হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নিঃশব্দ অভিমান, নাকি সামাজিক বৈকল্য

অধ্যাপনা ছেড়ে শুল্ক কর্মকর্তা

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস

জেমিনি দিয়ে ছবি তৈরি

শিক্ষকতা মহান পেশা, যেখানটায় সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতার বিকাশ এবং উৎকর্ষসাধনে ভূমিকা রাখার যথেষ্ট সুযোগ থাকে। অতীতে কুলীন ও অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা শিকড়ের টানে দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে শিক্ষার আলো জ্বালাতে নেশায় বুঁদ হয়ে কাজ করতেন, যেখানে কদর ও সম্মান ছিল আকাশচুম্বী। অর্থবৈভব অনেকটা গৌণ ছিল। শিক্ষকদের অনেক মর্যাদা। কেননা স্বয়ং মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। এ যেন এক বিশাল পাওয়া। অথচ আজ মেধাবীদের এ পেশার প্রতি নাক সিটকানো ভাব। অনাদর, অবহেলা, অসম্মান কিংবা আলগা ক্ষমতার অনুপস্থিতিই কি ক্রীড়নক? দেশ ও সমাজ কি বিপরীত দিকে হাঁটছে? এসব কীসের আলামত? শেষজীবনে এসেও একজন অধ্যাপকের সুযোগ পেয়েই প্রারম্ভিক ক্যাডারে ফিরে যাওয়ার আকুতি! এসব কি নিছক ব্যক্তির লালসা, লোভ; নাকি বঞ্চনা-গ্লানির নীরব প্রতিবাদ?

এ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪ মে’র এক প্রজ্ঞাপন দেখে চোখ খানিকটা ছানাবড়া হয়ে গেল। বিসিএস সাধারণ শিক্ষায় কর্মরত চতুর্থ গ্রেডের অধ্যাপক, যিনি কিনা ২৭তম বিসিএসের হয়েও নবম গ্রেডে শুল্ক ও আবগারির সহকারী কমিশনার পদে ফিরতে চান। এখানটায়ই বিপত্তি। কীসের লাভে বা যন্ত্রণায় ইউটার্নের আকুতি? সমাজ ও রাষ্ট্র কি শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়নে অবহেলা করছে? পাছে কার লাভ? শিক্ষাকে অবমূল্যায়িত করে কি কাঙ্ক্ষিত আগামী বিনির্মাণ করা সম্ভব? বিসিএসে অন্য ক্যাডারদের মতো পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মৌখিক সব ধাপ শেষ করেই শিক্ষা ক্যাডারে চাকরিতে শিক্ষকদের যোগদান করতে দেখা যায়। চোখে-মুখে স্বপ্ন। অথচ যোগদানের পরতে পরতে মোহভঙ্গের অভিব্যক্তি, কিন্তু কেন? আমলাদের খবরদারি, দাপট, ক্ষমতাচর্চা ও সবার মাতব্বরি কি শিক্ষককে হতাশ এবং হীনম্মন্য করে ফেলে, যা হওয়ার কথা ছিল না। বিশেষত প্রশাসন ও পুলিশের প্রতি সরকার ও সমাজের আলাদা টান এবং সব সুবিধা নিজের করে নেওয়ার হেকমত শিক্ষকদের মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত করে ফেলে। পদোন্নতি-বিড়ম্বনা আমলাদের লালফিতার কবলে পড়ে হাপিত্যেশ ভাব, যা শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক বৈকল্যের ইঙ্গিত করে। অন্য ক্যাডারে সামাজিক মর্যাদা, গাড়ি-বাড়ি, অবৈধভাবে ফুলেফেঁপে ওঠার সুযোগ, ক্ষমতার কাছাকাছি ঘেঁষার নেশা এবং খবরদারির মস্ত সুযোগ রয়েছে। এসব কি শিক্ষায় সংশ্লিষ্টদের মনে অপ্রাপ্তি, অনাদর ও প্রলেতারিয়েতের মনোভাব তৈরি করছে, যা জাতিকে নেতিবাচক প্রবণতার দিকেই ধাবিত করছে।

শিক্ষকদের চাওয়া কি খুব বেশি? সম্মান-ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকা মূলত স্বাভাবিক চাহিদা। সময়মতো পদোন্নতি, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য কমানো, ক্যাডার মর্যাদা এবং হয়রানিমুক্ত জীবনই তাদের চাওয়া। গাড়ি-বাড়ি, প্রভাব—এসবের প্রতি তাদের অনাগ্রহ। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পাদটীকা’ গল্পেই এটি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। দেখা যায়, ইংরেজ লাট সাহেব স্কুল পরিদর্শনে পণ্ডিতমশাইকে সামান্য সৌজন্য দেখাতেই গুরুজি যে কতটা আপ্লুত হয়েছিলেন। ‘লাট সাহেব এলেন...। হ্যালো পানডিট বলে সাহেব হাত মেলালেন। রাজসম্মান পেয়ে পণ্ডিতমশাইয়ের সব যন্ত্রণা লাঘব হলো।’ এতেই বোঝা যায়, শিক্ষকসমাজ কেবল অর্থসংকট নয়, সম্মানহীনতার আকালে কতটা ব্যথিত। অথচ সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা এখানটায় শিক্ষকদের ন্যূনতম সম্মান দিতে আপত্তি জানায়। কীভাবে অবহেলা করে মানসম্মত শিক্ষা আশা করা যেতে পারে?

শিক্ষকতা, কারিকুলাম—এসব নিয়ে নিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। প্রাথমিক থেকে টারশিয়ারি সর্বত্র হাহাকার। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের কথা বলা হলেও তা কেবল কিতাবে আছে, বাস্তবে অধরাই রয়ে গেল। প্রতিনিয়ত শিক্ষকদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং কর্তাব্যক্তিদের অপেশাদার মনোভাব, যা কিনা এ পেশার প্রতি বিরক্তি তৈরিতে রসদ জোগাচ্ছে। জাতীয় বেতন স্কেলেও অধ্যাপনা পেশার অবনমন, অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেডের ওপরে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ; অথচ নন-ক্যাডারদেরও তৃতীয় গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর প্রাথমিকে সাবেক আমলের তৃতীয় শ্রেণির তকমা। প্রশাসন ও পুলিশে পদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতির হিড়িক, অথচ শিক্ষায় প্রমোশন যেন সোনার হরিণ। এসবই শিক্ষকদের মন বিষিয়ে তুলছে।

শিক্ষকেরা ধোয়া তুলসীপাতা নন—এ সমাজেরই মানুষ। অন্য পেশার চাকচিক্য, কদর, বিত্তবৈভব, ক্ষমতার চর্চা, লোভ-লালসা ও পুকুরচুরির হাতছানিও তাদের পেশা পরিবর্তনে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। এখানটায় সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সারের তাত্ত্বিক অনুভূতি যদি অনুধাবন করি, তাহলে সত্যটা বেরিয়ে আসবে। এ তত্ত্বে তিনি সমাজকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দেহের সব অংশের কার্যকারিতা এবং স্বাভাবিক আচরণের মাঝেই সুস্থতা। সমাজও সামনে আগায় তার নিয়ম-নীতি এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর এবং প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান পরস্পর নির্ভরশীল। সমাজের সর্বত্র জবাবদিহিতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা, ঘুস, দুর্নীতি, অবৈধ ক্ষমতাচর্চা এবং রাতারাতি বড় হওয়ার বাসনা শিক্ষকদের মাঝেও সংক্রমিত হচ্ছে। ফলে সুযোগ পেলেই তারা ডিগবাজি দিতে চান। এসবই মূলত নিম্ন গ্রেডে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

শিক্ষকেরা এ সমাজেই বাস করেন। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি—চারদিকে অনিয়ম-অসংগতি। এসবে শিক্ষকেরাও গা ভাসাতে চান। বিত্তবৈভব, সম্মান, প্রতিপত্তি—এসবের টানে অন্ধকার পথেও অনেকে আখের গোছাতে চান। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং বড়লোক হওয়ার সহজ সুযোগের লোভেও অনেককেই আজ শিক্ষকতা থেকে মুখ ফেরাতে দেখা যায়। অথচ ইমাম গাজ্জালি (রা.) বলেন, শিক্ষকতা হলো মানুষের আত্মার চিকিৎসা। শিক্ষক যদি সঠিক হন, তাহলে সঠিক পথে সমাজ পরিচালিত হওয়ার কথা। এখানটায় রাষ্ট্রের উদাসীনতার কবলে এ পেশার মানুষজনের মাঝে অস্থিরতা, হীনম্মন্যতা ও মানসিক অশান্তি ক্রমাগত বাড়ছে, যা কাঙ্ক্ষিত প্রজন্ম বিনির্মাণে অশনিসংকেত। শিক্ষায় গুণগত বিনিয়োগ খুব জরুরি। বিশ্বায়নের এ যুগে সামনে এগোতে হলে শিক্ষকদের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা প্রয়োজন। এ দায় সবার! এসব নিশ্চিত করা গেলে প্রারম্ভিক গ্রেডে অবনমনের প্রবণতা কমবে।

লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ক্ষতিগ্রস্ত ভাটির দেশ, উজানে খাপছাড়া সুর

শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে বিতর্ক কতটুকু যৌক্তিক

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর মালয়েশিয়ায়, কেন তাৎপর্যপূর্ণ

ইসলামী ব্যাংক দখল ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসন

পরিবার থেকেই শুরু হোক সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকাশ

হজ যখন যুদ্ধবিরতির মাধ্যম

অসম্পূর্ণ বিপ্লব ও ফ্যাসিস্ট শাসনের শিকড়

হাওরের কৃষকদের দুর্ভোগ ও করণীয়

শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয় ও মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা