‘নজর বলে কিছু নেই, এসব কুসংস্কার!’Ñকথাটা আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি। কারো নতুন চাকরি হয়েছে, নতুন গাড়ি কিনেছে, বিয়ে হয়েছে, সন্তান হয়েছে কিংবা জীবনে হঠাৎ ভালো কিছু ঘটেছেÑকেউ যদি বলে, ‘নজর থেকে সাবধান’, আমরা অনেক সময় কথাটাকে কুসংস্কার বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু নজর নিয়ে যে বিশ্বাসকে আমরা এত সহজে ‘গ্রাম্যকথা’ বলে উড়িয়ে দিই, ইসলাম কি সত্যিই সেটিকে সেভাবে দেখেছে?
প্রায় ১৪০০ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল-আয়নু হাক্ক’ নজর সত্য। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একই মর্মের হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ৫৫৯৫ নম্বর হাদিসে এসেছে, ‘নজর সত্য; যদি কোনো কিছু তাকদির অতিক্রম করতে পারে, তবে তা হলো নজর।’ পবিত্র কোরআনের সুরা ফালাকেও আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেনÑ‘হিংসুক যখন হিংসা করে, তার অনিষ্ট থেকে আমি আশ্রয় চাই।’ (সুরা আল-ফালাক : ৫)
এবার দেখা যাকÑদৃষ্টির পেছনে বিজ্ঞান কী যুক্তি দেয়। মানুষ যখন কারো দিকে তাকায়, তখন শুধু চোখই কাজ করে না। সেই দৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার অনুভূতি, মূল্যায়ন, আকর্ষণ, ঈর্ষা, ভয় কিংবা বিদ্বেষও। ভালোবাসার চোখে কাউকে দেখা আর হিংসার চোখে দেখা একই বিষয় নয়।
আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের এই সামাজিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছে। বিশেষ করে, Social-Evaluative Threat বা অন্যের নেতিবাচক মূল্যায়নের আশঙ্কা মানুষের শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানী Sally S. Dickerson ও Margaret E. Kemeny-এর ২০০৪ সালের একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামাজিকভাবে মূল্যায়িত বা বিচারিত হওয়ার আশঙ্কা মানুষের শরীরে cortisol-নির্ভর stress response বাড়াতে পারে। (Dickerson, S. S., & Kemeny, M. E. 2004)
অর্থাৎ অন্যের দৃষ্টি বা মূল্যায়ন সবসময় আমাদের শরীরের কাছে অর্থহীন কোনো বিষয় নয়। কেউ আপনার দিকে এমনভাবে তাকাল যে, আপনি বুঝতে পারলেনÑআপনাকে বিচার করা হচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণ পর বুক ধড়ফড় করছে, অস্বস্তি লাগছে, হাত ঘামছে, মাথা ভার লাগছে। আমাদের মস্তিষ্ক সামাজিক হুমকিকেও কখনো কখনো বাস্তব চাপ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। ফলে শরীরে stress response তৈরি হতে পারে। মন ও শরীর যে আলাদা কোনো জগৎ নয়, বিজ্ঞান এখন সে বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই জানে।
এখানে আসে Nocebo Effect-এর কথাও। কোনো নেতিবাচক প্রত্যাশা, ভয় কিংবা আশঙ্কা কখনো কখনো মানুষের বাস্তব শারীরিক অস্বস্তিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ কোনো কিছু আমাদের ক্ষতি করবেÑএই প্রত্যাশাটিও শরীরের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়Ñমানুষের নেতিবাচক অনুভূতি, দৃষ্টি ও সামাজিক আচরণ যে অন্য মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, সেটা কি একেবারেই অস্বীকার করা যায়?
সুনান ইবনে মাজাহ ৩৫০৬-তে সাহাবি সাহল ইবন হুনাইফ (রা.)-এর একটি ঘটনা এসেছে। আমির ইবন রাবিয়াহ (রা.) তাকে দেখে তার সৌন্দর্য ও শারীরিক গঠনের প্রশংসা করেছিলেন। এরপর সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ কেন তার ভাইয়ের জন্য বরকতের দোয়া করে না?’ এরপর তিনি আমির (রা.)-কে গোসল করতে বলেন।
এখানে ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করার কথা নেই। বরং একজন মানুষ অন্যজনকে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, প্রশংসা করেছেন। তারপরও রাসুলুল্লাহ (সা.) বরকতের দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রশংসার ক্ষেত্রেও সতর্কতা আছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই আমরা অন্যের জীবনের দিকে তাকাই। কারো নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, বিয়ে, সন্তান, বিদেশযাত্রা, পুরস্কার কিংবা সাফল্যÑসবকিছুই এখন আমাদের চোখের সামনে। আমরা কেউ আনন্দ নিয়ে দেখি। কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখি। কেউ আবার অজান্তেই ঈর্ষা নিয়ে দেখি।
আমরা প্রায়ই নজরকে শুধু ‘অন্যের চোখের সমস্যা’ হিসেবে দেখি। অথচ নিজের চোখের ভেতর কী আছে, সেটিও তো ভেবে দেখা দরকার। ইসলাম তাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে শেখায়। আর কারো ভালো কিছু দেখলে তার জন্য বরকতের দোয়া করতে শেখায়। অন্যদিকে বিজ্ঞান আমাদের দেখাচ্ছে, মানুষের সামাজিক অভিজ্ঞতা, নেতিবাচক মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা শরীর ও মনের ওপর বাস্তব প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
কারো ভালো কিছু দেখলে হিংসা নয়, তার জন্য বরকত চাইতে পারি। কারো সাফল্য দেখে নিজের অপূর্ণতার হিসাব না কষে তার আনন্দে আনন্দিত হতে পারি। কারো জীবনে ভালো কিছু দেখে শুধু তাকিয়ে না থেকে বলতে পারিÑ‘আল্লাহ তাকে বরকত দিন’। কারণ শেষ পর্যন্ত নজর নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এটা নয় যে, নজর আছে কি নেই। প্রশ্ন হলোÑআপনি যখন অন্যের দিকে তাকান, আপনার চোখে আসলে কী থাকে।
লেখক: শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়