নাগোয়ার মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়াম যেন অপেক্ষা করছিল একটি বিশেষ মুহূর্তের। বিশাল হৃদয়াকৃতির মঞ্চে আলো জ্বলে উঠছে, চারপাশে সংগীতের সুর, গ্যালারিতে হাজারো চোখ। তারপর একে একে মাঠে নামতে শুরু করল এশিয়ার দেশগুলো। আফগানিস্তান, বাহরাইনের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে স্টেডিয়ামের মঞ্চে এলো বাংলাদেশ। চারপাশের আলোর মিছিলে তখন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। গ্যালারি থেকে চিৎকার, ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!’ ৪৩ জনের মার্চপাস্টের সেই মিছিলের সঙ্গী হয়ে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল যেন হাওয়ায় ভেসে চলেছি। বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠছিল বারবার। চারপাশের হাততালি আর আনন্দধ্বনি শুনে মনে হচ্ছিল কী বিপুল, কী বিশালতার মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে লাল-সবুজের এই মিছিল!
মিছিলের অগ্রভাগে সবুজের ওপর লাল বৃত্ত আঁকা বাংলাদেশের পতাকা উঁচিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকলেন শুটার আব্দুল্লাহ হেল বাকী ও কারাতেকা হুমায়রা আক্তার অন্তরা। তাদের পেছনে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তারা। এশিয়ার বিশাল হৃদয়ের মঞ্চে গতকাল বাংলাদেশও জানিয়ে দিলÑএই মহাদেশীয় উৎসবে তারাও আছে, নিজেদের স্বপ্ন ও পতাকা নিয়ে।
জাপানের নাগোয়ায় গতকাল সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠল ২০তম এশিয়ান গেমসের। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এই আসর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বসেছিল পালোমা মিজুহো স্টেডিয়ামে।
মার্চপাস্টে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ৪৩ জনের জন্য এই উপস্থিতির পেছনে ছিল বড় একটি বহর। এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ১৮৭ ক্রীড়াবিদ অংশ নিচ্ছেন। পুরুষ ৯০ এবং নারী ৯৭ জন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দল ২৬০ সদস্যের। ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে রয়েছেন ৭৩ জন কোচ ও কর্মকর্তা। ২২ ডিসিপ্লিনে লড়বে বাংলাদেশ। ক্রিকেট, ফুটবল, আর্চারি, অ্যাথলেটিকস, বক্সিং, কাবাডি, হকি, শুটিং, সাঁতার, ভারোত্তোলন, জিমন্যাস্টিকস, কারাতে, ফেন্সিং, সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন, গলফ, সার্ফিং, জুডো, টেবিল টেনিস, বিচ ভলিবল, কুস্তি ও উশু—এই বিস্তৃত পরিসরেই লড়াই দেশের ক্রীড়াবিদদের।
তবে পুরো বাংলাদেশ দল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল না। কারণ, এশিয়ান গেমসের বাস্তবতা এবার একটু আলাদা। উদ্বোধনের আগেই বেশ কয়েকটি ইভেন্ট শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯ সেপ্টেম্বরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই মাঠে নেমেছে দেশের নারী ফুটবল দল ও পুরুষ হকি দল। ফলে যেসব ক্রীড়াবিদের পরদিন, অর্থাৎ আজ প্রতিযোগিতা রয়েছে, তাদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে না থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সে হিসাব ও অঙ্ক কষেই বাংলাদেশের ৪৩ জন মার্চপাস্টে অংশ নেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যতই মর্যাদাপূর্ণ হোক, পরদিন যাদের মাঠে নামতে হবে, তাদের জন্য বিশ্রাম ও প্রস্তুতিই গুরুত্বপূর্ণ। তাই লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করেছে বাছাই করা একটি দল; বাকিরা নিজেদের ইভেন্টের প্রস্তুতিতে থেকেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪৩ জনের উপস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশের জন্য নাগোয়ার এশিয়ান গেমস শুরু অবশ্য ১৯ সেপ্টেম্বর নয়, তারও কয়েক দিন আগে। নারী ফুটবল দল ১৪ সেপ্টেম্বর থেকেই প্রতিযোগিতায় নামে। পুরুষ হকি দলও উদ্বোধনের আগেই খেলেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হকিতে বাংলাদেশের অভিযান শুরু হয়। সেই ম্যাচ ঘিরে অবশ্য এশিয়ান গেমসের আয়োজনে বড় একটি ভুলও ঘটে। বাংলাদেশের ম্যাচের আগে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় সংগীতের বদলে ভুল করে উত্তর কোরিয়ার সংগীত বাজানো হয়। পরে আয়োজকরা দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়। অর্থাৎ, উদ্বোধনের আগেই বাংলাদেশের এশিয়ান গেমসের গল্পে যোগ হয়েছে নানা রঙ। মাঠে লড়াই, সংগঠনের ব্যস্ততা, প্রস্তুতির চাপ—সবকিছুর মধ্যেই এসেছে সেই স্মরণীয় মুহূর্ত, যখন লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা হেঁটেছেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের মঞ্চে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ছিল ‘হারমনিক হার্ট বিট’, অর্থাৎ সুরেলা হৃদস্পন্দন। হৃদয়াকৃতির মঞ্চে জাপানের ঐতিহ্য, সংগীত, নৃত্য ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রদর্শনী দিয়ে সাজানো হয় অনুষ্ঠান। ৪৫ দেশের ক্রীড়াবিদের পদযাত্রার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে এশিয়ার বৈচিত্র্য ও ঐক্যের ছবি। জাপানের সম্রাট নারুহিতো আনুষ্ঠানিকভাবে গেমস উদ্বোধনের ঘোষণা দেন। শেষে জাপানের সাবেক এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন শিগেনোবু মুরোফুশি ও তার ছেলে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন কোজি মুরোফুশি যৌথভাবে প্রজ্বালন করেন গেমসের মূল মশাল।
মশালের আলোয় বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। এবারের আসরে দেশটির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কাবাডিতে। এর সঙ্গে ক্রিকেট, শুটিং ও আর্চারিতেও পদকের সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে কাবাডিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; একইসঙ্গে শুটিং ও ক্রিকেটেও ভালো ফলের আশা করা হচ্ছে। নারী ক্রিকেট দল আজকের সেমিফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে জয় পেলে স্বর্ণপদকের লড়াইয়ে টিকে থাকবে। আর যদি আজকের সেমিতে হারে বাংলাদেশ, তাহলে এই ইভেন্টে শুধু ব্রোঞ্জের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে নারী ক্রিকেট দলকে।
নাগোয়ার উদ্বোধনী রাত তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু মার্চপাস্টে অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। আব্দুল্লাহ হেল বাকী ও হুমায়রা আক্তার অন্তরার হাতে লাল-সবুজ পতাকা ছিল পুরো দলের প্রতীক। তাদের পেছনে হাঁটা ক্রীড়াবিদরা বহন করেছেন ১৮৭টি ব্যক্তিগত স্বপ্ন, ২২ ডিসিপ্লিনের প্রত্যাশা এবং একটি দেশের পদকের আকাঙ্ক্ষা।
উদ্বোধনী মঞ্চের আলো নিভে গেলেও সামনে প্রতিযোগিতার মঞ্চ। হৃদয়ের মঞ্চ থেকে এবার বাংলাদেশের লক্ষ্য মাঠের মঞ্চে গল্প লেখা। সেই গল্প কতদূর যায়, সেটাই এখন দেখার।
আর সেই রাতের শেষ দৃশ্যটি হয়তো এই গেমসের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবেও থেকে যাবে। মার্চপাস্টে বাংলাদেশের পতাকা বয়ে নিয়ে যাওয়া শুটার আব্দুল্লাহ হেল বাকী উদ্বোধনী মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন। ছবি তোলার মুহূর্তে বাকীকে বললাম, ‘আপনি গেমসে পদক পেলেই এই ছবি ফেসবুকে দিয়ে সেলিব্রেট করব।’