গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে সরকার দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে অপমান ও প্রতারিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের কবর রচনা করে সংসদের ভেতরেই সবকিছুর ফয়সালা করতে। আমরা রাজপথে আসতে চাইনি; কিন্তু আপনারাই আমাদের বাধ্য করেছেন এখানে আসতে। তিনি বলেন, জনগণের গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটা আমরা আদায় করেই ছাড়ব।
গতকাল শনিবার রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই সমাবেশ ঘিরে লালদীঘি ময়দান ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক জনস্রোত দেখা যায়।
এর আগে গতকাল সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, আমরা জনগণের জন্য রাস্তায় নেমেছি, জনগণের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব ইনশাআল্লাহ।
অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি মানতে সরকারকে কঠোর বার্তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে গতকাল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী এই লংমার্চ কর্মসূচি পালন করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এসব দাবি না মানলে আরো তিন বিভাগে লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশের মাধ্যমে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন শুরু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জোটটি।
গতকাল রাতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে লালদীঘির জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা আরো বলেন, ছয় দফা ১১ দলের কোনো ব্যক্তিগত দফা নয়, এগুলো দেশের জনগণের দফা। অনির্বাচিত সরকার তাদের জান্নাতে পাঠায়নি উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা সে সময় যেমন ছিলেন, এখনো তেমনই আছেন, নেই?
তিনি বলেন, সরকারি দলের লোকেরা এখন চুরি-চামারি ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়েছে। যখন তাদের ধরা হয়, তখন তারা নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক বলে পরিচয় দেয়। এরা গুপ্ত হয়ে আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা যখন লংমার্চের ডাক দিলাম, বিভিন্ন জায়গায় চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়; এটি জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। কেউ যদি বিদায় নেওয়ার রাস্তায় হাঁটে, তাহলে তারা কী দোয়া পড়বেন—এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আগের সরকার যে রাস্তায় বিদায় নিয়েছে, বিএনপিও সেই রাস্তায় হাঁটতে চায় কি না, তা দেখতে হবে।
চট্টগ্রামের মেয়র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মেয়র মেয়াদোত্তীর্ণ। এর নাম কী? এটা হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। তিনি বলেন, বিএনপি ওয়াদা করেছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই দেশ চালাবেন। এখন যাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে, তারা কি নির্বাচিত?
শফিকুর রহমান বলেন, আজকের লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করার জন্য। পরেরগুলো এরকম হবে না। কতগুলো মানুষ মারা গেছে, গুম হয়েছে, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা নেই—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিরোধী দলকে লোভ বা টোপ দিয়ে কেনা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। এই লড়াইয়ে ফ্যাসিবাদ, অপরাধী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ এবং আধিপত্যবাদীরা নিশ্চিতভাবে হেরে যাবে।
বিগত আন্দোলনের শহীদ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, বিগত আন্দোলনে বিপুল মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকেই গুম হয়েছেন এবং আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার পর নিজেদের শিশু সরকার বলে দাবি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয়নি, বরং প্রাপ্তবয়স্ক বিবেচনা করে তাদের ওয়াদা শুনে ভোট দিয়েছে।
সরকারের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জামায়াত আমির বলেন, সরকার একের পর এক উল্টাপাল্টা কাজ করবে আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে—তা হতে দেওয়া হবে না। এখন পর্যন্ত তাদের আঙুল সোজা রয়েছে, তবে প্রয়োজনে তা বাঁকা করতে দ্বিধা করা হবে না।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই দায়ী। তিনি যদি সংসদকে কার্যকর করতেন; তাহলে আমরা সেখানেই থাকতাম। তিনি যদি সংবিধান সংস্কার কমিশনের শপথ নিতেন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতেন; তাহলে আমাদেরকে রাজপথে নামতে হতো না। তিনি সংসদকে অকার্যকর করে রাখায় আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি।
তিনি আরো বলেন, তারেক রহমান আপনিতো কথা বলা বন্ধ রেখেছেন। মাঝেমধ্যে বললেও আপনি ভুল বলে ফেলেন। তাই সালাহউদ্দিন সাহেবকে কথা বলার জন্য রেখেছেন। কিন্তু দেশের জনগণ তার কথা ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাকে দেশের জনগণ বয়কট করেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, যেই সংসদে সালাহউদ্দিন সাহেব একাই সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে পেরেছেন, যিনি একাই সব দায়িত্ব পালন করেন, তিনি নিশ্চয়ই বিরোধী দলের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন। তাই আপনারা সংসদে থাকুন, আমরা জনগণের সঙ্গে রাজপথে থাকি।
দেশের মানুষ ভালো নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট। সরকার সবদিক থেকে ব্যর্থ হয়েছে। আমি সরকারকে বলতে চাই; সময় থাকতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করবেন সেই উদ্যোগ নেন। জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করুন। নয়তো শেখ হাসিনার দুঃশাসন থামাতে মানুষ ১৬ বছর অপেক্ষা করেছে, আমরা আপনার জন্য পাঁচ বছরও অপেক্ষা করব না।
সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, বিএনপি সরকারের পরিবর্তন চান দেশের মানুষ। এই সরকার পরিবর্তন হয়ে চিরদিনের জন্য চলে যাক। সব জায়গায় দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের সঙ্গে বাকশালের কোনো পার্থক্য নেই।
তিনি বলেন, তারা বলেছিল ক্ষমতায় গেলে এক লাখ লোকের চাকরি দেবে। এখন এক লাখ লোকের চাকরি গেছে। মৌলবাদী মানে যারা মূল মন্ত্রে বিশ্বাস করে। আমরা তো উগ্রবাদী নই।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামনুল হল বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে ভোট চেয়েছিল। কিন্তু এখন তাদের মুখ থেকে শুনতে হচ্ছে তারা নাকি নির্বাচন হওয়ার জন্য এসব কথা বলেছিল। এতেই বুঝা যায়, জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এখন আত্মস্বীকৃত মুনাফেক দল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে, সংবিধান সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে।
সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, শাহজাহান চৌধুরী এমপি, জহিরুল ইসলাম এমপি, মহানগর আমির নজরুল ইসলাম, সাবেক এমপি আ ন ম শামসুল ইসলাম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুছা বিন ইজহার, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ সিবগাতুল্লাহ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি প্রমুখ।
এর আগে গতকাল দুপুর থেকেই চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা লালদীঘির ময়দানে আসতে থাকেন। বিকাল তিনটার আগেই সমাস্থল কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়। সমাবেশে নেতাকর্মীরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে সরকারকে আহ্বান জানিয়ে নানারকম প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সমাবেশকে ঘিরে লালদীঘি ও আশেপাশে এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। রাত সাড়ে ৯টায় সমাবেশটি শেষ হয়।
এর আগে গতকাল সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ যাত্রা শুরে করে। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। যাত্রাপথে বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে এসব পথসভা জনসভায় রূপ নেয়।
এসব জনসভায় বিরোধীদলীয় নেতারা বলেন, সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে জাতির সঙ্গে দেওয়া ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। তারা গত ছয় মাসে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও গণহত্যার বিচারে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জনগণের এসব সমস্যার সমাধানে বিরোধী দল সংসদে ও রাজপথে সোচ্চার ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি নিয়ে লংমার্চ বহর চট্টগ্রামের লালদীঘিতে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা হাতে শুভেচ্ছা জানান জোটভুক্ত দলগুলোর স্থানীয় নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন স্থানে লংমার্চের যাত্রীদের জন্য খাবার ও পানি সরবরাহ করা হয়। কর্মসূচি ঘিরে জোটের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ উৎসুক জনতার মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও গাড়ি নিয়ে লংমার্চ বহরে যুক্ত হন। সমাবেশে বক্তব্য ছাড়াও নানা ধরনের সংগীত পরিবেশন করে বিভিন্ন শিল্পী গোষ্ঠী।
বর্তমান বিরোধী দলের প্রথম সর্ববৃহৎ কর্মসূচি হিসেবে লংমার্চ বাস্তবায়নে বেশ কয়েকদিন ধরে প্রস্তুতি নেয় ১১ দল। লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নে পথে পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ও তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চটি শেষ হলেও পথে বহরের দুয়েকটি গাড়ি ছোটখাটো দুর্ঘটনার মুখে পড়ে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ৬ আগস্ট বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে ১১ দলের অবস্থান কর্মসূচি থেকে ছয় দফা দাবিতে ঢাকায় মহাসমাবেশসহ চার বিভাগে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ঢাকা-চট্টগ্রাম এই লংমার্চের পর ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে পর্যায়ক্রমে ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা-কুষ্টিয়া এবং ২১ নভেম্বর ট্রেনযোগে সিলেট মহানগর অভিমুখে লংমার্চ পালিত হবে। সবশেষে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
ছয় দফা দাবির মধ্যে আরো রয়েছে—জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশ
ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৭টায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ে সমান্তরালভাবে সংসদ ও রাজপথে আন্দোলন চলতে থাকবে।
জামায়াত আমির বলেন, ছয় দফার সঙ্গে সপ্তম দফা হবে—কোনো চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বাংলাদেশে আমরা বরদাস্ত করব না। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের জ্বালায় জনগণ অতিষ্ঠ। দুর্নীতিবাজদের হাতে জনগণের অধিকার লুণ্ঠিত। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই কিন্তু গ্যাসের বিলও যথারীতি আছে; বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল আছে। অতিষ্ঠ হয়ে, সিফাত নামের একজন তরুণ কী বলেছিল, তাতে বাংলাদেশ ওলটপালট হয়ে যাওয়ার মতো। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, দলীয় সন্ত্রাসীরা থানায় গিয়ে তাকে নাজেহাল করেছে। আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই, যে বিষয়ে সিফাত প্রতিবাদ করেছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রয়োজনে সিফাত হয়ে গর্জন করবে। ভালোয় ভালোয় ওকে ছেড়ে দিন। যদি না ছাড়েন তাহলে মনে রাখবেন, এক নূর হোসেন, এক ইয়াসমিন, এক ডা. মিলন অনেকের গদি একদম ওলটপালট করে দিয়েছিল।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতেই আমরা এই কর্মসূচি শুরু করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের কর্মসূচির কৌশল ইতোমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গায় তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সমাবেশের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, গণভোটের রায়সহ ছয় দফা দাবি পূরণ না করলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। সমাবেশে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের এই লংমার্চ। যারা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি এই লংমার্চ তাদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, লংমার্চে বাধা আসলে ছয় দফা থেকে একদফা দাবিতে আন্দোলন দুর্বার গতিতে শুরু হবে।
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, চাঁদাবাজ-মস্তানদের ভোট দিলে দেশ ভালো চলবে না, তার দৃষ্টান্ত বর্তমান সরকার। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মিনিট না যেতেই জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ পালনের মাধ্যমে যে বার্তা দিতে চাচ্ছি, সরকার যদি সেটি বুঝতে না পারে তবে পরিণতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করবে কিন্তু সরকার সেটি করেনি। সেই ট্রেন সরকার মিস করে ফেলেছে। ১৮০ দিনের মধ্যে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ট্রেনও সেপ্টেম্বরের পর মিস হয়ে যাবে। তাই সেপ্টেম্বরের মধ্যেই গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, সরকারের অবস্থা এমন হয়েছে তারা গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়েছে। সংসদে টু-থার্ডের ক্ষমতা দেখিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা যাবে না। জনগণ ভোট দিতে পারে আবার ক্ষমতাও কেড়ে নিতে পারে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকার বন্ধু ও শত্রু চিনতে পারে না বলেই তাল হারিয়ে ফেলছে। গত ছয় মাসে সরকারের ১৫০ টাকা লাঞ্চ আর ৫০ হাজার ফ্যামিলি কার্ডের গল্প ছাড়া আর কোনো গল্প নেই, কোনো অর্জন নেই।
সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা। সমাবেশ শেষে সাড়ে ৮টায় লংমার্চের যাত্রা শুরু হয়।
বৃষ্টিমুখর নারায়ণগঞ্জে পথসভা
লংমার্চ শুরু হওয়ার পর প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায়। সেখানে বৃষ্টি উপেক্ষা করে অংশগ্রহণ করেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। এতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা জনগণের সঙ্গে আছি, আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব। আমরা সফল হব। আজকের লংমার্চ শেষ নয়, শুরু।
জামায়াতের নারায়ণগঞ্জ জেলা আমির মাওলানা আবদুল জাব্বারের সভাপতিত্বে পথসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হকসহ শীর্ষ নেতারা। এদিকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে লংমার্চ বহরকে শুভেচ্ছা জানান স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
নিমসারে অনির্ধারিত পথসভা
নারায়ণগঞ্জের পর অনির্ধারিত পথসভা হয় কুমিল্লার নিমসার এলাকায়। সেখানে ব্যাপক লোকজনের উপস্থিতিতে রাস্তায় নিজ গাড়িতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আমরা আপনাদের জন্য রাস্তায় নেমেছি, আপনাদের দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরব ইনশাআল্লাহ।
পদুয়ার বাজারে পথসভায় জনতার ঢল
লংমার্চের অন্যতম বড় পথসভা অনুষ্ঠিত হয় কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বাসস্ট্যান্ড বিশ্ব রোড এলাকায়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে পথসভাটি সমাবেশে রূপ নেয়। আধাঘণ্টা স্থায়ী এ পথসভায় ডা. শফিকুর রহমান ছয় দফার পাশাপাশি আরো বলেন, কুমিল্লা বিভাগের দাবি উঠেছিল ১৯৯৪ সালে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের উদ্দেশে বলছি, কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে দ্রুত বাস্তবায়ন করুন।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার ১৮০ দিনে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশ চাঁদাবাজি, খুন রাহাজানিতে ভরে গিয়ে জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। পথসভায় আরো বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল প্রমুখ।
চৌদ্দগ্রামে পথসভা
চৌদ্দগ্রামে পথসভাতেও ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া পথসভায় আরো বক্তব্য দেন ও উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম, মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রমুখ।
ফেনীর পথসভা জনসমাবেশে পরিণত
লংমার্চের গাড়িবহর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ফেনী মহিপালে পৌঁছায়। উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের শুরু থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে। তিনি বলেন, সরকার নির্লজ্জ দলীয়করণ করবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব—তা হবে না। আমরা প্রতিবাদ করব। চূড়ান্ত ডাক এলে জনগণকে নেমে আসার আহ্বান জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। দেশ উল্টোপথে চলছে।
জুলাই গণহত্যার বিচার পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, আমরা ফ্যাসিবাদ-বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। পথসভায় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।
মিরসরাইয়ে শেষ পথসভা
বিকালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় শেষ পথসভা। সেখানে অনেক আগেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু নেতাকর্মী জমায়েত হন। এতে জামায়াত আমিরসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। লংমার্চ সফলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি দফায় দফায় বৈঠকসহ নানা প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এতে ১১ দলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর ছাড়াও সংশ্লিষ্ট ৯টি শাখার নেতারা যুক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও এসপিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জোটটি। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিটি শেষ হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।