হোম > ধর্ম ও ইসলাম

রমজান প্রস্তুতির মাস পবিত্র শাবান

নাজমুল হাসান কাসেমী

রমজানের প্রতীক্ষায় এসে হাজির হলো রমজান-পূর্ব পবিত্র শাবান মাস । আরবি হিজরি বর্ষপঞ্জিকার অষ্টম এই মাসটি মুমিনের জীবনে এক বিশেষ বার্তা নিয়ে আসে। এটি শুধু একটি মাস নয়, বরং রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানের আগমনী ধ্বনি। মহিমান্বিত রমজানের পরিপূর্ণ বরকত লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার এটিই চূড়ান্ত সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসটিকে ইবাদতের ‘প্রশিক্ষণকাল’ হিসেবে গণ্য করতেন।

শাবান মাসের তাৎপর্য

শাবান মাসের আভিধানিক অর্থ হলো শাখা-প্রশাখা বা বিস্তৃত হওয়া। প্রাচীনকালে আরবরা এই মাসে পানির সন্ধানে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত বলে এর নাম রাখা হয়েছে শাবান। আধ্যাত্মিক বিচারে এই মাসে আল্লাহর রহমতের বারিধারা মুমিনদের হৃদয়ে বিস্তৃত হয়। হাদিস শরিফে এই মাসের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম-হে আল্লাহর রাসুল! শাবান মাসে আপনাকে যেভাবে রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে সেভাবে দেখি না কেন? নবীজি বললেন, ‘এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে অবস্থিত, যার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ এটি এমন এক মাস, যাতে বান্দার আমলগুলো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের দরবারে পেশ করা হয়। আর আমি পছন্দ করি, আমার আমল যখন আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।’ (নাসায়ি : ২৩৫৭)

আমলনামা পেশ ও কিবলা পরিবর্তন

শাবান মাসটি মূলত আল্লাহর কাছে বান্দার বার্ষিক আমলনামা পেশ করার মাস। প্রতিদিন ও প্রতি সপ্তাহে যেমন আমলনামা পেশ হয়, তেমনি পূর্ণ বছরের হিসাব এই মাসে চূড়ান্ত হয়। এ ছাড়া অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, এই শাবান মাসেই মুসলমানদের কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে পরিবর্তন করে মক্কাতুল মোকাররমার কাবার দিকে নির্ধারণ করা হয়েছিল। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আমি আপনার চেহারাকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং যে কিবলাকে আপনি পছন্দ করুন আমি শিগগিরই সেদিকে আপনাকে ফিরিয়ে দেব। সুতরাং এবার মসজিদুল হারামের দিকে নিজের চেহারা ফেরান এবং (ভবিষ্যতে) আপনি যেখানেই থাকুন (সালাত আদায়কালে) নিজের চেহারা সেদিকেই ফেরাবেন।’ (সুরা বাকারা : ১৪৪) এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

শাবান মাসের প্রধান করণীয়

১. নফল রোজা ও সিয়াম পালন : শাবান মাসের প্রধান এবং সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো নফল রোজা রাখা। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। তিনি শাবানের প্রায় পুরো মাসই রোজা রাখতেন।’ (বুখারি : ১৯৬৯)

রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে অভ্যস্ত করতেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নফল রোজা রাখতেন।

২. কোরআন তিলাওয়াতের বসন্ত : পূর্ববর্তী নেককার বান্দারা (সালাফে সালেহিন) শাবান মাস শুরু হলে কোরআন তিলাওয়াত অনেক বাড়িয়ে দিতেন। তারা বলতেন, ‘এটি হলো ‘কোরআন পাঠকদের মাস’। রমজানে খতম দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি তারা এখনই সম্পন্ন করতেন। আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.)-এর মতে, যারা শাবানে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করবে, তাদের জন্য রমজানের তিলাওয়াত সহজ ও স্বাদময় হবে।

৩. তওবা ও আত্মশুদ্ধি : রমজান হলো পবিত্রতার মাস। পাপে কলুষিত আত্মা নিয়ে রমজানের আধ্যাত্মিক নূর অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই শাবান মাসেই খাঁটি তওবার মাধ্যমে নিজেকে পাপমুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে। হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকারের মতো অন্তরের ব্যাধিগুলো দূর করে হৃদয়কে ‘কালবে সালিম’ বা সুস্থ হৃদয়ে পরিণত করার এটিই মোক্ষম সময়।

৪. শবেবরাতে ফজিলত : শবেবরাত নামে খ্যাত ১৪ শাবান রাতটি ফজিলতপূর্ণ। হাদিস শরিফে এসেছে- ‘আল্লাহতায়ালা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১৩৯০) সুতরাং এই রাতে একান্ত ইবাদত, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং পরের দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব বা উত্তম আমল।

শাবান মাসের বর্জনীয় ও কুসংস্কার

ইবাদতের পাশাপাশি এই মাসে প্রচলিত কিছু ভুল প্রথা বর্জন করা ঈমানি দায়িত্ব। যথা-

উদাসীনতা : অধিকাংশ মানুষ রজব ও রমজানের গুরুত্ব দিলেও শাবানকে অবহেলা করে। এই উদাসীনতা বর্জনীয়।

হিংসা ও শত্রুতা : হাদিস অনুযায়ী, যারা অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, আল্লাহ তাদের এ মাসেও ক্ষমা করেন না। তাই সামাজিক ও ব্যক্তিগত কলহ মিটিয়ে ফেলা উচিত।

অতিরঞ্জিত উৎসব : শবেবরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, আলোকসজ্জা বা রাস্তায় হইহুল্লোড় করা ইসলাম সমর্থন করে না। এটি ইবাদতের রাত, বিনোদনের নয়।

বেহুদা প্রথা : শবেবরাতে ঘটা করে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবারের আয়োজনকে ধর্মের অংশ মনে করা এক ধরনের কুসংস্কার। সাধ্যমতো দান-সদকা করা ভালো, তবে একে নির্দিষ্ট প্রথায় রূপ দেওয়া উচিত নয়।

পরিশেষে : শাবান মাস হলো মুমিনের জন্য রমজানের সোপান। যদি শাবানে আমলের বীজ বপন না করা হয় আর শাবানে তার পরিচর্যা না করা হয়, তবে রমজানে তার সুফল আশা করা কঠিন।

আসুন, আমরা আমাদের সময়কে ইবাদত, তওবা ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সাজাই এবং একটি সফল রমজান পালনের জন্য নিজেকে তৈরি করি। আল্লাহ আমাদের তওফিক দান করুন।

লেখক : পরিচালক, আস-সুফফাহ মডেল মাদরাসা, গাজীপুর

ইসলামে ভোট ও ভোটারের দায়িত্ব

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানি হোক সম্মানজনক

মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি ভয়াবহ গুনাহ

কাকে ভোট দেওয়া উচিত, জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

শাবানের চাঁদ দেখা যায়নি, পবিত্র শবেবরাত ৩ ফেব্রুয়ারি

দেশে পবিত্র শবেবরাত কবে, জানা যাবে কাল

হজযাত্রীদের টিকাকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ

শীতকালীন ভ্রমণ, সৃষ্টিতে খুঁজি স্রষ্টাকে

আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে নবীজি

নিকাবে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা