কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা বা তিন দিনের বেশি সময় ধরে খাওয়া ইসলামে বৈধ নয়। অনেকের মধ্যেই এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। বাস্তবে ইসলামে এ ধরনের কোনো দিকনির্দেশনা আছে কি?
কোরবানির পর প্রাপ্ত গোশত সাধারণত তিনভাবে বণ্টন করা হয়। এক অংশ গরিব-মিসকিনদের দেওয়া হয়, এক অংশ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় এবং বাকি অংশ নিজেরা খাওয়া ও সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়।
তিন দিনের বেশি গোশত সংরক্ষণ করা যাবে না বা খাওয়া যাবে না মর্মে প্রচলিত ধারণা ঠিক নয়। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির গোশত প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে রাখা যেমন বৈধ তেমনি পরে খাওয়াও বৈধ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিশেষ একটি পরিস্থিতির কারণে কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
সে সময় বহু দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে মদিনায় এসেছিলেন। তাদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে নবী করিম (সা.) তিন দিনের বেশি গোশত জমিয়ে না রেখে অবশিষ্ট অংশ সদকা করে দিতে মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরে যখন সেই বিশেষ পরিস্থিতি কেটে যায়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে দেন। তিনি বলেন—
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ لُحُومِ الْأَضَاحِي فَوْقَ ثَلَاثٍ، فَأَمْسِكُوا مَا بَدَا لَكُمْ
‘নিশ্চয় নবী (সা.) বলেছেন— আমি তোমাদের কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা যত দিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করতে পারো।’ (মুসলিম ১৯৭১)
অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
فَكُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا
‘তোমরা নিজেরা খাও, সংরক্ষণ করো এবং সদকাও করো।’ (মুসলিম ১৯৭১)
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনু আবদিল বার (রহ.) বলেন, এ বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে যে তিন দিনের পরও কুরবানির গোশত সংরক্ষণ করা বৈধ এবং পূর্বের নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে গেছে। (আত-তামহিদ (৩/২১৬)
ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, কেউ যদি কুরবানির গোশতের পুরোটা নিজের জন্য সংরক্ষণ করে রাখে, তবুও তা জায়েজ হবে। যদিও গরিব-মিসকিন, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, ফাতাওয়া আলমগিরি ৫/৩০০)
আবার দরিদ্রদের প্রাপ্য অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট গোশত দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে রাখা এবং সুবিধামতো খাওয়ারও অনুমতি রয়েছে। (মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮)
কুরবানির গোশত মাত্র তিন দিন সংরক্ষণ করা যাবে বা খাওয়া যাবে— এ ধারণার কোনো ভিত্তি বর্তমানে ইসলামি শরিয়তে নেই। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে দেওয়া সেই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই পরবর্তীতে প্রত্যাহার করে দিয়েছেন। তাই কুরবানির গোশত প্রয়োজন অনুযায়ী যত দিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করা এবং খাওয়া বৈধ।
তবে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগির মানসিকতা গড়ে তোলা। তাই নিজের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি গরিব, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের হক আদায় করাও একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।