোনায়। কিন্তু যে দেশগুলোতে তারা কাজ করছে, তারা এটাকে ভালোভাবেই নেয়। কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তার মতো এতে কোনো কঠিন শর্ত যুক্ত থাকে না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই-র একটা সোজা নীতি আছেÑ‘ব্যবসায় শুধু ব্যবসার কথাই হবে’। রাজনীতি এড়িয়ে চলার এই স্বভাবের কারণেই চীন মধ্যপ্রাচ্যের পরস্পরবিরোধী দেশগুলোর সঙ্গে সমান তালে সম্পর্ক রাখতে পারে। ইরান বনাম উপসাগরীয় দেশগুলো, আলজেরিয়া বনাম মরক্কো, কিংবা মিসর বনাম ইথিওপিয়া। এসব লড়াইয়ে অন্য দেশগুলো যেকোনো একপক্ষ নেয়। কিন্তু চীন তা করে না। চীন যে দেশগুলোতে কাজ করে, সেখানকার মানুষও এই ভাবনায় বেশ খুশি থাকে। রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে ব্যবসা করার চিন্তাটা বাস্তবে রূপকথা মনে হলেও তারা এটাই পছন্দ করে।

ড্রাগন রেস্তোরাঁ কূটনীতির আরেকটি বড় দিক হলো এর সীমাবদ্ধতা। ছবির শেষের দিকে শু ফু-র মধ্যে একধরনের মানবিক বোধ জেগে ওঠে। সে অনাথ শিশুদের বাঁচাতে কাজ শুরু করে। তবে কাজটা সে করে বাধ্য হয়ে। একপর্যায় তার এক বন্ধু তাকে সতর্ক করে বলে, ‘তোমার এতে জড়ানো একদম ঠিক হয়নি। এরা তো তোমার সন্তান নয়।’ শেষ পর্যন্ত শু ফু সেই কথাই শোনে। সবকিছু ফেলে রেখে সে চীনে ফিরে আসে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছবির শেষ বার্তাটি বেশ সাধারণ। শু ফু-র ভাষায়Ñ‘ভালো খাও, আর নিজের বাচ্চাদের ভালোভাবে মানুষ করো।’ এই কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণের কিছু নেই। তবে এখান থেকেই বোঝা যায় বিদেশে নিজেদের সহযোগীদের চীন ঠিক কতটুকু সাহায্য করবে। চীন কখনো কোনো সামরিক ঝামেলায় জড়াতে চায় না। চলতি বছর ইরান আর ভেনেজুয়েলা তা ভালোভাবেই টের পেয়েছে। চীন-আরব সম্পর্কের এক বিশেষজ্ঞ করিম আলওয়াদির মতে, ‘ব্যাপারটা আসলে প্রত্যাশার সীমানা ঠিক করার মতো। চীন কখনোই কারো নিরাপত্তার গ্যারান্টি হতে চায় না।’

বাবুর্চির স্পেশাল পদ

যারা চীনের উগ্র ‘উলফ ওয়ারিয়র’ আচরণে শঙ্কিত ছিলেন, তাদের কাছে এই ড্রাগন রেস্তোরাঁ কূটনীতি বেশ ভালোই মনে হতে পারে। এত বড় পরিসরে ছড়ানো এই নীতিকে দেখে হয়তো অনেকে একে দন্তহীন বা আনাড়ি ভাববেন। কিন্তু বাস্তবে এটি বেশ শক্তিশালী এক চ্যালেঞ্জ। এত বৈপরীত্য সত্ত্বেও এই নীতি অন্য দেশগুলোকে সহজে আকর্ষণ করে। কারণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বা বোমা মেরে বশ করার চেয়ে এই নীতি অনেক ভালো। আর শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের টাকা এসে পৌঁছালে নীতি কথার ভাষণ শোনার প্রয়োজন পড়ে না।

তবে নিজের পাতা এই ফাঁদে চীন নিজেই আটকা পড়তে পারে। ছবিটির মূল অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছিল লিউ লেই নামের এক বাস্তব চরিত্র থেকে। ২০০৩ সালে তিনি তার আইটি চাকরি ছেড়ে বাগদাদে গিয়ে একটি রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন। পরে যৌথভাবে লেখা তার স্মৃতিকথা ‘মেকিং মানি এট ডেথস ফিট’-এ দেখা যায়, আসল মানবিক চরিত্রের অধিকারী তিনি ছিলেন না। ছিলেন জাপানের এক তরুণ শান্তি কর্মী। মেয়েটি তার রেস্তোরাঁয় ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করত। প্রতিদিন দুপুরে বেঁচে যাওয়া খাবার কুড়িয়ে সে নিয়ে যেত এতিমখানায়। এই সত্য ঘটনা কিন্তু চীনের সেন্সর বোর্ডের বাধা পার হতে পারত না। সবাইকে বন্ধু বানাতে গিয়ে চীন একটি বড় ব্যতিক্রম ধরে রেখেছে। আর সেটি হলো জাপান। শি জিনপিং প্রায়ই অভিযোগ করেন জাপান নাকি আবার সামরিক শক্তি বাড়িয়ে তুলছে। জাপান যে চীনের মতোই বিশ্বজুড়ে শান্তি চাইতে পারে, এই সহজ সত্যটা চীনা প্রশাসন মেনে নিতে পারে না। আসল কথা হলো, ড্রাগন রেস্তোরাঁ কূটনীতিতে কোন সত্যটা কীভাবে পরিবেশন করা হবে, তা চীন নিজেই ঠিক করে দেয়।

দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে

এক ভিসায় ঘোরা যাবে মধ্যপ্রাচ্যের ৬ দেশ

৯/১১ জাদুঘরে যুক্তরাষ্ট্রের শোকের প্রদর্শন, অনুপস্থিত প্রকৃত ইতিহাস

আত্মবিশ্বাসেই এগিয়ে যাচ্ছেন নারী চালকেরা

নিকলী হাওরে নৌকা বাইচ, দর্শনার্থীদের ঢল

মহাখালীতে একটি ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৩ ইউনিট

এক ভিসায় ঘোরা যাবে মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দেশ

ঢাকায় বৃষ্টির আভাস, কমছে না ভ্যাপসা গরম

৭৮ বছর ধরে এক পরিবারই উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায়

হানিট্র্যাপে ফেলে শিক্ষককে জিম্মি, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪

সুঁইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনছেন আত্মপ্রত্যয়ী ফাতেমা