জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘জ্বালানি ও জীবনের নিরাপত্তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জ্বালানি খাতে সরকার এখন পর্যন্ত যা করছে, তাতে বড় জোর পপুলিজম দেখা যাচ্ছে; কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রূপরেখা দেখা যাচ্ছে না। সরকার যদি বলে, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, তাহলে সেই পরিকল্পনা জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে। ছয় মাস আগে না বললেও এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের রূপরেখা জানানো জরুরি।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে এত বড় বিদ্যুৎ সংকট দেখা যায়নি। তাহলে হঠাৎ কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে সরকারকে বলতে হচ্ছে, দুই বছরেও কিছু করা সম্ভব হবে না? দুই বছর বিদ্যুৎ সংকট থাকলে দেশের অর্থনীতি, গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্প কীভাবে টিকবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মান্না বলেন, সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। ঢাকা মহানগরের গার্মেন্টস মালিকরা সোলার এনার্জি উৎপাদনের সুযোগ ও অনুমতি চেয়েছেন। তাদের দাবি, এভাবে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার মতো বড় শহরে সোলার প্যানেল স্থাপন করা গেলে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অথচ বর্তমানে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত বিকল্প উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, মানুষের আস্থা ও জনপ্রিয়তা চিরস্থায়ী নয়। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে এর কাফ্ফারা সরকারকেই দিতে হবে।
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে মান্না বলেন, ছয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা থাকলেও একটিও না আসার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে কার দায়িত্বে গাফিলতি হয়েছে এবং কার নির্দেশে কার্গোগুলো আসেনি, তা খুঁজে বের করা উচিত। এখনও সিএনজি পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। এভাবে মানুষ কত দিন দুর্ভোগ সহ্য করবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। জনগণ একসময় সরকারের কাছে এর হিসাব চাইবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডাকসুর সাবেক এই ভিপি। সংসদের সামনে এক শিক্ষিকার মৃত্যু, রংপুরের ঘটনা এবং মিরাজ শেখকে ঘিরে বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় সরকারকে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে মিরাজ শেখকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গুম দিবসে রাষ্ট্রপতির ‘আর কোনো আয়নাঘর হবে না’ বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মান্না বলেন, কেউ অপরাধী হলেও তাকে গুম করে দেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময় পরিস্থিতি গত ১৫ বছরের তুলনায় অনেক ভালো হলেও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলোর সমাধান করা জরুরি।
সরকারের বিভিন্ন কার্ড বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মান্না। তিনি বলেন, সঠিক ডেটাবেজ ছাড়া কীসের ভিত্তিতে এসব কার্ড দেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। প্রকৃত সুবিধাভোগীরা কার্ড পাচ্ছেন কি না, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন। সরকারের ভালো উদ্যোগ থাকলেও তার বাস্তবায়নের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
মান্না বলেন, সরকার যদি জনগণকে জানাত—কোন কারণে এখন জ্বালানি দেওয়া যাচ্ছে না এবং ছয় মাস, নয় মাস বা এক বছর পর কীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি করা হবে—তাহলে মানুষ কষ্ট মেনে নিত। কিন্তু সরকারের পরিকল্পনা ও বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে মানুষের কাছে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই।
সংসদের কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এভাবে চললে সংসদীয় ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গুম প্রতিরোধ আইন ও মানবাধিকার আইন নিয়ে তিনি বলেন, এসব আইনে নিপীড়িত মানুষের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষিত হচ্ছে না। যে পুলিশ বা র্যাবের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ রয়েছে, তাদের দিয়ে গুমের তদন্ত করানো নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। তার মতে, তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন বিশেষ বাহিনী বা বেসামরিক ব্যক্তিদের দেওয়া উচিত।
সরকারের বিভিন্ন অধ্যাদেশ বাতিল ও সংশোধনের প্রসঙ্গে মান্না বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারকদের নিয়োগের প্রক্রিয়া বাদ দেওয়া বা পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। আইন প্রণয়নের সময় বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা না করে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সরকারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব সরকারি ও বিরোধী—উভয় দলের।
নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কবির হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হাসান মামুন, প্রেসিডিয়াম মেম্বার দেলোয়ার হোসেন রাজা, জিন্নুর চৌধুরী দিপু, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ্ কায়সার প্রমুখ।