হোম > রাজনীতি

‘বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা না করে পুরোনো ফরমুলায় মজুরি নির্ধারণ বৈষম্যমূলক’

আমার দেশ অনলাইন

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত জড়িয়ে আছে। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে দেশের শ্রম আইন গঠন করতে হবে।

শুক্রবার বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন রাজবাড়ী জেলা শাখার উদ্যোগে নান্নু টাওয়ার কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট রনজু বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক কবির উদ্দীন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, বিআরইএল কেন্দ্রীয় সভাপতি আক্তারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, কেন্দ্রীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সম্পাদক এসএম শাহজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান সম্পাদক গোলাম রসুল খান, বাংলাদেশ পরিবহন ফেডারেশনের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, উপদেষ্টা হাসমত আলী হাওলাদার, আলীমুজ্জামান প্রমুখ।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সংগঠনের ভূমিকা তুলে ধরে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম শ্রমিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংগঠন দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ, জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার আদায় এবং শ্রমিকের মুক্তির জন্য লড়াই করে আসছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো অর্জন নেই, যে অর্জনের পেছনে শ্রমিকদের ভূমিকা নেই। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সবকিছুর সঙ্গে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত জড়িত।

দেশের বিভিন্ন গণআন্দোলনে শ্রমিকদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ৬৯-এর গণআন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ দেশের ক্রান্তিকালের প্রতিটি আন্দোলনের অগ্রভাগে তারা লড়াই করেছেন। অনেক শ্রমিক জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন। ২৪-এর আন্দোলনে সরকারিভাবে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ৩৫ শতাংশ শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ শ্রমিক জীবন দিয়েছেন।

রাজবাড়ীর কৃষি শ্রমিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজবাড়ী জেলার কৃষি শ্রমিকেরা মাঠে সোনার ফসল ফলান। এই কৃষি শ্রমিকদের উৎপাদিত ফসলের কারণে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা সংসদে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলেন, অথচ যাদের কারণে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তারা দেশের প্রায় দুই কোটি কৃষি শ্রমিক, যারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, এমনকি বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে মাঠে ফসল ফলান।

গার্মেন্টস ও প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মাধ্যমে আমাদের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রয়েছে। বিদেশের শ্রমবাজারে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কঠোর পরিশ্রম করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠান। তারাও শ্রমিক শ্রেণির মানুষ।

তিনি বলেন, দেশের পরিবহন, নির্মাণসহ এমন কোনো খাত নেই, যাদের অবদান ছাড়া দেশ এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে আতিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের একসময় দাসের মতো ব্যবহার করা হতো। তাদের কোনো বিশ্রাম ছিল না, মজুরির কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না। মালিকের অধীনে কাজ করলেও তাদের প্রতি অমানবিক আচরণ করা হতো। সামান্য মজুরিতে একটানা পরিশ্রম করতে হতো। কাজের সময়ের কোনো বালাই ছিল না।

পরবর্তীতে শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৭ ঘণ্টা বিনোদনের দাবিতে আন্দোলন করেন। দাবি আদায়ে অসংখ্য শ্রমিককে জীবন দিতে হয়েছে। এরপর শ্রমিকদের কিছু দাবি বাস্তবায়ন হলেও বাংলাদেশে এখনো বড় একটি অংশের শ্রমিক তাদের ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা থেকে বঞ্চিত। শ্রমিকদের দিয়ে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হয়। রাষ্ট্রের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে শ্রমিককে অবশ্যই ওভারটাইমের মজুরি দিতে হবে।

সম্প্রতি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত মজুরি কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সম্প্রতি শ্রম মন্ত্রণালয় অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য ৬০৫০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকদের জন্য সাড়ে ৭ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করেছে। বর্তমান বাজারদর, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতায় এই মজুরি নির্ধারণ হাস্যকর। একটি পরিবারের মাসিক খরচ কত হতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি কী—এসব বিবেচনা না করে পুরোনো ফরমুলায় মজুরি নির্ধারণ করা বৈষম্য। এ বৈষম্য চলতে দেওয়া যায় না।

চা শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার প্রায় ৪৩টি পেশার শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে। এর মধ্যে চা-বাগানের শ্রমিকরাও রয়েছেন। দেশে যদি দাসপ্রথা দেখতে চান, তাহলে মৌলভীবাজার, সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানগুলোতে যান। সেখানে চা শ্রমিকেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং সেখানে নব্য দাসপ্রথা চলছে।

তিনি বলেন, চা শ্রমিকেরা ২০০৩ সালে ২২ দিনের আন্দোলনের পর মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। বছরে মাত্র আট টাকা করে বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে তারা দৈনিক ১৯৬ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি পাচ্ছেন।

চা শ্রমিকদের জীবনমানের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাবেন, চা-পাতার বাণিজ্য করবেন, বিদেশে রপ্তানি করবেন, কোটি কোটি টাকা আয় করবেন; আর শ্রমিকদের বেতন দেবেন না—এটা হতে পারে না। তারা পুষ্টির অভাবে ভুগবে, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে, তাদের ছেলে-মেয়েরা শিক্ষাবঞ্চিত হবে—নতুন বাংলাদেশে তা আর হতে পারে না।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক খরচ ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা। সেখানে সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করা অমানবিক।’

তিনি আরো বলেন, দেশে কলকারখানা ও শিল্পকারখানা বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি সেভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। মজুরির কথা বললেই ছাঁটাই শুরু হয়ে যায়। এ কারণে ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে চান না।

বিগত সরকারের সময়ে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না উল্লেখ করে আতিকুর রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচারের আমলে আমরা কথা বলতে পারিনি। আজ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাই আমরা কথা বলছি। অধিকার আদায়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো। আমরা কথা বলেই যাব। জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।

শ্রমিকদের স্থায়ী সমস্যা সমাধানে ইসলামী শ্রমনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ দেশের শ্রমিক শোষিত, নির্যাতিত ও অধিকারহারা। আমরা দুনিয়ার কোনো নির্দিষ্ট নীতি-আদর্শকে সামনে রেখে কথা বলছি না। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন মনে করে, শ্রমিকের স্থায়ী সমস্যার সমাধান করতে হলে, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হলে এবং বৈষম্য থেকে শ্রমিকদের মুক্ত করতে হলে ইসলামের শ্রমনীতি দিয়ে বাংলাদেশের শ্রম আইন গঠন করতে হবে। এর মাধ্যমেই শ্রমিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

তিনি বলেন, দুনিয়ার মজদুর এক হও—এই স্লোগান দিয়ে যারা শ্রমিক আন্দোলন করেছেন এবং শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেননি। মানুষের মনগড়া কোনো আইন দিয়ে শ্রমিক সমস্যার সমাধান হতে পারে না। শ্রমিক সমস্যার সমাধান হবে আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে হজরত মুহাম্মদ (সা.) যে শ্রমিক সমস্যার সমাধান করেছেন, সেই নীতির মাধ্যমে। অর্থাৎ ইসলামী শ্রমনীতিই হতে পারে শ্রমিক সমস্যার একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

এআরবি

কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে সরকার বেকার সমস্যাকে প্রকট করে তুলছে: মঞ্জু

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বেসরকারিকরণ বন্ধ করুন: শ্রমিক মজলিস

ইসলামের নীতি-আদর্শে গুণান্বিতদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামের পতাকা উড়বে: চরমোনাই পীর

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের প্রতি মামুনুল হকের আহ্বান

চন্দ্রদ্বীপকে পর্যটনকেন্দ্র গড়ার ঘোষণা এমপি মাসুদের

জনজীবনের জরুরি সংকটে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি

মক্কা চুক্তি জাতীয় স্বার্থে নতুন দিগন্ত খুলবে

‘ছায়া সিটি করপোরেশন প্রশাসন’ গঠনের ঘোষণা সেলিম উদ্দিনের

তৃণমূল দায়িত্বশীলদের যোগ্য হতে হবে: গোলাম পরওয়ার

রেডিওলজি টেকনোলজিস্টদের বিদেশে কর্মসংস্থানে অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে: ডা. রফিক