হোম > ধর্ম ও ইসলাম

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানি হোক সম্মানজনক

মুফতি আইয়ুব নাদীম

ইমাম-মুয়াজ্জিন মর্যাদাপূর্ণ উপাধি ও কোরআনি পরিভাষা। ইমামতি-মুয়াজ্জিনি নবী-রাসুল, সাহাবি এবং সময়ের শ্রেষ্ঠ, যোগ্য ও নেককার লোকদের কাজ। ইসলাম ও মুসলমানের খেদমতে নিয়োজিত ইমাম-মুয়াজ্জিনরা যুগ যুগ ধরে সমাজের নৈতিকতা, দ্বীনি শিক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা ও ঈদের খুতবা, কোরআন শিক্ষা, জানাজা, দোয়া-দরুদ—সমাজের প্রতিটি ধর্মীয় অনুষঙ্গেই তাদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিটি নানাভাবে অবহেলিত হয়ে আসছিল, বিশেষভাবে আর্থিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে।

এমন প্রেক্ষাপটে ধর্ম উপদেষ্টারের আন্তরিক চেষ্টায় সরকার কর্তৃক ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য গেজেট প্রকাশ একটি ঐতিহাসিক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধর্মীয় স্কলারদের প্রতি সম্মান, দায়িত্ববোধ ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের জন্য আমরা উপদেষ্টাসহ সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।

ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মান

ইমাম-মুয়াজ্জিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ও নববী পেশা। তাই ইমাম-মুয়াজ্জিনকে যথাযথ সম্মান করা প্রতিটি মুসলমান ও মুসল্লিদের নৈতিক দায়িত্ব। এ ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মানুষকে তার মর্যাদা অনুযায়ী স্থান দাও।’ (রিয়াদুস সালেহিন : ৩৬০)

ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য সময়ের চাহিদা অনুপাতে মানসম্মত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা তার সম্মানের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। যেটাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না।

ইমাম-মুয়াজ্জিন সবার কাজের সহযোগী

ইমাম-মুয়াজ্জিন আমাদের জীবনের ঘনিষ্ঠ নানা বিষয়ের একান্ত হিতাকাঙ্ক্ষী ও চরম-পরম সহযোগী। মুয়াজ্জিন তার শত ব্যস্ততার মধ্যেও দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য নির্ধারিত সময়ে মানুষকে নামাজের কথা স্মরণ করে দিতে আজান দিয়ে থাকেন। আর ইমাম-খতিবরা আমাদের জীবনের নানা জরুরি বিষয় নিয়ে (তথা জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত সব বিষয়ে) মসজিদের মিম্বরে বয়ান ও খুতবার মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে অত্যন্ত জোরালোভাবে ও দরদের সঙ্গে দ্বীনের কথা বুঝিয়ে থাকেন; আল্লাহর বান্দাদের সচেতন ও সতর্ক করেন।

ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন

এলাকা ও মসজিদের আয়ের পরিধির ভিন্নতায় নানা মান ও সুবিধার বেতন-ভাতা চালু আছে। তবে শহরে ইমামদের সাধারণত বেতন বা সম্মানি আট হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। আর মুয়াজ্জিনদের সর্বোচ্চ বেতন বা সম্মানি ১০-১২ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে গ্রামগঞ্জের মসজিদের বেতন-ভাতা ভদ্র সমাজে উল্লেখ না করলেই ভদ্রতা বজায় থাকে, ব্যাপারটা অনেকটা এ টাইপের। এই অমানবিক অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না।

মসজিদ কমিটিগুলোর বিবেক কোথায়

স্কুল-কলেজ বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত খরচের চেয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার খাতটাকে সব থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, আর হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মসজিদের ক্ষেত্রে একেবারে বিপরীত চিত্র। এখানে মসজিদের উন্নতির নামে লাখ লাখ টাকার মার্বেল, টাইলস, লাইটিং ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রভৃতি সব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসির আয়েশি ব্যবস্থায়ও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়, শুধু গুরুত্ব দেওয়া হয় না ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতার বিষয়ে।

বেতন যাও যৎসামান্য নির্ধারিত, তাও গ্রামাঞ্চলে প্রতি মাসে হয় না। শহরের মসজিদগুলোয় মসজিদের অ্যাকাউন্টে কিংবা ক্যাশিয়ারের কাছে পর্যাপ্ত টাকা থাকলেও সময়মতো বেতন দেন না। ইচ্ছা করেই অধিকাংশ মসজিদে বেতন দেওয়া হয় মাসের অর্ধেক চলে গেলে, কিংবা ২০ তারিখের পর। আর সব সার্ভিসে ইনক্রিমেন্ট থাকলেও এই পেশায় ইনক্রিমেন্ট যেন সোনার হরিণ। ভেবে পেরেশান হই—এই মসজিদগুলোর পরিচালকরা আল্লাহর কাছে কী জবাব দেবেন?

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথা সবাই জানে, জানে না শুধু কমিটি। তারা ইমাম-মুয়াজ্জিনকে সম্মান দিয়েই পেট ভরাতে চান। সম্মানি ছাড়া যে তাদের পরিবারের পেট চলে না, সেটা যেন তারা বুঝতেই চান না। নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিটি সামগ্রীর দাম আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। চক্রাকারে দিন দিন বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতার বিষয় নিয়ে তাদের যথেষ্ট আন্তরিক হওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি ছিল; কিন্তু তারা সব বিষয়ে সিরিয়াস হলেও এ বিষয়ে উদাসীন।

কাল কিয়ামতে দায়িত্বশীলরা জিজ্ঞাসিত হবেন

প্রতিটি মসজিদের কমিটি আছে, তারা ইমাম-মুয়াজ্জিনের অর্থনৈতিক এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কি না কিয়ামতের ময়দানে সে ব্যাপারে তারা জিজ্ঞাসিত হবেন। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর (পরকালে) নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে তোমাদের প্রত্যেককেই জবাবদিহি করতে হবে।’ (বুখারি : ৬৬৫৩)

সুতরাং প্রতিটি মসজিদ কমিটির প্রতি উদাত্ত আহ্বান থাকবে—আপনারা নতুন বছরে সরকারের এই গেজেট অনুযায়ী সামর্থ্যমাফিক ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন পুনর্নির্ধারণ করুন। আপনি প্রতিদিন ব্যাগভর্তি বাজার করছেন, আয়েশি জীবনযাপন করছেন পরিবার নিয়ে, অথচ আপনার ইমাম-মুয়াজ্জিনের পরিবার কীভাবে চলছে এই দ্রব্যমূল্যের আগুনের যুগে, তার প্রতি যদি ভ্রুক্ষেপ না থাকে, তাহলে নিশ্চিত থাকবেন—আপনাকে এর জন্য জবাব দিতে হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া কাশেফুল উলূম মাদরাসা, মধুপুর, টাঙ্গাইল

ইসলামে ভোট ও ভোটারের দায়িত্ব

মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি ভয়াবহ গুনাহ

রমজান প্রস্তুতির মাস পবিত্র শাবান

কাকে ভোট দেওয়া উচিত, জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

শাবানের চাঁদ দেখা যায়নি, পবিত্র শবেবরাত ৩ ফেব্রুয়ারি

দেশে পবিত্র শবেবরাত কবে, জানা যাবে কাল

হজযাত্রীদের টিকাকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ

শীতকালীন ভ্রমণ, সৃষ্টিতে খুঁজি স্রষ্টাকে

আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে নবীজি

নিকাবে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা