নববর্ষ উদযাপনে ধর্মীয় নির্দেশনা
ফসলি সনের হিসাব মেলাতে যে বৈশাখের পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে তা আজ এক বিশাল ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। চৈত্রসংক্রান্তির বিদায় আর বৈশাখের আবাহন—বাঙালির এই চিরায়ত যাপনে একসময় আতিথেয়তা আর শুদ্ধাচারই ছিল প্রধান অনুষঙ্গ। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমাদের এই লোকজ উৎসবের অবয়ব আমূল বদলে গেছে। সংস্কৃতির প্রবহমান ধারায় এমন কিছু উপাদান যুক্ত করা হয়েছে, যা না এই জনপদের মাটির সঙ্গে মেলে, না মেলে এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে। উৎসবের এই নবতর বয়ান আর ইসলামের মৌল দর্শনের সংঘাত এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকটে রূপ নিয়েছে।
হালখাতা ও মৈত্রী : যে ঐতিহ্য আমরা হারিয়েছি
আমাদের ছোটবেলার বৈশাখ মানেই ছিল সাতসকালে গোসল করে পরিষ্কার জামা পরে বাবার হাত ধরে বাজারের দিকে হাঁটা। গন্তব্য ছিল ‘হালখাতা’। হিন্দু-মুসলিম সব ব্যবসায়ী তাদের পুরোনো খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন। ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো ছিল সেই দিনের সবচেয়ে বড় উৎসব। জিলাপি, কদমা আর বাতসার সেই স্বাদ ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অঘোষিত দলিল।
কিন্তু আজ সেই শান্ত-স্নিগ্ধ হালখাতার জায়গা নিয়েছে উচ্চকিত কোলাহল। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রাণভোমরা ছিল যে পারস্পরিক লেনদেন আর হৃদ্যতা, তা আজ করপোরেট জাঁকজমকে ফিকে হয়ে গেছে। সেখানে ঢুকে পড়েছে ভিনদেশি সংস্কৃতির আদলে তৈরি নানা কৃত্রিম আয়োজন।
বিজাতীয় অনুকরণ : ইসলামের মানদণ্ড
ইসলামে সংস্কৃতির মূল কথা হলো সুস্থ ও কলুষমুক্ত আনন্দ। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় এলেন, তখন তিনি সেখানে পারস্য থেকে প্রভাবিত ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ উৎসব পালন করতে দেখলেন। তিনি তাদের সেই প্রথা থেকে বিরত রেখে ঘোষণা করলেন—‘আল্লাহ তোমাদের এই দুটির পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) দান করেছেন।’ (আবু দাউদ : ১১৩৪)
এখানেই আসে সেই প্রসিদ্ধ সতর্কবার্তা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য বা অনুকরণ গ্রহণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ : ৪০৩১)
এই হাদিসটি যেমন পোশাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অনুরূপভাবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও উৎসবের দর্শনের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। নববর্ষে যখন আমরা এমন সব প্রতীক বা আচার পালন করি, যা অন্য কোনো ধর্মের উপাসনা বা পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত, তখন তা আর শুধু ‘সংস্কৃতি’ থাকে না, তা হয়ে দাঁড়ায় বিজাতীয় অনুকরণ।
হনুমান, হাতি ও প্যাঁচার রূপক : মঙ্গল নাকি সংকট?
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেখানে বিশাল সব মুখোশ—হনুমান, হাতি, ভাল্লুক, প্যাঁচা ও কুমিরের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল হয়। প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, এই প্রাণীগুলো কি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক, নাকি এগুলো সুনির্দিষ্ট কিছু মিথ বা পৌরাণিক বিশ্বাস থেকে ধার করা?
ইসলামি আকিদাহ অনুযায়ী, কোনো প্রাণীর প্রতিকৃতি তৈরি বা তার মাধ্যমে কল্যাণ কামনা করা সরাসরি ‘শিরক’-এর পর্যায়ে পড়ে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) আমাকে বলেছেন, ‘ফেরেশতারা এমন ঘরে প্রবেশ করে না, যেখানে কোনো মূর্তি বা ছবি থাকে।’ (মুসলিম)
যখন আমরা একটি বড় প্যাঁচাকে ‘জ্ঞানের প্রতীক’ বা হাতিকে ‘শক্তির আধার’ মনে করে রাজপথে ঘুরি, তখন তা প্রকারান্তরে আল্লাহর কুদরত ও গুণাবলিকে সৃজিত বস্তুর ওপর আরোপ করার নামান্তর। মুমিন হৃদয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—যে কল্যাণ কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার কথা, তা কি কাঠের তৈরি কোনো নিষ্প্রাণ প্যাঁচা বয়ে আনতে পারে?
কল্যাণের মালিক কে? ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’-এর ডাক
আমরা প্রতিনিয়ত নামাজের আজানে শুনি—‘হাইয়া আলাল ফালাহ।’ অর্থাৎ, এসো কল্যাণের দিকে, এসো সফলতার দিকে। একজন মুসলিমের কাছে এই ‘ফালাহ’ বা কল্যাণের উৎস সুনির্দিষ্ট। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন-‘বলো, যদি আল্লাহ তোমাদের কোনো অমঙ্গল করতে চান, তবে কে তোমাদের রক্ষা করবে? অথবা তিনি যদি তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করতে চান, তবে কে তা রুখবে?’ (সুরা আল-আহজাব : ১৭)
সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে যখন ‘মঙ্গল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় এবং তার সঙ্গে পৌরাণিক অনুষঙ্গ যোগ করা হয়, তখন তা তাওহিদি বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে। সাহাবি ও তাবেয়িদের যুগে পারস্য বা রোমে যখন ইসলাম বিস্তার লাভ করেছিল, তারা সেখানকার সামাজিক উৎসবগুলোকে ইসলামীকরণ করেছিলেন, কিন্তু কোনো শিরকি উপাদানকে সংস্কৃতির নামে প্রশ্রয় দেননি। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার বলেছিলেন, ‘তোমরা মুশরিকদের উপাসনালয়ে তাদের উৎসবের দিনে প্রবেশ করো না, কারণ সেখানে আল্লাহর গজব নাজিল হয়।’ (সুনানে বায়হাকি)
পরিশেষ : শিকড়ের সন্ধানে
পহেলা বৈশাখ আমাদের কৃষিজীবী সমাজের এক উৎসব। ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা, দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণ করা এবং ব্যবসায়িক সততার শপথ নেওয়া হতে পারত আমাদের নববর্ষের আসল রূপ। কিন্তু আমরা সেই ধ্রুপদি পথ ছেড়ে কৃত্রিমতার সওয়ার হয়েছি।
হনুমান বা প্যাঁচার প্রতিকৃতি বহন করে অশুভ শক্তি তাড়ানোর কল্পনা করা কেবল বৈজ্ঞানিক বিচারেই হাস্যকর নয়, ঈমানি বিচারেও ভয়াবহ। হালখাতার সেই জিলাপির মিষ্টতা ফিরে আসুক, ঘরে ঘরে উত্তম আয়োজন থাকুক; কিন্তু সেখানে যেন আরোপিত কুসংস্কারের বিষবাষ্প না থাকে।
আমরা যেন ভুলে না যাই, এই জনপদ মুমিন-বিশ্বাসীদের জনপদ। এখানে কল্যাণের সুর বাজে আজানের ধ্বনিতে, কোনো মিছিলে বহন করা কাষ্ঠপুত্তলিকায় নয়। প্রকৃত আধুনিকতা ও প্রগতি নিহিত রয়েছে নিজের বিশ্বাসকে অটুট রেখে নিজস্ব ঐতিহ্য লালন করার মধ্যে—বিজাতীয় আচারের অন্ধ অনুকরণে নয়।
লেখক : সিনিয়র পেশ ইমাম : বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ