বিবিসির প্রতিবেদন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যখন নিরঙ্কুশ জয় পায়, তখন নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া ছিল উষ্ণ। বাংলায় পোস্ট করা এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৬০ বছর বয়সী বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
তিনি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশী দেশের প্রতি ভারতের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মোদি বলেন, দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ক জোরদার করার জন্য তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে মুখিয়ে আছেন।
মোদির বক্তব্যের সুর ছিল সতর্ক ও ভবিষ্যতমুখী। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর পর দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি হয়েছে, অবিশ্বাস তীব্র হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা হাসিনাকে দিল্লি সমর্থন দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করেন অনেক বাংলাদেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে
সীমান্ত হত্যা, পানি বিরোধ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং উস্কানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরনো অভিযোগ। এরই ধারাবাহিকতায় স্থগিত করা হয়েছে ভিসা পরিষেবা এবং ট্রেন, বাস ও বিমান চলাচল।
দিল্লির জন্য এখন প্রশ্ন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখা নিয়ে নয়, বরং কীভাবে রাখবে তা নিয়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ দমনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সুরক্ষিত রেখে কীভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে আলোচনার বিষয়বস্তু করা থেকে দূরে থাকা যায়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব। তবে এর জন্য সংযম এবং পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, ‘বিএনপি এ লড়াইয়ে থাকা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী। ভারতের জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ বাজি। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন? তিনি স্পষ্টতই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন। তবে এটি বলা যত সহজ, করা ততটা নয়।’
নয়াদিল্লির জন্য, বিএনপি কোনো অজানা দল নয়। ২০০১ সালে তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে যায়। ওই সময় দেশ দুটির সম্পর্ক অস্থিরতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ ছিল।
প্রাথমিক সৌজন্য হিসেবে ভারতের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশরা প্রথম বিদেশি প্রতিনিধি হিসেবে খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানালেও আস্থা ছিল নড়বড়ে। বিএনপি যেভাবে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছিল, তা দিল্লির মনে এমন সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল যে ঢাকা কৌশলগতভাবে ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
ভারতের দুটি স্পর্শকাতর বিষয় তখন দ্রুত পরীক্ষার মুখে পড়ে। এর একটি, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন বন্ধ করা এবং অন্যটি, হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
ওই সময় ভোলা ও যশোরে হিন্দুদের ওপর নির্বাচন-পরবর্তী হামলায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে দিল্লি। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় বিপদ আরো বাড়ে। এসব অস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর জন্য পাঠানো হচ্ছিল বলে কথিত রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কও খুব বেশি ভালো ছিল না। টাটা গ্রুপের প্রস্তাবিত ৩০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ গ্যাসের দাম নির্ধারণ নিয়ে জটিলতায় আটকে যায় এবং ২০০৮ সালে পুরোপুরি ভেস্তে যায়।
এরপর সম্পর্ক আরো অবনতি হতে থাকে। ২০১৪ সালে বিরোধীদলে থাকা খালেদা জিয়া নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন, যেটিকে সরাসরি অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করে ভারত।
এ অস্বস্তিকর ইতিহাসই স্পষ্ট করে যে, কেন ভারত পরে শেখ হাসিনার ওপর এত বেশি বিনিয়োগ করেছিল।
১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে হাসিনা দিল্লির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত চাহিদা পূরণ করেছিল; যার মধ্যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সহযোগিতা, যোগাযোগ জোরদার এবং চীনের পরিবর্তে ভারতের সাথে বিস্তৃতভাবে সম্পৃক্ত হওয়া অন্যতম।
বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করা শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের দমন-নিপীড়নের জন্য মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি এরই মধ্যে এই জটিল পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তারেক রহমান ঘোষণা দেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়; সবকিছুর আগে বাংলাদেশ।’
এই সমীকরণে একটি কেন্দ্রীয় কিন্তু সংবেদনশীল বিষয় ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। হাসিনার পতনের পর ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক মেরামত করতে খুব বেশি সময় নষ্ট করেনি ঢাকা। ১৪ বছরের বিরতির পর গত মাসে সরাসরি ঢাকা-করাচি ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়। এর আগে ১৩ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমবার বাংলাদেশ সফর করেন। এছাড়া ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা সফর বিনিময় করেছেন, নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ২০২৪-২৫ সালে বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট: এক সময়ের শীতল সম্পর্ক (পাকিস্তানের সঙ্গে) এখন উষ্ণ হতে শুরু করেছে।
দিল্লিভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসেস’-এর স্মৃতি পটনায়েক বলেন, ‘বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ নেই। একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের সেই অধিকার আছে। অস্বাভাবিক ছিল, হাসিনার আমলে প্রায় কোনো যোগাযোগ না থাকা। তখন পেন্ডুলাম একদিকে বেশি হেলে পড়েছিল। এখন ঝুঁকি হচ্ছে, এটি অন্যদিকে খুব বেশি হেলে পড়ে কি না।’
ভারতে হাসিনার নির্বাসিত জীবন সম্ভবত যেকোনো নতুন সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অন্তরায়।
স্মৃতি বলেন,‘বিএনপিকে এই বাস্তবতাটি বিবেচনা করতে হবে যে হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা কম। একই সাথে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে চাপ দিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
এটা বিএনপির জন্য মোটেও সহজ হবে না। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ভারতে পালিয়ে গেছে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘দিল্লি যদি ভারতের মাটি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চায়, তবে তা বিপজ্জনক হবে। নির্বাসনে থেকে হাসিনার নির্বাচন-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনগুলো ছিল বিস্ময়কর। তিনি যদি দুঃখ প্রকাশ না করেন কিংবা নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ না দিয়ে নিজেই সব নিয়ন্ত্রণ করতে চান; তবে তা সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলবে।’
এরপর আসে ভারতীয় রাজনীতিক ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর উসকানিমূলক মন্তব্য। এগুলোর কারণে বাংলাদেশে যে বিশ্বাস পোক্ত হয়েছে, তা হলো দিল্লি বাংলাদেশকে নিজেদের সমান সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে না দেখে বরং তাদের অনুগত ‘ব্যাকইয়ার্ড’ বিবেচনা করে।
তবে সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে দুই দেশের মধ্যকার নিরাপত্তা সহযোগিতা। বাংলাদেশ ও ভারত বার্ষিক সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ-টহল ও বার্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ আয়োজন করে। এছাড়া প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ভারতের ৫০ কোটি ডলারের লাইন অব ক্রেডিট রয়েছে।
পটনায়েক বলেন, আমি মনে করি না, বিএনপি সেই সহযোগিতার সম্পর্ক থেকে সরে আসবে। এটি একটি নতুন নেতা, একটি ভিন্ন জোট এবং ১৭ বছর পর ফিরে আসা একটি দল।
সব অস্থিরতার পরেও ভৌগলিক অবস্থান ও অর্থনীতি দেশ দুটিকে আবদ্ধ করে রেখেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ অন্যতম। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার।
বিচ্ছিন্ন থাকা দুই দেশের পক্ষে অসম্ভব। তবে ফাটল ধরা সম্পর্কের জন্য একটি নতুন শুরুর প্রয়োজন।
পালিওয়াল বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে ভারতের অতীতের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং বোঝাপড়ার চেয়ে অবিশ্বাসে ভরা। কিন্তু আজকের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অতীতকে ভবিষ্যতের শত্রু না বানানোর ইঙ্গিত দিয়ে তারেক রহমান যে রাজনৈতিক পরিপক্কতা দেখিয়েছেন এবং দিল্লি যে বাস্তবসম্মত আলোচনার জন্য প্রস্তুত; সেসব ইতিবাচক লক্ষণ।’
এখন প্রশ্ন হলো, প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে।
দত্ত বলেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ভারতের উচিত যোগাযোগ রক্ষা করা। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী নির্বাচন করেছে; এখন আলোচনা করুন, দেখুন আমরা কোথায় সাহায্য করতে পারি। আমি আশাবাদী যে বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে।