হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্থার (ওআইসি) যেভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে, ঠিক তেমনি জাতীয় সংসদে আইন পাস করে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এটিই এ দেশের উলামা-মাশায়েখ ও কোটি কোটি তাওহিদি জনতার মূল দাবি।
তিনি শনিবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা ও তাদের প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে’ আন্তর্জাতিক তাহাফফুজে খতমে নবওয়াত বাংলাদেশ আয়োজিত জাতীয় উলামা মাশায়েখ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এ কথা বলেন। সম্মেলনে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ আল-হাবীব।
হেফাজত আমির বলেন, গত ৯ আগস্ট বাবুনগর মাদরাসায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে সময় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মহাসচিব কাদিয়ানীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার এই প্রাণের দাবিটি সরাসরি তার কাছে তুলে ধরেছিলেন। সেই মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই আজ পুনরায় আমরা সরকারের কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো জোরালোভাবে পেশ করছি।
তিনি বলেন, অমুসলিম হিসেবে কাদিয়ানিরা মুসলমানদের ব্যবহৃত ‘মসজিদ’, ‘আজান’, ‘সালাত’ বা ‘খলিফা’র মতো ধর্মীয় পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে পারবে না। একইসঙ্গে সরলমনা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে রচিত কাদিয়ানিদের যাবতীয় বই-পুস্তক, লিটারেচার, ওয়েবসাইট ও প্রচারমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করতে হবে। বক্তব্য শেষে হেফাজত আমির মোনাজাত পরিচালনা করেন।
খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের সভাপতি আল্লামা সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদের বিশেষ অতিথির লিখিত বক্তৃতা পড়ে শোনান তাহাফফুজে খতমে নবওয়াত বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা মুহিউদ্দিন রাব্বানী। পরে তিনি সংগঠনের ঘোষণা পত্রও পাঠ করেন। এতে ৯ দফা দাবি এবং ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষনা করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ।
তিনি বলেন, আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করছি—আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও সর্বশেষ নবী। তার পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না। এটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকিদা এবং প্রতিটি মুমিন-মুসলমানের ঈমানের অপরিহার্য ভিত্তি।
তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের এই সম্মেলনের চেতনা কেবল উলামায়ে কেরামের নয়; বরং তা প্রতিটি তাওহীদী মুসলমানের ঈমানি চেতনা। আকিদা-ই-খতমে নবুওয়তের সঙ্গে আমি পূর্ণ একমত পোষণ করছি।
তিনি বলেন, আজকের এই সম্মেলন থেকে উলামায়ে মাশায়েখের পক্ষ হতে সরকারের কাছে যে সব যৌক্তিক ও ঈমানি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে আমি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে এবং ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ।
ধর্ম মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন ও উলামায়ে কেরামের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উলামায়ে কেরামের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। সরকার আপনাদের এই গুরুত্বপূর্ণ ও ঈমানি দাবিগুলো বিশেষ বিবেচনায় নিবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। অসুস্থ্তার কারণে তিনি এই সম্মেলনে উপস্থিত হতে পারেননি বলে দু:খপ্রকাশ করেন।
হেফাজত আমির বলেন, খতমে নবুওয়ত ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকিদা। হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন ‘খাতামুন নাবিয়্যিন’-সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসের অসংখ্য স্পষ্ট দলিলে প্রমাণিত যে, তার পর নবুওয়াতের পবিত্র দরজা কিয়ামত পর্যন্ত চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি বা অন্য কাউকে নবী হিসেবে বিশ্বাস করা স্পষ্ট কুফরি। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী খাতমে নবুওয়াতের এই মৌলিক আকিদা অস্বীকার করবে, তারা কোনো অবস্থাতেই ইসলামের গণ্ডির মধ্যে থাকতে পারে না। তারা সরাসরি কাফের, এবং যারা তাদের কাফের মনে করে না, তাদের ঈমানও সুরক্ষিত নয়।
তিনি বলেন, অমুসলিম হিসেবে কাদিয়ানিরা মুসলমানদের ব্যবহৃত ‘মসজিদ’, ‘আজান’, ‘সালাত’ বা ‘খলিফা’র মতো ধর্মীয় পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে পারবে না। একইসাথে সরলমনা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে রচিত কাদিয়ানিদের যাবতীয় বই-পুস্তক, লিটারেচার, ওয়েবসাইট ও প্রচারমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করতে হবে।
এ সময় ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করতে আপনাদের সমস্যা কোথায়? আপনারা মুসলমানদের অনুভূতি বুঝতে ব্যর্থ হলে বারবার সমস্যায় পড়বেন। অলিম্বে এই দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানান তিনি।
আল্লামা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশে সালাউদ্দিন আহমদ যে ওয়াদা করেছিলেন, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন বলে এখনো আমরা আশা করি। যদি না নেন, আমাদের সোজা আঙ্গুল বাকা হতে সময় লাগবে না।
সম্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী প্রমুখ।