এশিয়ান গেমসের মতো মহাদেশীয় আসরে যেখানে একটি দল নিজেদের সেরা প্রস্তুতি নিয়ে পদকের লড়াইয়ে নামে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন দলকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে জার্সির ভুল শোধরাতে! খেলোয়াড়দের নামের বানান ভুল, দেশের নামের অবস্থান ও জার্সির মাপেও অসংগতি; সব মিলিয়ে নাগোয়ায় শুরু হওয়ার আগেই নতুন বিড়ম্বনায় বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন দল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নির্ধারিত জার্সিতে দলীয় ইভেন্টে খেলা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
জাপানের নাগোয়ায় এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিনই বিষয়টি সামনে আসে। ভুলে ভরা জার্সি নিয়ে বিপাকে পড়ে শেষ পর্যন্ত নতুন জার্সি তৈরির জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের।
বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের শেফ দ্য মিশন মেজর ইমরোজ আহমেদ (অব.) জানান, এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে প্রতিটি ফেডারেশনের জার্সি অনুমোদনের প্রক্রিয়া রয়েছে। ক্রিকেট, ফুটবল ও কাবাডিসহ বিভিন্ন ফেডারেশন জার্সি পাঠিয়ে অনুমোদন নিয়েছে। ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন অবশ্য জার্সির শুধু নকশা দিয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত জার্সিতে নামের বানান, দেশ ও খেলোয়াড়ের নামের অবস্থান এবং নামের মাপে ভুল ধরা পড়ে।
তিনি বলেন, ‘গেমসে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জার্সি অনুমোদন নিতে হয়। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ অনেক ফেডারেশনই আমাদের কাছে জার্সি পাঠিয়েছিল। আমরা সেটা অনুমোদন করেছি। ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন শুধু ডিজাইন দিয়েছিল, সেটা আমরা অনুমোদন করিয়েছি। কিন্তু জার্সিতে নামের বানান, দেশ ও খেলোয়াড়ের নামের অবস্থান, নামের পরিমাপে ভুল থাকায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের মহাসচিব বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে।’
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানার বক্তব্যেও উঠে এসেছে ফেডারেশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের গাফিলতির বিষয়টি। তার দাবি, জার্সি যথাযথভাবে তৈরি করা ফেডারেশনের দায়িত্ব। দেরিতে জার্সি দেওয়ার কারণে ঢাকায় ব্যাডমিন্টন কর্মকর্তাদের ডেকে অন্তত একটি জার্সি প্রস্তুতের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এখন সেই জার্সিই নতুন করে জাপানে তৈরি করতে হচ্ছে। জোবায়েদুর রহমান রানা বলেন, এশিয়ান ব্যাডমিন্টন কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে।
এদিকে ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার মহিউদ্দিন বুলবুলও নাগোয়ায় নতুন জার্সি তৈরির জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। তার দাবি, অলিম্পিকের অনুমোদন নিয়েই জার্সি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল ভুলগুলো নজরে আসার পর আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন জার্সি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্য বলছে, সমস্যাটি গতকাল নতুন করে তৈরি হয়নি। তারা দেশে থাকতেই জার্সির ভুলগুলো দেখতে পেয়েছিলেন। এমনকি এই জার্সিতে খেলা যাবে না বুঝতে পেরে নিজেদের খরচে এক সেট জার্সিও তৈরি করেছিলেন তারা।
ব্যক্তিগত ইভেন্টে খেলোয়াড়েরা নিজেদের জার্সি পরে অংশ নিতে পারলেও দলীয় ইভেন্টে একই ধরনের ও একই মাপের জার্সি পরা বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আবার খেলোয়াড়ের পাসপোর্ট অনুযায়ী নাম ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ দলের একাধিক খেলোয়াড়ের নামই ভুলভাবে ছাপা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় হাস্যকর ভুলটি হয়েছে পুরুষ দলের দুই খেলোয়াড় আয়মান ইবনে জামান ও জুমারের ক্ষেত্রে। দুই খেলোয়াড়ের নাম মিলিয়ে জার্সিতে লেখা হয়েছে ‘জুমান’, যে নামে বাংলাদেশ দলে কোনো খেলোয়াড়ই নেই। শুধু নামেই ভুল নয়, জার্সিতে দেশের নামের অবস্থানও রাখা হয়েছে নির্ধারিত জায়গার বদলে অন্যত্র।
এখানেই শেষ নয়, দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান শাকিল এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের কোচের দায়িত্বে রয়েছেন। একজন কর্মকর্তা কীভাবে কোচের দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে এরই মধ্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সমালোচনা করেছিলেন।
বাংলাদেশ দল নাগোয়ায় পৌঁছে গেলেও শাকিল এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারেননি মায়ের মৃত্যুর কারণে। অন্যদিকে দলের ম্যানেজার মহিউদ্দিন বুলবুলও গতকাল এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের টিম বাস ধরতে পারেননি বলে জানা গেছে।
আরও বিস্ময়ের বিষয়, ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যা সমাধানে গঠিত মন্ত্রণালয়ের কমিটিতেও রয়েছেন এমন কর্মকর্তারা। ফলে যাদের ওপর একটি আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশ দলের ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির দায়িত্ব, তাদের কার্যক্রম নিয়েই যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে, তখন ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে মাঠের লড়াইয়ের আগেই একটি দলের জার্সিতে এতগুলো ভুল এবং শেষ মুহূর্তে নতুন জার্সি তৈরির হিড়িক—বাংলাদেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতির ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতার চিত্রই যেন সামনে এনে দিয়েছে।