আল্লাহতায়ালা আমাদের ইবাদতের জন্য মসজিদকে মনোনীত করেছেন। মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর, যার মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে, সেখানে মুসল্লিদের উপস্থিতি, কাতারবদ্ধ ইবাদত এবং আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়—বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে মসজিদকে সুসজ্জিত ও জাঁকজমকপূর্ণ করাকে অনেকে ‘ফ্যাশন’ বা প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে, মসজিদের বাইরে চতুর্পাশে মরিচবাতি বা অতিরিক্ত আলোকসজ্জা করে আভিজাত্য প্রকাশের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করার অনুরোধ করছি—
১. কিয়ামতের আলামত ও অহংকার
আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত হবে না, যতদিন না লোকরা মসজিদ নিয়ে গর্ব ও অহংকার করবে।’ (ইবনে মাজাহ-৭৩৯; নাসায়ী-৬৮৯)
ইমাম বুখারি (র.) তার সহিহ বুখারির কিতাবুস সালাত অধ্যায়ে মসজিদ নির্মাণ-সংক্রান্ত হাদিসের আলোচনা করার আগে আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণনা করে বলেন—‘লোকরা মসজিদ নিয়ে গর্ব করবে; কিন্তু ইবাদতের মাধ্যমে তা আবাদ করবে না।’ (সহিহ বুখারি : ৮/৬২)
সুতরাং মসজিদকে বাহ্যিকভাবে প্রাসাদের মতো সাজিয়ে যদি আমরা আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকি, তবে তা কিয়ামতের অশুভ লক্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
২. অতিরিক্ত আলোকসজ্জা ও অপচয়
মসজিদের প্রয়োজনে যতটুকু আলো দরকার, তার বাইরে স্রেফ প্রদর্শনীর জন্য মরিচ বাতি বা ঝাড়বাতি ব্যবহার করা ‘ইসরাফ’ বা অপচয়ের শামিল। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন—‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনী ইসরাইল : ২৭)
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, মসজিদের একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত জাঁকজমক বা আলোকসজ্জা করার পেছনে অর্থ ব্যয় করা জায়েজ নয়। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী : ২/৪৬১)
৩. ইবাদতে বিঘ্ন ও মকরুহ আমল
মসজিদের ভেতরে বা বাইরে এমন কোনো কারুকার্য বা আলোকসজ্জা করা ফকিহদের মতে ‘মকরুহ’ বা অপছন্দনীয়, যা মুসল্লিদের মনোযোগ বিচ্যুত করে। (ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬৫৬)
উমর (রা.) যখন মসজিদে নববির পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ শুরু করেন, তখন তিনি স্থপতি বা নির্মাণকারীকে মসজিদকে জাঁকজমক করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন মসজিদ যেন হয় সাদামাটা এবং ইবাদতের উপযোগী, লোকদেখানো কোনো প্রাসাদ নয়। তিনি বলেন—‘(এমনভাবে মসজিদ নির্মাণ করো) যাতে মানুষের জন্য বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা হয়; কিন্তু সাবধান! লাল বা হলুদ রঙে রঞ্জিত বা সুসজ্জিত করো না, যা মানুষকে ফিতনায় ফেলবে।’ (ফাতহুল বারী : ১/৫৩৯)
৪. আমাদের করণীয় ও পূর্বসূরিদের সতর্কতা
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘অদূর ভবিষ্যতে মানবজীবনে এমন একটি সময় আসবে, যখন ইসলামের নাম আর কোরআনের শব্দবাক্য ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। তারা তাদের মসজিদগুলো প্রাসাদ বানাবে বটে; কিন্তু সেগুলো আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য থাকবে...।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ১২/২৮০)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘আমি মসজিদগুলোকে জাঁকজমকপূর্ণ বা সুউচ্চ করার জন্য আদিষ্ট হইনি।’ (আবু দাউদ : ৪৪৮; ইবনে মাজাহ : ৭৪০)
অতঃপর ইবনে আব্বাস (রা.) স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করে বলেন—‘তোমরা অবশ্যই মসজিদগুলোকে সুসজ্জিত করবে, যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা (তাদের উপাসনালয়কে) সুসজ্জিত করেছিল।’ (আবু দাউদ : ৪৪৮)
আসুন, আমরা বাহ্যিক চাকচিক্য ও প্রদর্শনী পরিহার করে মসজিদের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য—অর্থাৎ নামাজ, তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর ঘর আবাদ করার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।