হজের সফর থেকে হাজি সাহেবরা অর্জন করেন দুনিয়া ও আখিরাতের অফুরন্ত কল্যাণ। বরং এ কল্যাণ অর্জন হজ ফরজ হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্যও। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দিন, তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে করে—তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে, যাতে তারা তাদের জন্য (নির্ধারিত দুনিয়া ও আখিরাতের) কল্যাণগুলো প্রত্যক্ষ করতে পারে।’ (সুরা হজ : ২৭-২৮)
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে হজ থেকে হাজিদের অর্জন অনেক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ—
জান্নাতের অধিকারী হওয়া
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় যথানিয়মে হজ আদায় এবং ইহরামের দাবি-বিরোধী কোনো কার্যকলাপে জড়িত না হলে ওই হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। কবুল হজের একমাত্র বিনিময় হলো জান্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, জান্নাতই হলো হজে মাবরুরের প্রতিদান।’ (বুখারি : ১৭৭৩; মুসলিম : ১৩৪৯)
নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ জীবন
হজের মাধ্যমে হাজিরা নিষ্পাপ নতুন জীবন নিয়ে ফিরে আসেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হজ করেছে এবং অশ্লীল কথা বলেনি বা অশ্লীল কাজ করেনি, সে হজ থেকে ফিরবে সেদিনের মতো নিষ্পাপ অবস্থায়, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন।’ (বুখারি : ১৫২১; মুসলিম : ১৩৫০)
অফুরন্ত সওয়াবের অধিকারী হওয়া
হাজি সাহেবরা হজের কার্যক্রম থেকে এত পরিমাণ সওয়াবের অধিকারী হন, যা গণনা করে শেষ করা যায় না। হাদিসে হজের প্রতিটি কাজের জন্য পৃথক পৃথক সওয়াবের ঘোষণা এসেছে। যেমন তওয়াফের সওয়াব দাসমুক্তি ও প্রতি কদমে একটি করে গুনাহ মাফ (মুসনাদে আহমদ : ৪৪৬২)। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ (তাবারানি : ১৩৪৩৮)। জমজমের পানি পানে রোগমুক্তি (তাবরানি : ৩৯১২)। বায়তুল্লাহে এক রাকাআত সালাত আদায়ে লাখো রাকাত সালাতের ও নবীর মসজিদে এক রাকাআত সালাত হাজার রাকাত সালাতের সওয়াব অর্জন (তিরমিজি : ৩৯১৬)। আরাফাতে অবস্থান, সাফা মারওয়ার সাঈ, জামারায় পাথর নিক্ষেপসহ হজের প্রতিটি কাজে রয়েছে স্বতন্ত্র অজস্র নেকি অর্জনের সুযোগ (মুসলিম : ১৩৪৮)।
নিয়ন্ত্রিত জীবনাচারের মানসিকতা তৈরি
ইহরামের অবস্থায় হারাম কাজের পাশাপাশি অনেক জায়েজ কাজ থেকেও বিরত থাকতে হয়। এতে আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা লাভ হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ অনুভূতির সষ্টি হয়, আল্লাহর পথে চলতে গেলে দুনিয়ার অনেক বৈধ বিষয় ত্যাগ করতে হয়।
আল্লাহর ডাকে সাড়া প্রদান ও মৃত্যু প্রস্তুতি
হজের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। তা ছাড়া হজের সফরে কাফনের কাপড়ের মতো ইহরামের কাপড় পরিধান করার মাধ্যমে যেকোনো সময় আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার বিষয়টিই জানান দেওয়া হয়।
অর্জনগুলো ধরে রাখার উপায়
ওপরে বর্ণিত হাজি সাহেবদের অর্জনগুলো দুনিয়ার মোহ, শয়তানের কুমন্ত্রণা ও প্রবৃত্তির চাহিদার কারণে বিলীন হয়ে যেতে পারে, হতে পারে সবকিছু নিষ্ফল। এজন্য হজ-পরবর্তী জীবনে এমন কিছু করণীয় রয়েছে, যা ওই অর্জনগুলোকে স্থায়ী করে এবং যথাযথ মর্যাদায় অক্ষুণ্ণ রাখে।
নিচে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো উল্লেখ করা হলোÑ
অশ্লীলতা পরিহার
কোরআনে হজের সময় ও পরবর্তী জীবনে পাপ, কলহ ও অন্যায় থেকে দূরে থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নির্ধারিত মাসগুলোয় হজ সম্পন্ন করো। এই মাসগুলোতে যে ব্যক্তি নিজের ওপর হজ ফরজ করে নিল, তার জন্য গালাগাল, কলহ বা পাপ কাজ করা উচিত নয়। আর যেকোনো ভালো কাজ তুমি করো, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা বাকারা : ১৯৭)
বেশি বেশি আল্লাহর জিকির
হজে আল্লাহর নাম স্মরণ এবং তাঁর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি হজ-পরবর্তী জীবনে তা নিয়মিত পালনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা যখন হজের কার্যাবলি শেষ করবে, তখন আল্লাহকে তেমনিভাবে স্মরণ করবে, যেভাবে নিজেদের বাবা-দাদাকে স্মরণ করে থাক; বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ করবে।’ (সুরা বাকারা : ২০০)
প্রদর্শনেচ্ছা ও লোকলৌকিকতা পরিত্যাগ
অনেকে হজ থেকে ফেরার পর নামের সঙ্গে হাজি শব্দ যুক্ত করে ফলাও করে তা প্রকাশ করেন। তাকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে হাজি সাহেব না বললে কষ্ট পান বা রাগান্বিত হন। এ-জাতীয় প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারেচ্ছা মানুষের আমূলে ধ্বংস করে দেয়। অতএব হাজিদের তা থেকে দূরে থাকতে হবে। এ কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের সময় আল্লাহর কাছে প্রদর্শনেচ্ছামুক্ত হওয়ার ঘোষণা প্রদান করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! এ এমন হজ, যাতে কোনো প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারেচ্ছা নেই।’ (ইবন মাজাহ : ২৮৯০)
আখেরাতমুখী জীবনযাপন
হজের অর্জনগুলো ধরে রাখার জন্য হাজি সাহেবরা আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশায় আখেরাতমুখী হবেন। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, হজ কবুলের আলামত হলো, হাজিরা দুনিয়াবিমুখ ও আখেরাতমুখী জীবনযাপন করবেন।
জীবনে গতিধারা পরিবর্তন
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, হজ কবুলের একটি আলামত হলো, হাজি সাহেব আগে যেসব পাপে নিমগ্ন ছিলেন, তা পরিত্যাগ করবেন। অসৎ বন্ধুদের পরিত্যাগ করে সৎ বন্ধু গ্রহণ করবেন। গানবাজনা ও অযাচিত বিভিন্ন আসর পরিত্যাগ করে এমন সব জিকর ও দ্বিনি মজলিসে উপস্থিত হবেন, যেখানে আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুলের আলোচনা হয়। (ইয়াইয়া উলুমুদ্দীন, ১/৮০৩)
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি