দীর্ঘ দুই বছর পর গত মঙ্গলবার কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০ সদস্যের আংশিক ওই কমিটিতে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবসহ ছয়জন সরকারি চাকরিজীবী পদ পেয়েছেন। এতে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। গতকাল শনিবার কমিটি বাতিলের দাবিতে ফুলবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে তারা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
জানা যায়, গত মঙ্গলবার কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে আহ্বায়ক করা হয় রোশন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসুকে এবং সদস্য সচিব করা হয় পূর্ব কুরুষা ফেরুষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান মুকুলকে। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন পশ্চিম কবির মামুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন, যতীন্দ্র নারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, সরকারি সাইফুর রহমান কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহিনুর রহমান এবং অগ্রণী ব্যাংকের ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র অফিসার তহিদুল হক।
সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক দলের কমিটিতে পদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দল বা তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না।
কমিটির প্রধান দুটি পদসহ ছয়টি পদে সরকারি চাকরিজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করায় দলীয় শৃঙ্খলা ও সরকারি দায়িত্ব পালনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাদের বঞ্চিত করে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
ঘোষিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান বলেন, ‘দলীয় গঠনতন্ত্র এবং সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবসহ ছয়জন সরকারি চাকরিজীবীকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। দুঃসময়ে রাজপথে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তারা চাকরি করেছেন, নাকি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন? এখন তারা চাকরি করবেন, নাকি সংগঠন করবেন?
তিনি আরো বলেন, নতুন এই কমিটি দলের নেতাকর্মীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা সন্তুষ্ট নন। মূলত জেলা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের আশীর্বাদপুষ্টদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নেতাকর্মীরা কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে, কমিটির আহ্বায়ক ও রোশন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসু চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার সদস্য সচিব চাকরি ছেড়ে দেব। আপনারা চিন্তা করবেন না। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার কাগজ পেয়ে যাবেন।’ তবে পরবর্তী সময়ে তিনি একটি আবেদন জমা দিলেও তা চাকরি থেকে অব্যাহতির জন্য যথেষ্ট নয় বলে দাবি করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ।
তিনি বলেন, সরকারি শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে একটি আবেদন পেয়েছি; তবে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে সদস্য সচিব আব্দুল মান্নান মুকুল তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।
অন্যদিকে কমিটিতে সদস্য পদ পাওয়া অগ্রণী ব্যাংকের ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র অফিসার তহিদুল হক দলীয় পদে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
অগ্রণী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম অঞ্চলপ্রধান আহসান হাবিব সরকার বলেন, ‘প্রবিধান অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত থাকতে পারবেন না। আমার ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী চাকরিজীবীদের রাজনীতি করার সুযোগ যদি না থাকে; সেক্ষেত্রে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।