হোম > ইসলাম ও জীবন

আবার এলো রহমতের ফল্গুধারা

সুলতান মাহমুদ সরকার

মহাকালের বুকে প্রতিটি বছর ঘুরে ঘুরে এক দিব্যলোকের বার্তা নিয়ে আসে পবিত্র মাহে রমজান। এই মাস আসে নিঃশব্দে, কিন্তু তার আগমনের আওয়াজ কোটি মুসলমানের হৃদয়ে বজ্রনিনাদের মতো ধ্বনিত হয়। মরুভূমির বুকে যেমন বৃষ্টির ফোঁটা পতিত হলে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে, ঠিক তেমনি রমজানের আগমনে মুমিনের আত্মায় এক অদ্ভুত প্রশান্তির ঢেউ খেলে যায়। পাপের পঙ্কিলতায় ভারাক্রান্ত জীবনে সে যেন এক মহাশুদ্ধির স্রোতোধারা—ফল্গুধারার মতো নিরন্তর বয়ে চলা রহমতের অফুরন্ত নদী।

রমজান কোনো সাধারণ মাস নয়। এ মাস আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক অতুলনীয় উপহার। হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এক রাতকে তিনি এই মাসের বুকে লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু আমরা কি সত্যিই বুঝতে পারি এই মাসের গভীরতা? আমরা কি অনুভব করতে পারি বিশ্বনবী (সা.)-এর সেই অনুভূতি, যখন রমজানের চাঁদ দেখে তিনি দোয়া করতেন—‘হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করো।’ রমজান হলো সেই আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় প্রতিটি মুমিন। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্তি নির্ভর করে কতটা আন্তরিকতা, নিষ্ঠা আর একাগ্রতার সঙ্গে আমরা এই পথ পাড়ি দিই, তার ওপর।

রমজানের চাঁদ দেখলেই হৃদয়ে এক অদৃশ্য স্পন্দন জাগে। পুরোনো পাপের ভার ছুড়ে ফেলে নতুনভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এই সুবর্ণ সুযোগ বারবার আসে না। যে বছর রমজান পাওয়ার পরেও যার পাপ ক্ষমা হলো না, হাদিসে নবীজি (সা.) তার ব্যাপারে দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ রমজান যেন এক খোলা দরজা, যে দরজা দিয়ে ঢুকলেই জান্নাতের সুবাস পাওয়া যায়, আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যায়, পাপমোচনের আশ্বাস পাওয়া যায়। আর এই দরজা সারা বছর এভাবে খোলা থাকে না।

‘রমজান’ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে দহন ও পরিশুদ্ধতার অর্থ। এ মাস মানুষের অন্তরের কালিমা পুড়িয়ে দেয়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং গুনাহের ভার হালকা করে। রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ। যখন একজন রোজাদার দিনের বেলায় পানির গ্লাস সামনে রেখেও পান করে না, তখন সেই মুমিন প্রমাণ করে, সে তার প্রবৃত্তির দাস নয়, সে আল্লাহর দাস। এই সংযমের শিক্ষা মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। রমজান আমাদের চোখকে সংযত করে, জিহ্বাকে মিথ্যা ও গিবত থেকে বিরত রাখে, কানে অশ্লীলতা প্রবেশ করতে দেয় না এবং মনকে কু-চিন্তা থেকে দূরে রাখে। এই মাস আত্মশুদ্ধির এক অনন্য বিদ্যালয়।

রমজানের আগমনে মুসলিম সমাজে এক অপূর্ব আবেগ সৃষ্টি হয়। চাঁদ দেখার খবর শোনার পর মসজিদে মসজিদে ধ্বনিত হয় তাকবির, মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়। কিন্তু এই শুভেচ্ছা শুধু আনুষ্ঠানিক নয়; এটি এক নীরব অঙ্গীকার যে, আমরা নিজেদের বদলাতে চাই। রমজান আমাদের সময়ের মূল্য শেখায়। দিনের রুটিন বদলে যায়, রাত হয়ে ওঠে ইবাদতের জন্য উপযুক্ত সময়। সাহরির নির্জনতা, ইফতারের অপেক্ষা, তারাবির সুমধুর তিলাওয়াত—সব মিলিয়ে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা বছরের অন্য সময় অনুভব করা যায় না।

এই মাস রহমতের মাস। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর অশেষ করুণা বর্ষণ করেন। সামান্য একটি নেক আমলও বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। মানুষের হৃদয় কোমল হয়, দানশীলতা বাড়ে, দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতা জাগে। ক্ষুধা আমাদের শেখায় দরিদ্রের কষ্ট বুঝতে। ইফতারের সময় এক গ্লাস পানি হাতে পেয়ে আমরা উপলব্ধি করি আল্লাহর নেয়ামতের মূল্য। রমজান আমাদের ভেতরে কৃতজ্ঞতার বোধ জাগিয়ে তোলে।

এ মাস মাগফিরাতের মাস। গুনাহে জর্জর মানুষ এই মাসে আশার আলো খুঁজে পায়। সে জানে, আল্লাহর রহমত তার পাপের চেয়েও বড়। তাই রাতের অন্ধকারে সে সিজদায় কাঁদে, ক্ষমা চায়, নতুন জীবনের প্রতিজ্ঞা করে। মাগফিরাত মানে শুধু অতীতের গুনাহ মাফ হওয়া নয়; এটি আত্মার পুনর্জন্ম। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে তাওবা করে, সে অন্তরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করে।

এটি একইসঙ্গে নাজাতের সময়। এর শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর, হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এক মহিমান্বিত রজনি। এ রাতে ইবাদত করলে একটি দীর্ঘ জীবনের সমান সওয়াব অর্জিত হয়। তাই মুমিনরা শেষ দশকে আরো বেশি মনোযোগী হয়; কেউ ইতিকাফে বসে, কেউ রাত জেগে কোরআন তিলাওয়াত করে, কেউ দীর্ঘ সেজদায় আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়ে। নাজাত মানে শুধু জাহান্নাম থেকে মুক্তি নয়; এটি নফসের দাসত্ব থেকেও মুক্তি।

রমজান তাকওয়ার মাস। তাকওয়া হলো অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত রাখা। যখন কেউ একান্তে থেকেও গুনাহ করে না, কারণ সে জানে আল্লাহ দেখছেন, সেই চেতনার নাম তাকওয়া। রমজান এই তাকওয়াকে আমাদের জীবনে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। যদি এই মাসের শিক্ষা আমরা সারা বছর ধরে রাখতে পারি, তবেই কেবল ব্যক্তি জীবন শুদ্ধ হবে এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই মাস কোরআন নাজিলের মাস। কোরআন মানবজাতির জন্য পথনির্দেশিকা। রমজান আমাদের কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ দেয়। আমরা শুধু তিলাওয়াতই করব না, বরং অর্থ বুঝে জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করব। কোরআনের শিক্ষা সত্য, ন্যায়, দয়া ও জবাবদিহিতার শিক্ষা। যদি কোরআনের আলো আমাদের জীবনে প্রবেশ করে, তবে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র আলোকিত হবে।

রমজান আমাদের শেখায় সরলতা। ইফতার যেন বিলাসিতার প্রতিযোগিতা না হয়ে ওঠে; বরং তা হোক কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। আমাদের উচিত অপচয় পরিহার করা, দরিদ্রের কথা স্মরণ রাখা, জাকাত ও সদকার মাধ্যমে সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করা। পরিবারের মধ্যে কোরআন পাঠের পরিবেশ তৈরি করা, সন্তানদের ইসলামের শিক্ষা দেওয়া, নিজেদের আচরণে নম্রতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করা।

রহমতের এই ফল্গুধারায় আমরা যেন নিজেকে স্নাত করি, হৃদয়ের মলিনতা ধুয়ে ফেলি, আল্লাহর দিকে ফিরে যাই। যেন এই রমজান আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, আমাদের অন্তরকে আলোকিত করে, আমাদের করে তোলে সত্যিকার অর্থে মুত্তাকি ও সফল। এই মাস হোক আমাদের আত্মশুদ্ধির মাস, পরিবর্তনের মাস এবং নাজাতের মাস। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ মাসের পূর্ণ বরকত ও রহমত অর্জনের তাওফিক দান করুন।

লেখক : শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে এতে অংশ নিলে ঈমান থাকবে না

শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিংয়ে নবীজির ১০ গুণ

মুসলিম বিশ্বে মার্কিন বিনোদনশিল্পের প্রভাব বাড়ছে

নতুন কুঁড়ি হিফযুল কোরআন প্রতিযোগিতায় থাকছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কার

সন্তানের নৈতিকতা গঠনে পরিবারের ভূমিকা

আঙুলের ডগায় আল্লাহর কুদরত

অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা

মানবিক মূল্যবোধ সুন্দর চরিত্র গঠনের ভিত্তি

অজু ছাড়া পবিত্র কোরআন স্পর্শ করা যাবে কি, ইসলাম কী বলে

অবচেতন মনের শক্তি