প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ও কর্মজগতের পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির অগ্রযাত্রা তখনই টেকসই হবে, যখন এর সুফল শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগবে।
শুক্রবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের দ্বিতীয় তলার কনফারেন্স লাউঞ্জে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত এক শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা এমন ভবিষ্যৎ চাই না, যেখানে প্রযুক্তি এগিয়ে যাবে কিন্তু শ্রমিক পিছিয়ে থাকবে। আমরা এমন অর্থনীতি চাই, যেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হবে, বিনিয়োগ বাড়বে; কিন্তু এর ভিত্তি হবে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা।’
তিনি বলেন, কর্মজগতের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বিকাশ, উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একদিকে যেমন নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রচলিত অনেক কাজও পরিবর্তনের মুখে পড়ছে। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা শ্রমিক ও তার পরিবারের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার যেন উপেক্ষিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কর্মরত মানুষের বড় একটি অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্ম, মৎস্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, হোম-বেজড কাজ এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন। কিন্তু তাদের অনেকেরই চাকরির স্থায়িত্ব, আইনগত সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত নয়।
শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে শিমুল বিশ্বাস বলেন, ন্যায্য মজুরি, আট ঘণ্টা কর্মদিবসের বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক, চাকরির নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, যৌথ দরকষাকষির সুযোগ, সময়মতো মজুরি, নারী শ্রমিকের সমঅধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি কাঠামো সমন্বয়, কর্মঘণ্টার যথাযথ বাস্তবায়ন, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের ডাটাবেইজ তৈরি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময়ে কর্মসংস্থান সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধিত হয়েছে। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। আইন কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, শ্রমিক কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন এবং শ্রমিক তার অধিকার কতটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছেন—সেটিই হবে আমাদের সাফল্যের আসল মাপকাঠি।’
শ্রমখাতের সমস্যা সমাধানে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষের কার্যকর সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বলেন, সরকার একা শ্রমবাজারের সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। মালিকপক্ষ বা শ্রমিক সংগঠনও এককভাবে তা পারবে না। তিন পক্ষকে সমান মর্যাদা ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। যৌথ দরকষাকষি, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সংলাপ এবং কর্মক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিকের কণ্ঠকে বাদ দিয়ে শ্রমনীতি তৈরি করলে সেই নীতি কখনো টেকসই হতে পারে না।’
সিম্পোজিয়ামে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শ্রমনীতিকে শ্রমিকবান্ধব, শিল্পবান্ধব, উৎপাদনশীলতাবান্ধব ও ন্যায়ভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জাপান, পানামা, ফিলিপাইন, তিউনিসিয়া, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক ফোরামের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিম্পোজিয়ামে বিভিন্ন মতামত ও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে আসে।