হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

মক্কার ছায়ায় বাংলাদেশ : নিরাপত্তা, স্বার্থ ও ভূরাজনীতি

শাহীদ কামরুল

গবেষণার পাতালঘরে ডুবে থাকলে সময় কখন যে কালি হয়ে কাগজে ঝরে পড়ে, তার হিসাব থাকে না; আর পাঠকদের অনুরোধগুলো জমে থাকে মনের দরজায় একের পর এক নীরব কড়া নাড়ার মতো। বেশ কয়েক দিন সেই কড়া নাড়ানি শুনেও কলমকে অবকাশ দিতে পারিনি। আজ অবশেষে কলম হাতে নিতেই নোবেলজয়ী ফরাসি ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক আলবেয়ার কামু তার বিখ্যাত উপন্যাস দ্য প্লেগের (The Plague) কথা ইয়াদে এলো, যাতে ওরান শহরে মহামারির প্রাদুর্ভাবের কাহিনির মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি অভিন্ন সংকট বিচ্ছিন্ন মানুষদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও কালেকটিভ অ্যাকশনের (Collective Action) দিকে ঠেলে দেয়। সংকট মোকাবিলায় চরিত্রগুলো যখন একসঙ্গে দাঁড়ায়, তখন সংহতি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান শক্তি। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক : সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কি অভিন্ন নিরাপত্তা-উদ্বেগের কারণে এমন এক সংহতি গড়ে তুলছে, যা তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াবে? তবে Camus-এর কাহিনি আমাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে সংকট মানুষকে একত্র করলেও, সেই ঐক্য কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তব সহযোগিতার ওপর।

যাই হোক, বোধ করি মক্কা ও শুক্রবারকে বেছে নেওয়া সম্ভবত নিছক আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর মধ্যে গভীর ধর্মীয় প্রতীকী, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। রিয়াদ সৌদি আরবের রাজনৈতিক রাজধানী হওয়ায় সেখানে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে উদ্যোগটি অনেক বেশি সৌদি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বলে মনে হতে পারত। বিপরীতে মক্কা, কাবা এবং ইসলামের পবিত্রতম স্থান হিসেবে চুক্তিটিকে বৃহত্তর উম্মাহ, ইসলামি সংহতি ও সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। একইভাবে শুক্রবার বা জুমার দিন মুসলিমদের সাপ্তাহিক সম্মিলিত নামাজের বিশেষ দিন হওয়ায় এর ধর্মীয় তাৎপর্য আরো বৃদ্ধি পায়। ফলে মক্কা ও শুক্রবারের এই সমন্বয় সাধারণ সামরিক জোটের পরিবর্তে চুক্তিটিকে একটি বৃহত্তর ইসলামি রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপনের শক্তিশালী প্রতীকী প্রভাব সৃষ্টি করে। তবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মক্কা ও শুক্রবার নির্বাচন চুক্তিটির রাজনৈতিক বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণের একটি কৌশলও হতে পারে। কারণ স্থান ও সময়ের ধর্মীয় মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের আবেগগত গ্রহণযোগ্যতা এবং চুক্তির প্রতি সামগ্রিক সমর্থন আরো শক্তিশালী করা সম্ভব। ফলে সেখানে তিন রাষ্ট্রের নেতাদের একত্র হওয়া শুধু কূটনীতির কোনো প্রতীকী ব্যাপার (Diplomatic Symbolism) নয়, বরং একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় উম্মাহ এমন একটি কমিউনিটির (Community) ধারণা, যা জাতি, ভাষা ও রাষ্ট্রীয় সীমানার ঊর্ধ্বে একটি বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিশেষত ওয়েস্টফালিয়ান সিস্টেম (Westphalian System) রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বকে (Territorial Sovereignty) রাজনৈতিক জীবনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মক্কা চুক্তির বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি এই দুই ধারণাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র ( Sovereign State) কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা নিজেদের একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

ইসলামের ইতিহাসে রাজনৈতিক ঐক্যের ধারণা কখনোই সরল ছিল না। উম্মাহ একটি নৈতিক ও ধর্মীয় কমিউনিটি হিসেবে মুসলমানদের একত্র করেছে, কিন্তু মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর ইতিহাসে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, রাজবংশীয় দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং মতাদর্শগত বিভাজনও ছিল। উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানি, সাফাভি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক মুসলিম শক্তির ইতিহাস দেখায় যে একই ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দূর করে না। বরং কখনো ধর্মীয় পরিচয়ই রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হয়েছে। মক্কা চুক্তিকে তাই একটি নতুন ইসলামি ঐক্যের সূচনা বলার আগে দেখতে হবে, তিন রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ কোথায় এক হয় এবং কোথায় বিচ্ছিন্ন হয়।

এখন আসি বাংলাদেশের বিষয়ে, বাংলাদেশ বর্তমানে এই চুক্তির সদস্য নয়। তবে ২৫ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান এবং ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় সুবিধা হতে পারে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি। তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি ও শিল্প, পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সামর্থ্য একত্রে বাংলাদেশের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন, সামরিক গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে বাংলাদেশ শুধু অস্ত্র আমদানিকারক না হয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার দিকে এগোতে পারে, যা একই সঙ্গে প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন বাড়াবে।

দ্বিতীয়ত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবন্দর, জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক খনিজ ও নীল অর্থনীতি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তুরস্কের নৌ-প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামুদ্রিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের সক্ষমতা যুক্ত হলে জলদস্যুতা, অবৈধ পাচার, সামুদ্রিক নজরদারি ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়তে পারে। তৃতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো, ব্যাংকিং, বন্দর এবং সরকারি তথ্যব্যবস্থা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চতুর্থত, সন্ত্রাসবাদ, মানব পাচার, অস্ত্র পাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। তবে এসব সহযোগিতায় মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

পঞ্চমত, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক নিরাপত্তায় লাভবান হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও বাস্তুচ্যুতির মতো সংকটে সামরিক এবং মানবিক সক্ষমতার সমন্বিত সহযোগিতা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তাকে এই কাঠামোর শুধু সুবিধাভোগী নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারীও করে তুলতে পারে।

ষষ্ঠত, এই কাঠামো বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে। ফিলিস্তিন, গাজা, ইসলামোফোবিয়া, মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক শান্তির মতো বিষয়ে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে পারে। তবে এজন্য বাংলাদেশকে কোনো রাষ্ট্রের অনুসারী না হয়ে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

সপ্তমত, অর্থনৈতিক সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ, তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে মক্কা কাঠামো যদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাইরে বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে। অষ্টমত, সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা, পরিশোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারে। নবমত, একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক দরকষাকষির বাড়াতে পারে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইরানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হতে পারে।

তবে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারত। পাকিস্তান যেহেতু চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশ একই সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোয় প্রবেশ করলে ভারত এটিকে কৌশলগতভাবে সন্দেহের চোখে দেখতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারতের সম্ভাব্য অসন্তোষের কারণে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থও বিসর্জন দেওয়া কখনোই উচিত নয়। এখানে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সদস্যপদ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে লাভজনক কি না। এটিই হবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ভারসাম্য প্রয়োজন। বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা পেয়েছে এবং পশ্চিমা বাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মক্কা চুক্তি যদি ভবিষ্যতে কোনো বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই চুক্তিতে প্রবেশের আগে নিশ্চিত করতে হবে যে এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি সীমাবদ্ধ করবে না।

আদতে, ইরানের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এই সমীকরণকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এই কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে চুক্তিটিকে শুধু সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান বনাম ইরান হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে এবং বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকিও কমতে পারে। কিন্তু ইরান বাইরে থেকে গেলে এবং চুক্তি বাস্তবে ইরানবিরোধী নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠবে। তাই ইরানের অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে সতর্ক থাকা উচিত।

আরেকটি মৌলিক ঝুঁকি হলো অন্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, তুরস্কের কোনো আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত কিংবা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো রাষ্ট্রের যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ কি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়বে? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না করে কোনো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করা বিপজ্জনক। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির শর্ত হওয়া উচিত : কোনো সদস্যের নিজস্ব বা দ্বিপক্ষীয় সংঘাতে অন্য সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়াবে না। শুধু সরাসরি বহিরাগত সশস্ত্র আক্রমণের ক্ষেত্রে যৌথ প্রতিরক্ষা (Collective Defence) কার্যকর হবে।

এখানে পরমাণু অস্ত্রের রাজনীতি (Nuclear Politics) ও উপেক্ষা করা যায় না। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হলেও বাংলাদেশ পারমাণবিক অস্ত্রের রাষ্ট্র নয়। তাই মক্কা কাঠামো যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশকে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা বা পারমাণবিক সামরিক নীতির অংশ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও প্রচলিত সামরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় যুক্ত হওয়া নয়। এই পুরো বিষয়টি ক্লাসিক্যাল রিয়েলিজম (Classical Realism) দিয়ে দেখলে মূলনীতি হবে জাতীয় স্বার্থ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ শুধু সামরিক শক্তি নয়; অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, সমুদ্র, জনগণের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বাধীনতাও এর অংশ। আর স্টাকচারাল (Structural Realism) মনে করিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জোট গঠন করে; কিন্তু অফেন্সিফ রিয়েলিজম (Offensive Realism) থেকে দেখা যায়, এক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্যোগ অন্য রাষ্ট্রের কাছে হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে, ফলে নিরাপত্তার উভয় সংকট (Security Dilemma) সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এই বাস্তবতাকেই নির্দেশ করে।

অন্যদিকে আলেকজান্ডার ওয়েন্ডটের (Alexander Wendt) গঠনবাদ (Constructivism) দেখায় যে রাষ্ট্রের স্বার্থ শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না; পরিচয় ও পারস্পরিক ধারণাও তা নির্মাণ করে। ইরানকে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে চুক্তির রাজনৈতিক অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

তাছাড়া ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর পাওয়ার ও নলেজ (Power/Knowledge) ধারণা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে আসে : ‘হুমকি’ আসলে কীভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে? যদি চুক্তির নিরাপত্তা-ভাষ্য ইরান বা অন্য কোনো রাষ্ট্রকে স্থায়ী হুমকি হিসেবে নির্মাণ করে, তাহলে জোটটির রাজনৈতিক চরিত্র এক ধরনের হবে; আর যদি এর লক্ষ্য হয় বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পারস্পরিক নিরাপত্তা, তাহলে চরিত্র হবে ভিন্ন। রাজনৈতিক জোট অনেক সময় পরিচয় নির্মাণ করে ‘কে আমাদের পক্ষে’ এবং ‘কে আমাদের বিপক্ষ’ এই বিভাজনের মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের অন্ধভাবে সদস্য হওয়ার আগে এ চুক্তির বাস্তব কাঠামো, ইরানের অবস্থান এবং সদস্যদের পারস্পরিক সামরিক বাধ্যবাধকতা ওয়াকিবহাল হওয়া জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেন চুক্তির কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুতায় পরিণত না হয়। বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত শক্তি শুধু সামরিক ক্ষমতায় নয়; তার ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগর, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে (Strategic Autonomy)।

অতএব, প্রশ্নটি শুধু বাংলাদেশ মুসলিম দেশ কি না বা তার মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত কি না, তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো : বাংলাদেশ কি এই কাঠামোর মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারবে কি না এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে কি না? যদি পারে, তবে মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ; আর যদি তা না পারে, তবে দূরত্ব বজায় রেখে সহযোগিতা করাই অধিক বিচক্ষণ।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে কিছু কণ্ঠস্বরকে আজকাল এমন মনে হয়, যেন তারা নিজের জানালা দিয়ে নয়, অন্যের জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখেন। মুখগুলো আলাদা, ভাষা আলাদা, পরিচয় আলাদা; অথচ শব্দের ভাঁজ খুললেই কখনো কখনো একই রাজধানীর ছায়া দেখা যায়। ভারতের সফট পাওয়ারের (Soft Power) সবচেয়ে সূক্ষ্ম শক্তি হয়তো এখানেই : সবসময় দরজায় কড়া নাড়ে না, কখনো মানুষের চিন্তার ঘরে নিঃশব্দে একটি আয়না বসিয়ে দেয়, যেখানে নিজের মুখের বদলে অন্যের স্বার্থ প্রতিফলিত হতে থাকে। সংবাদ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক, কূটনৈতিক মন্তব্য কিংবা মতামতের বাজারে সেই প্রতিফলন যখন বারবার ফিরে আসে, তখন তা ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক সত্যের’ পোশাক পরে নেয়। কিন্তু মুখোশের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, একসময় মুখ আর মুখোশের পার্থক্যটিই মুছে যায়। তাই ব্যক্তিকে গালি দিয়ে নয়, তাদের বয়ানের শিকড় কোথায় প্রোথিত, সেটি খুঁজে দেখা জরুরি। প্রশ্ন করতে হবে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যখন একদিকে আর দিল্লির উদ্বেগ যখন, অন্যদিকে তখন তাদের দাঁড়িপাল্লা কোন দিকে নুয়ে পড়ে? কেন বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের (Strategic Autonomy) কথা উঠলেই আতঙ্কের ঘণ্টা বাজে অথচ বিদেশি স্বার্থের চাপকে অনেক সময় ‘বাস্তববাদ’ বলে সাজানো হয়? অবশ্যই প্রতিটি ভারত-সমর্থক মতামতকে ষড়যন্ত্র বলা যেমন অজ্ঞতা, তেমনি বিদেশি স্বার্থের অনুকূল বয়ানকে (Narrative) নিরপেক্ষ সত্য বলে গ্রহণ করাও আত্মপ্রবঞ্চনা। রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা শুধু সীমান্তে পতাকা ওড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতা মানে নিজের জাতীয় স্বার্থের মানচিত্র নিজে আঁকার অধিকার। তাই বাংলাদেশের কূটনীতির কম্পাস (Compass) দিল্লির চোখে নয়, ঢাকার স্বার্থে স্থির হওয়া উচিত। কারণ অন্যের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পথ চলা যায়, কিন্তু নিজের পথ তৈরি করা যায় না; আর যে জাতি নিজের আয়নায় নিজের মুখ চিনতে ভুলে যায়, একদিন তার হয়ে অন্যরাই তার পরিচয় লিখে দেয়।

‘ঝড়ের কাছে মাথা নত নয়,

নিজের হাল নিজেই ধরো;

অন্যের আঁকা দিগন্ত নয়,

নিজের আকাশ নিজেই গড়ো।’

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

sahidkamrul25@gmail.com

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনেই ১৮ হাজার আবেদন

স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

বিশকেক ঘোষণায় সই করলেন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার নেতারা

কুয়েতে হামলায় মার্কিন সেনা নিহত ও ড্রোন ধ্বংসের দাবি ইরানের

অনুশোচনা না করা পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চলবে: ইরান

অডিট রিপোর্টের গুণগত মান বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে

আঞ্চলিক সংকটের মূল কারণ ইরানে আগ্রাসন: শাহবাজ শরীফ

সার মজুদের দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা: এশিয়ার শেয়ারবাজারে পতন, বেড়েছে তেলের দাম

‘গেরুয়া গুন্ডামি’ শিরোনাম ঘিরে উত্তেজনা, আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে হামলা