হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : প্রশ্নবিদ্ধ নতুন কমিটি

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা

হাসপাতালের ডাক্তার রোগীকে মৃত ঘোষণা করার পর স্ট্রেচারে সাদা চাদরে ঢেকে মৃত ব্যক্তিকে মর্গে নেওয়া হচ্ছিল। হঠাৎ চাদর সরিয়ে মৃত ব্যক্তি হাসপাতালকর্মীকে প্রশ্ন করল, কোথায় নিচ্ছো আমাকে? বিস্মিত হাসপাতালকর্মী উত্তর দিলেন, মর্গে। মৃত ব্যক্তির পরবর্তী প্রশ্ন, কিন্তু কেন? আমি তো মারা যাইনি। কণ্ঠ শুকিয়ে আসা হাসপাতালকর্মীর উত্তর, ডাক্তার বলেছেন আপনি মারা গিয়েছেন। মৃত ব্যক্তি এবার সোজা হয়ে বসে বললেন, কিন্তু আমি তো বলছি আমি বেঁচে আছি। হাসপাতালকর্মীর একই উত্তর, ডাক্তার বলেছেন, আপনি মৃত।

সেই ‘মৃত’ ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত মর্গ থেকে পালিয়েছিলেন কি না জানা যায়নি কিন্তু ডাক্তার-প্রদত্ত মৃত্যুসনদটির পরিবর্তন হয়নি। যেমনটি ঘটেছে রোহিঙ্গাদের বেলায়। তাদের পরিচয়ের যে প্রত্যয়ন তাদের দেশের সরকার একবার দিয়েছে, তা আজ পর্যন্ত অপরিবর্তনশীল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে একটু একটু এবং ১৯৬২ সালে জাতীয়তাবাদী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নে উইনের সরকার পূর্ণমাত্রায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ‘বিদেশি’ ও ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে বংশানুক্রমে সে দেশে বাস করা রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের ব্যবস্থা করেছে। যতই রোহিঙ্গারা বলুক তারা মিয়ানমারের অধিবাসী, মিয়ানমার সরকারের কাছে তারা ভিনদেশি। আরাকান আর্মির কাছেও তাই এবং বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও মিয়ানমারের এই প্রত্যয়নের প্রতিবাদ করেনি। রোহিঙ্গাদের দুঃখে তারা আহা-উহু করেছে, অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে এ নিয়ে দুটো কথাও বলেনি। বাংলাদেশও আলোচনার টেবিলে মিয়ানমারকে বলতে পারেনি নিজের দেশে ফেরার জন্য আবার কীসের পরিচয় ভেরিফিকেশন? মিয়ানমারের এই বয়ানে অটল থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দরজা প্রায় বন্ধ হওয়ার পেছনে অন্যতম একটি কারণ।

নিজ দেশে গণহত্যা ও জাতিসত্তা নিধনের শিকার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে পেয়েছে দুটো পরিচয়। তাদের একটা অংশ, যারা প্রায় কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে, ‘শরণার্থী’ এবং অন্য অংশ, যারা ২০১৬-১৭ এবং তারপরের সময়ে এসেছে, ‘এফডিএমএন’ (Forcefully Displaced Myanmar Nationals)। কীসের ভিত্তিতে, কোন নীতির আলোকেÑকেউ জানে না। কেন তারা আশ্রয় পেল সবাই, কিন্তু শরণার্থী পরিচয় পেল কেউ কেউ? কেন একই জনগোষ্ঠীর মানুষকে দুটো ভাগে বিভক্ত করা হলো? কোন নীতির ভিত্তিতেই বা অফিশিয়ালি শরণার্থী না হয়েও রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে ত্রাণসহায়তা পাচ্ছে? দাতা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া ত্রাণনির্ভর কার্যক্রম রোহিঙ্গাদের বাঁচিয়ে রেখেছে বটে, কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যাকে যে শরণার্থীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে অনেক আগেই এবং এর ফলে যে নানা বিরূপ প্রভাব শুধু কক্সবাজার নয়, সারা দেশেই পড়ছে, তা কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে? আর এত প্রশ্নের মধ্যেই গত হয়েছে গণহত্যার ৯টি বছর।

রোহিঙ্গা ইস্যু অনেক আগে থেকেই ভূরাজনীতি, বাণিজ্যনীতি ও কূটনীতির জটিল জালে জড়িয়ে পড়া এমন একটি ইস্যু, যেখানে মানবিক আচরণের বিষয়টি শুধুই মুখের বুলি।

আমাদের ধর্মীয় অনুভূতির কারণে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতা দেখাতে গিয়ে আমরা নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করেছি ও নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছি। আমরা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয় দিই, আমাদের জেলেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে গেলেও নির্বাক থাকি, আমাদের ভূখণ্ডে মিয়ানমারের ছোড়া গ্রেনেডে আমাদের নাগরিক নিহত হলেও আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ বজায় রাখি।

দ্রুত ও স্থিতিশীল রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের জন্য জাতীয় কৌশল প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি ১১ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। এ বছরের জুলাই মাসে ব্রাসেলসভিত্তিক থিংক-ট্যাংক আইসিজি (International Crisis Group) রোহিঙ্গা বিষয়ে কিছু মন্তব্য ও সুপারিশ প্রকাশ করে, যার পরপরই সরকার জাতীয় কমিটি গঠনে তৎপর হয়। আইসিজির সুপারিশের মধ্যে যেগুলো উল্লেখযোগ্য ছিল, সেগুলো হলোÑ১. একদিকে রোহিঙ্গাদের যেমন স্বাবলম্বী হতে দিতে হবে, অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, ২. আরাকান আর্মি মিয়ানমার-বাংলাদেশে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও রাখাইনের ৯০ ভাগ ভূমি দখলে রাখলেও নাগরিকত্ব ও জনসংখ্যা নিবন্ধন ইত্যাদি সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে বিধায় দুপক্ষের সঙ্গেই বাংলাদেশকে সংলাপে বসতে হবে, ৩. রোহিঙ্গারা যেহেতু ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে কাজ করছে, আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত, ৪. ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং ৫. একটি শরণার্থী নীতি প্রণয়নে তৎপর হতে হবে।

প্রতিটি সুপারিশই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুপারিশগুলো কি এই প্রথমবার কেউ পেশ করল?

রোহিঙ্গা বিষয় নিয়ে যারা দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, তারা ঠিক এ কথাগুলোই আরো জোরালোভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বলে এসেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের পরিচয়ের ভেরিফিকেশন ২০২৬ এ-ও সম্পন্ন হয়নি, ২০২৬-এর রোজার ঈদের আগে তাদের মিয়ানমারে ফিরেও যেতে দেওয়া হয়নি। আজ বিদেশি সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি করে কমিটি গঠন তাই বহুকাল আগে গভীর আফসোসের সঙ্গে বলা ঈশ্বর গুপ্তের সেই অমর বাণীকেই স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে তিনি স্বদেশি ঠাকুর ফেলে বিদেশি অন্য কিছুকে ধরার আমাদের যে জিনগত বৈশিষ্ট্য, সে কথাটি বলেছিলেন ।

জাতীয় সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব নীতিমালা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে নো পলিসি ইজ অ্যা পলিসি নামক সুবিধাবাদী নীতি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সাল পর্যন্ত কাজ করেছে। চাণক্য রাতের পর রাত জেগে যা তৈরি করেছিলেন, তা পরে হয়েছে নেহরু ডকট্রিনের ভিত্তি। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, ‘মালয়েশিয়ার অভিবাসননীতিতে ইসরাইল রাষ্ট্র বা জায়নবাদী শাসনকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এটি বহু বছর ধরে আমাদের অনুসৃত নীতি।’ অর্থাৎ নীতি ছাড়া আদর্শিক অবস্থান পোক্ত হয় না এবং নীতি থাকলেই অন্য রাষ্ট্রের সামনে মাথা উঁচু করে নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থে অটল থাকা যায়। সে কারণে আইসিজির সুপারিশের ভিত্তিতে যদি শেষ পর্যন্ত একটি শরণার্থী নীতির পথে এই কৌশলপত্র আমাদের নিয়ে যায়, স্বাগত জানাই এই কৌশলপত্রকে। কিন্তু এটি প্রণয়নের কমিটি গঠনে আর কী কী করা যেত?

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের কমিটিতে রয়েছেনÑ২. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ৩. পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ৪. অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, ৫. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা, ৬. পুলিশ বিভাগের মহাপরিদর্শক, ৭. জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক, ৮. সীমান্ত রক্ষক বাহিনীর মহাপরিচালক, ৯. বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক, ১০. কমিটির প্রধান সমন্বয়ক সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং ১১. কমিটির সদস্য সচিব ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের মহাপরিচালক। আর এই কমিটিকে সহায়তা করবেন যে পাঁচজন, তারা হলেনÑশরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি), স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) পরিচালক এবং সোশ্যাল স্ট্যাবিলিটি ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর (এসএসআইবি) পরিচালক।

রোহিঙ্গা সংকট এমন বিষয়, এসি রুমে বসে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা কিছু সংবাদ-তথ্য ও পররাষ্ট্র-স্বরাষ্ট্র দপ্তরে কিছু বৈঠকের সংরক্ষিত কার্যবিবরণী পাঠান্তে যার জাতীয় কৌশলপত্র তৈরি অসম্ভব। কিন্তু নিজ বিভাগে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হলেও এই কমিটিতে একমাত্র শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটকে কাছে থেকে প্রত্যক্ষভাবে বোঝার সুযোগ অন্যদের হওয়ার কথা নয়। কৌশলপত্র বলতে হয়তো ‘একটা কিছু’ হবে কিন্তু তার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। যে বিষয়গুলো এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠনে বিবেচনায় রাখা আবশ্যক ছিল এবং এখনো রয়েছে, তার কয়েকটি হলোÑ

এই কমিটিতে উখিয়া ও টেকনাফের প্রশাসনিক/আইনি অভিভাবকদের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন ছিল। প্রতিদিন তাদের রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো না কোনো বিষয়ে মনোযোগ ও সময় দিতে হয়। কিন্তু ঔপনিবেশিক রীতির অংশ হিসেবে মস্তবড় কর্তার পাশে ছোট কর্তার আসন বেমানান, তা সে ছোট কর্তা যত অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ হোন না কেন। সুতরাং স্থানীয় প্রশাসনিক অভিভাবকের এখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ কই? সেই সঙ্গে প্রয়োজন ছিল কক্সবাজারের প্রশাসনিক অভিভাবক তথা জেলা প্রশাসককে অন্তর্ভুক্ত করা। আরো প্রয়োজন ছিল রোহিঙ্গা বিষয়ে যারা গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন ধরে, তাদের সম্পৃক্ত করা। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেমন বিদেশের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে যান, শুধু পদাধিকার খাটিয়ে এবং ফিরে এসে মাঠপর্যায়ে কোনো অবদান তাদের থাকে না, এই ১১ সদস্যের কমিটির ব্যাপারটি অনেকটা তেমন হয়ে গেল না তো?

মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু শঠ ভূরাজনীতি, স্বার্থবাদী বাণিজ্যনীতি ও ব্যর্থ কূটনীতির জটিলতায় আবদ্ধ সংকট নয়, ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি কোন কর্তৃপক্ষ কেমন আচরণ করে, ডায়াসপোরা, দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তিগত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক ও তা কীভাবে তাদের জীবনাচরণকে প্রভাবিত করে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রজন্মভেদে কত ধরনের মনোভাব ইত্যাদি জানা রোহিঙ্গা সংকটকে বোঝার জন্য জরুরি। শুধু নীতিনির্ধারকরা যখন কমিটিতে থাকেন, তখন একই লেন্স দিয়ে সবাই সমস্যাটির একই রূপ দেখেন। সেই দেখায় অনেক কিছু বাদ রয়ে যায়। আর এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের যখন সম্পৃক্ত করা হয়, তখন উভয়ের দেখায় সমস্যাটির নানা রূপ দৃশ্যমান হয়। সমাধানের কৌশলেও তখন ফাঁক থাকে না। জাতীয় মানে পুরো জাতির জন্য বা জাতিকে নিয়ে। জাতীয় কমিটি মানে শুধু সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত কমিটি নয়। কানাডায় শরণার্থীবিষয়ক নীতি তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় আইনপ্রণেতা, কেবিনেট পর্যায়ের পরিকল্পনাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শকদের নিয়ে কাজ করা হয়। তুর্কিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংসদনেতা, অভিবাসন পরিদপ্তর, ইউএনএইচসিআর, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধির সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজকে সম্পৃক্ত করা হয় অপারেশনাল ফিডব্যাক দেওয়ার জন্য।

১৭ বছরের দুঃশাসন এবং দুর্বল কূটনীতির সঙ্গে দুর্বল সামরিক শক্তি আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে বহুগুণ। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দরকার ছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দৃঢ় মেরুদণ্ডসমেত কৌশলী কূটনীতি। মালয়েশিয়ার সাবেক স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদ আল বার বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছিলেন, মিয়ানমারের মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে আগ্রাসী জাতির একটি। কিন্তু এ রকম একটি প্রতিবেশী জাতির সঙ্গে মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতি, নীতি ও কৌশল আমাদের নেই।

২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু রয়ে গেল গুরুত্বহীন হয়ে। অথচ চীনের অঙ্গুলির নির্দেশে অর্থনীতি-রাজনীতি-অস্ত্র সরবরাহ-সংঘাত সবকিছু সম্পন্ন হয় মিয়ানমারে। চীনের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য সহজশর্তে ঋণ, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা, বাণিজ্য সম্পর্ক, চীনা ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে ১৩-খানা, মতান্তরে ১৭-খানা, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলেও আমরা চীনকে বোঝানো দূরের কথা, বলতেই পারিনি যে এবার বাটনটা আসলেই রিসেট করতে হবে নতুবা রোহিঙ্গা নামক অ্যাটম বোমা ফেটে দুর্ঘটনা পুরো এশিয়ায় বিস্তৃত হবে। চীন সব ধরনের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার নীতি অনুসরণ করলেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে রাখে সবার সামনে। অর্থাৎ রাজনীতির চেয়ে তাদের কাছে অর্থনীতির গুরুত্ব বেশি। সে কারণেই মিয়ানমারে তার যাবতীয় বিনিয়োগের একটুও বাধাগ্রস্ত হয়, এমন কিছু সে করবে না। চীন হচ্ছে সে দেশ, যে ২০১৭ সালে জাতিসংঘের আনা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের প্রস্তাবের বিপক্ষে রাশিয়ার সঙ্গে ভোট দিয়েছিল। বাংলাদেশ-চায়না বন্ধুত্ব প্রগাঢ় করার জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনকে পাশে চাইÑগুরুত্বপূর্ণ চীন সফরে এ বার্তাটি সাম্প্রতিক বৈঠকে জোরালোভাবে দিলে কি বিনিয়োগ প্রত্যাখ্যান করে ফেলত চীন? মোটেই নয়। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজি থাকার কথা চীন জানিয়েছে। এতে পুরো খুশি হওয়া যাচ্ছে না এজন্য যে, এ সংকট সমাধানের যে একটি মাত্র পন্থা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে চায়Ñঅর্থাৎ প্রত্যাবাসন, তা চীনের মনঃপূত না হওয়া স্বাভাবিক।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের স্বার্থ ভিন্ন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তাই বাংলাদেশের পাশে কাউকে পাওয়া বিরল। ত্রাণের পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে।

নেতৃত্বহীন, শিক্ষাহীন, রাষ্ট্রহীন একটি জনগোষ্ঠী, যার তরুণদের একটা অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে মাদক পাচারের বাহক হিসেবে, অন্য অংশ হতাশা আর অনিশ্চয়তায় জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধে, তরুণীদের অনেকে কক্সবাজারের হোটেলে কাজ করছে বোরকা পরিহিত যৌনকর্মী হিসেবে, আর শিশুরা বড় হচ্ছে লার্নিং সেন্টারের লক্ষ্যহীন কিছু প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে, যা তাদের স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ দেয় না।

১১ সদস্যের কমিটির কাজটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ত্রুটি হওয়া মানে আগামী কয়েক দশকের জন্য রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জটিলতম পরিস্থিতির বীজ বপন করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত কথাটি তাই কৌশলপত্র প্রণয়নের সময় মনে রাখতেই হবেÑ‘কলস যত বড়োই হউক না, সামান্য ফুটা হইলেই তাহার দ্বারা আর কোনো কাজ পাওয়া যায় না। তখন যাহা তোমাকে ভাসাইয়া রাখে তাহাই তোমাকে ডুবায়।’

লেখক : সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বিকট শব্দে মোটরসাইকেল চালনার কারণে বখাটে কিশোর আটক ও জরিমানা

ফিলিস্তিনের সমর্থনে সানফ্রান্সিসকোতে বিশ্ব শিল্পীদের মিলনমেলা

বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত

অনুর্ধ্ব-২০ দলের কোচ জোন্স বরখাস্ত!

সিদ্ধিরগঞ্জে ছুরিকাঘাতে যুবক খুন

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার

ব্যাটারিচালিত রিকশা কোথায় কতটুকু চলবে, দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করবে সরকার

গভীর সাগরে বৈরী আবহাওয়ায় ট্রলারডুবি, নিখোঁজ ৫ জেলে

লোহাগড়ায় বাসের ধাক্কায় পথচারী নিহত, চালক আটক