খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার এবং এ সংক্রান্ত আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কাজ করতে আগ্রহী মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করা হবে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ থেকে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা জারি করেছে।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, আর্থিক খাতে এডিআরের ব্যবহার বাড়াতে যোগ্যতা, সক্ষমতা ও উপযুক্ততা যাচাইয়ের মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি এসব ঋণ–সংক্রান্ত আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা মামলায় যাওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত যেকোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়ে বিরোধের সমাধানে আসতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মামলা করার আগে নয়, চলমান মামলার ক্ষেত্রেও পক্ষগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০, পার্টনারশিপ অ্যাক্ট, ১৯৩২ অথবা কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর আওতায় নিবন্ধিত হতে হবে। পাশাপাশি হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠান বা এর পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেউলিয়া, ঋণখেলাপি, প্রতারণা, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং বা গুরুতর কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলে ওই প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য যোগ্য হবে না। আবেদন করার সময় প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন বছরের ব্যবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নামে এক বা একাধিক স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সব আর্থিক লেনদেন ওই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এডিআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের অধীনে এক বা একাধিক মধ্যস্থতাকারী প্যানেল থাকতে হবে। প্রতিটি প্যানেলে কমপক্ষে পাঁচজন মধ্যস্থতাকারী থাকতে হবে। এর মধ্যে একজন হিসাববিদ ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে।মধ্যস্থতাকারীদের নিরপেক্ষতা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, গোপনীয়তা রক্ষা ও আচরণবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পেশা বা সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদেরও প্যানেলে যুক্ত করা যাবে। তবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী প্যানেলে রাখা যাবে না।
এছাড়া মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন পেশা, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা বা বিচারকার্যে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ১০০ নম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৭০ নম্বর পেতে হবে। এর কম নম্বর পাওয়া আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে। আবেদন, দাখিল করা নথি এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই বা পরিদর্শনের ফলাফলে সন্তুষ্ট হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানকে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে। তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৯০ দিন আগে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে সন্তুষ্ট হলে আরও তিন বছরের জন্য তালিকাভুক্তি নবায়ন করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আবেদনে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া, পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন, গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা ভঙ্গ, স্বার্থের সংঘাত গোপন করা কিংবা নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্তি স্থগিত করতে পারবে।
এ ছাড়া গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা বা অসদাচরণে জড়িত হওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করা কিংবা এডিআর ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা বা সুনাম ক্ষুণ্ন করে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত প্রতিটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রতি ক্যালেন্ডার বছর শেষ হওয়ার পর দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিদর্শন করতে পারবে। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, নথিপত্র, হিসাব-রেকর্ড এবং এডিআর কার্যক্রম–সংশ্লিষ্ট তথ্য ও দলিল পরীক্ষা বা পর্যালোচনা করা যাবে।
এছাড়া মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে কোনো পক্ষের অভিযোগ থাকলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে দাখিল করা যাবে। অভিযোগের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই ও তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সতর্কীকরণ, আর্থিক জরিমানা, তালিকাভুক্তি স্থগিত বা বাতিলসহ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক।