হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

শর্টটাইমের লংমার্চ ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি

এম আবদুল্লাহ

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে শনিবার ফেনীর মহিপালে পথসভায় সমর্থকদের একাংশ। ছবি: আমার দেশ

গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য লংমার্চের প্রথম পর্ব শেষ করেছে। বিরোধী জোটের নেতারা বলেছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে এবং ওয়াদা লঙ্ঘন করছে। আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এ সরকারও একই রাস্তায় হাঁটছে। এখনই সতর্ক না হলে এ সরকারের পরিণতিও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই হবে।

শনিবার ভোর ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া বিরোধী জোটের লংমার্চ কর্মসূচি রাত সাড়ে ৯টায় চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি পথসভা করেন বিরোধী জোটের নেতারা। এসব পথসভায় বিপুলসংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী ও উৎসুক মানুষের সমাগম ঘটে।

সাড়ে ১৪ ঘণ্টায় আড়াইশ কিলোমিটারের এ ‘মার্চ’কে সময়ের বিবেচনায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শর্টটাইম বা স্বল্পস্থায়ী ‘মার্চ’ বলা যেতে পারে। এর আগে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি এত কম সময়ে সম্পন্ন হওয়ার নজির নেই। শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া, সরকারের পক্ষ থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থা গতিশীল রাখা এবং মার্চে অংশগ্রহণকারী যানবাহনগুলো সুশৃঙ্খল থাকায় বহরটি মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে।

প্রথমত, স্বস্তির দিক হলোÑলংমার্চ কর্মসূচি ঘিরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে। সরকারের তরফে কোনো বাধা বা বাড়াবাড়ি না করে বরং প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রটোকল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিরোধী জোট প্রথমে ৫ হাজার গাড়ি নিয়ে লংমার্চের ঘোষণা দিলেও পরে জানিয়েছিল, এক হাজার গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে মার্চ করা হবে। শেষ পর্যন্ত জানা গেছে, সাড়ে পাঁচশ থেকে পৌনে ছয়শোর মতো গাড়ি ঢাকা থেকে যাত্রা করে মেঘনা টোল প্লাজা অতিক্রম করেছে। অবশ্য কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে যুক্ত হওয়া গাড়িসহ চট্টগ্রামে হাজারখানেক গাড়ি পৌঁছে থাকতে পারে।

লংমার্চের গাড়িবহর যখন চট্টগ্রামের সিটি গেটের কাছাকাছি, তখন ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ক্ষমতাসীন বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে তিনি বিরোধী দলের কর্মসূচির প্রতি ইঙ্গিত করে হুঁশিয়ারিমূলক কিছু কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।’ বিরোধী জোটের দাবি প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের স্বৈরাচারী সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এসব সমস্যাকে পুঁজি করে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

বিরোধী দল যখন লংমার্চের মতো কর্মসূচি পালন করেছে এবং আরো কয়েকটি লংমার্চের কর্মসূচি দিয়েছে, তখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলমান রয়েছে। লংমার্চের মাত্র একদিন আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক ও খুনসুটির ঝলক দেখা গেছে। লংমার্চের পরদিন গতকালও জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসেছে। সংসদ অধিবেশন চলমান থাকা অবস্থায় এবং সেখানে কথা বলার ‘পর্যাপ্ত’ সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মসূচি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারি দলের আরো কয়েক নেতা। তারা অনুযোগ করেছেনÑজ্বালানি সংকট নিরসনের দাবিতে জ্বালানির অপচয় করে বিরোধী দল লংমার্চের মতো কর্মসূচি পালন করে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিরোধী দল সংসদ ছেড়ে পুরোপুরি রাজপথমুখী হওয়ার কথা ভাবছে। তেমন আভাসই মিলেছে এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে। লংমার্চের সমাপনীতে চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানে বক্তৃতায় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই অধিবেশনে এখনো সংসদে আছি। পরের অধিবেশনে যাব কি না, এখনো নিশ্চিত নই। কারণ, জনগণের অধিকার, জনগণের সমাধান যদি সংসদ থেকে না আসে, এই সংসদ কোনো কাজেই আসবে না। আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, সংসদ-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে।’

আগামী দিনগুলোতে যে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ-অস্থিরতা বাড়বে এবং সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলার কৌশল নিয়েই যে বিরোধী দল এগোচ্ছে, এর আভাস মিলেছে বিরোধীদলীয় নেতার ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়ার মধ্য দিয়েও। ফেনীর পথসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে দাবি মেনে না নিলে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। লালদীঘির ময়দানে তিনি বিএনপির অতীতের আন্দোলনের প্যাটার্ন নিয়ে এক রকম কটাক্ষের সুরে বলেন, আমাদের আন্দোলন ‘ঈদের পরের আন্দোলন’ হবে না। যখন প্রয়োজন তখনই রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তিনি চিড়া-মুড়ি নিয়ে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চের প্রস্তুতি রাখার জন্যও নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। লংমার্চে অন্যান্য স্লোগানের সঙ্গে একটি স্লোগান ছিলÑ‘গ্যাস দেয়, বিদ্যুৎ দেয়, নইলে গদি ছেড়ে দেয়’। একটি নির্বাচিত সরকারের ৭ মাসের মাথায় পতন আন্দোলনের টাইমলাইন বেঁধে দেওয়া ও গদি ছেড়ে দেওয়ার স্লোগান সাধারণ মানুষ কীভাবে নিচ্ছে, সেটিও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

এবার দেখা যাক বিরোধ দলের ছয় দফা দাবি ও তা বাস্তবায়নের সরকারের তরফে উদ্যোগ-আগ্রহ কতটা আছে। বিরোধী জোটের ছয় দফার প্রথম দাবি হচ্ছেÑগণভোটের রায় বাস্তবায়ন। গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে। এ সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব কিন্তু খুব বেশি নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর একটি গেজেটের মাধ্যমে জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়েছিল।

জুলাই সনদে সংবিধানে ৪৭টি পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ধারার ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী পক্ষের অবস্থান প্রায় অভিন্ন। কিছু বিষয়ে বিএনপি যেমন ভিন্নমত পোষণ করে, জামায়াতও কয়েকটি বিষয়ে মতভিন্নতার কথা জানিয়েছিল। সনদে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলার পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রচলিত সব মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হবে; বাংলাদেশের নাগরিকদের জাতীয়তা হিসেবে ‘বাঙালি’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ প্রতিস্থাপিত হবে; সংবিধান সংশোধনের জন্য আইনসভার প্রস্তাবিত নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের প্রয়োজন হবে; তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য জাতীয় গণভোটের প্রয়োজন হবে; সাংবিধানিক অপরাধ সংজ্ঞায়িত এবং সংবিধান সংশোধনে বিধিনিষেধ আরোপ করা সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করা হবে; মূলনীতি হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সামাজিক সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিস্থাপিত হবে।

প্রস্তাবে আরো আছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সংজ্ঞা হিসেবে ‘সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিতকরণ’ নির্ধারণ করা হবে; নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা লাভের অধিকার এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত হবে; জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য শুধু প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে; জরুরি অবস্থার সময় মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না; রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হবে এবং তিনি নিম্নকক্ষের সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন; রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগ দিতে পারবেন; রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করতে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হবে; অপরাধীদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্মতি বাধ্যতামূলক হবে; এক ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না; তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে এবং এটি শাসক দল, প্রধান বিরোধী দল এবং দ্বিতীয় বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত হবে।

জুলাই সনদের সংবিধান সংশোধনবিষয়ক প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, দ্বিকক্ষের আইনসভা প্রবর্তন করা হবে; সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে বণ্টিত ১০০টি আসন নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে; নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনসংখ্যা পর্যায়ক্রমে ১০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে; জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন; ৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করা হবে; জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেকোনো প্রধান আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্য উভয় কক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে; সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে নিয়ে সংসদের দ্বারা গঠিত একটি বিশেষায়িত কমিটির ওপর ন্যস্ত করা হবে; স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।

প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে; আপিল বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতির সংখ্যা প্রধান বিচারপতির প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা একচ্ছত্রভাবে প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে; বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা হবে, প্রতিটি বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করা হবে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা হবে এবং অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে।

সনদে আরো বলা হয়েছে, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধী দল ও দ্বিতীয় বিরোধী দলের নেতা এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিদের তত্ত্বাবধানে ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া হবে; পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হবে এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধানে একটি নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হবে।

সংবিধানের এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের বিরোধ মূলত উচ্চকক্ষ গঠন আসন অনুপাতে না ভোটের অনুপাতে হবে, সাংবিধানিক পদগুলো পূরণে বিরোধী দলের সম্পৃক্ততা, বিচার বিভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া। অন্যসব সাংবিধানিক সংস্কার প্রশ্নের সরকারি ও বিরোধী দল একমত বা প্রায় কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়েছে সংসদের শুরুতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ ২০২৫’-এর মাধ্যমে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে আলাদা শপথগ্রহণের যে কথা ছিল, তা নিয়ে। বর্তমান সংসদের শুরুতে বিরোধী সদস্যরা দুটি শপথ নিলেও সরকারি দলের সদস্যরা তা নেননি।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের পর ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধানের প্রস্তাবিত সংস্কার সম্পন্ন করার কথা গেজেটের মাধ্যমে দেওয়া আদেশে বলা হয়েছিল। এরই মধ্যে সেই ১৮০ দিনও অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই আদেশ অনেকটা তামাদি হয়ে গেছে। বিরোধী দল মূলত এ বিষয়টিকে সামনে আনছে। তাদের ভাষ্য, সরকার ৭০ শতাংশ গণভোটে অনুমোদিত জুলাই আদেশ অমান্য ও উপেক্ষা করেছে। এ অভিযোগের সত্যতা উপেক্ষণীয় নয়। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি বলছেÑতারা জুলাই আদেশ কখনোই মেনে নেয়নি, কিছু আপত্তিসহ জুলাই সনদ সই করেছে। তবে সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমে জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে তারা। কিন্তু বিরোধী দল সংসদে গঠিত সেই সংবিধান সংশোধন কমিটিতে প্রতিনিধি দিতে রাজি নয়। জটিলতা মূলত এখানেই। এখন বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধানের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হলে রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনা যে বাড়তে থাকবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

১১ দলের ছয় দফার দ্বিতীয় দাবি হচ্ছেÑগণহত্যার বিচার। সে দাবি পূরণে সরকারের করণীয় সীমিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। কয়েকটি মামলার রায় হয়েছে। এ মাসে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় হবে। মাত্র দুটি ট্রাইব্যুনালে এতগুলো অভিযোগের বিচার সময়সাপেক্ষ। প্রসিকিউশন টিমকে আরো শক্তিশালী করে সরকার এ ক্ষেত্রে গতি আনতে পারে।

তৃতীয় দফা হচ্ছেÑজ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শনিবারও সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। আমদানি ব্যয় প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে। লুটেরা হাসিনা সরকার দীর্ঘ দেড় দশকে নিজস্ব গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ না নিয়ে কমিশন বাণিজ্যের সুবিধার্থে আমদানি নির্ভর করে যাওয়া বৈশ্বিক সংকটে এখন বেসামাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সামনে শীত মৌসুম এলে এ ক্ষেত্রে চাহিদা কমে আসবে এবং কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। সরকারের গৃহীত উদ্যোগও আরো গতিশীল হতে হবে।

ছয় দফার অন্য তিনটি দাবি হচ্ছেÑদ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। এ তিনটি দাবি বাংলাদেশে চিরন্তন। এসব দাবি কোনো সরকারের পক্ষে সন্তোষজনকভাবে পূরণ করা সম্ভব কি নাÑসে নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে অনেকটা উন্নতি ও সহনীয় রাখা সম্ভব সরকারের আন্তরিকতায়।

মূলত সংবিধান সংস্কার ইস্যুটি সুরাহা হলেই সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান, দূরত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করা যায়। এ ব্যাপারে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ ও উদারতা দেখাতে হবে। বিরোধী দলকেও বাস্তবতার আলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। কার্যকর বিরোধী রাজপথে সক্রিয় থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ৭ মাসের সরকারকে ১০ মাসের মাথায় পতনের আলটিমেটাম দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত। সাধারণত সরকারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে লংমার্চ বা সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেওয়া হয়। কিন্তু এখনই এ ধরনের কর্মসূচি ভোঁতা হয়ে গেলে তা সরকারের জন্য প্রকারান্তরে সুবিধাজনক অবস্থানই তৈরি করে।

বর্তমান সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এখনো পর্যন্ত বিরোধী দলের প্রতি ন্যায্য আচরণ করছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সেখানে বিরোধী দল তাদের দাবি উত্থাপন, বিতর্ক ও সরাসরি উত্তর পাওয়ার সুযোগ পেলে রাজপথে সর্বাত্মক আন্দোলনের ন্যায্যতা কমই থাকবে। এখনই তারেক রহমান গদি ছাড়লে, বিরোধী জোট গদি পেয়ে যাবে বিষয়টা কিন্তু এমনও নয়। দেশি-বিদেশি নানা শক্তি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সুযোগ নিতে চায়। যেকোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পতিত শক্তি আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল কোনো কোনো নিয়ামক শক্তি ঘাপটি মেরে আছে। জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে এখন আওয়ামী লীগের প্রাধান্য সুস্পষ্ট। মিডিয়ায় শেখ হাসিনা অন্তপ্রাণরা মাথা তুলছেন, কণ্ঠ উচ্চকিত করছেন। পানি ঘোলা হওয়ার অপেক্ষায় সীমানার বাইরে পলাতক থাকা খুনি-লুটেরা চক্র। এসব বিষয় মাথায় রেখে সরকার ও বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে চড়া মূল্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে সবাইকে।

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি আ.লীগের সাবেক এমপির প্রতিষ্ঠানের

মায়ামিতে অ্যামাজনের কার্গো বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৫

একীভূত পাঁচ ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আস্থার সংকট ও অস্বচ্ছতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বীমা শিল্প

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ফের পুরোনো ধারায় ফেরার চিন্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

কক্সবাজারে ছয় দিনে ১৪ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার

এআই ব্যবস্থার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান বার্নি স্যান্ডার্স

ডাকসুর মেয়াদ শেষের পথে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

আর্সেনালের প্রত্যাবর্তনের রাতে ম্যানইউর হোঁচট

তানোরে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে গৃহবধূর মৃত্যু